আমরা তো গ্রামে ফেরার জন্যই অপেক্ষা করি

আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৪৬ পিএম

মানুষ গ্রাম কেটে শহর বানাচ্ছে। গ্রামারণ্য ফালা ফালা করে তরতরিয়ে উঠে যাচ্ছে কেউটে পিচ। গ্রাম কি ডাকাতের মুখে পড়ল? শহর কি এভাবেই একদিন গিলে নেবে গাঁওকে? এখানে সেখানে কেব্ল টিভির কানেকশন, মোড়ের দোকানে ভিড়। চা-ওয়ালা সিডি চালিয়ে ভিডিও দেখায়। গ্রাম তুমি আগের মতো  আছ তো?... নিরাকুল শহরে ছেলেবেলাকে মনে পড়ে যায়। বিড়িমুখে ধানকাটার গান, ধুয়া, মারফতি, যাত্রাপালা, পালাগান, কবিগান, পুঁথিপাঠ, কেচ্ছাকাহিনী, গীত-গজল, জারি-সারি মুর্শিদির টানে দুলে উঠত গ্রামজীবন। আর এখন! অজগাঁয়ে পিঠাপুলিও পানসে হয়ে আসছে। শরবতের পরিবর্তে কোকা-কোলা দেওয়া হয়। চা-চানাচুরের সঙ্গে ফাস্টফুড। গ্রামীণ না আকাশ সংস্কৃতি? হয়তো গ্রামচোখেও একসময় সাদামাটা হয়ে যাবে সবকিছু। উদাসি গাড়োয়ান নাইয়োরি নিয়ে যাচ্ছে। ছইয়ের মধ্যে ছাপাশাড়ি পরা গ্রাম্যবধূ। কাজলচোখা গরুর গলায় পিতলের ঘণ্টা। টুং টাং টুং টাং আর চোখে পড়ে না। ধকল শহর সহ্য করতে পারলেও গ্রাম পারে না। যারা নবান্নের গান করত, নছিমন, মনসাপালা কিংবা বোহেমিয়ান বাউলবেশে যারা গান করে বেড়াত এগ্রাম-ওগ্রাম, বাঁদর কাঁধে বাড়ি বাড়ি খেলা দেখিয়ে দু’চার আনা পেত তারাও যেন সরে যাচ্ছেন ভাগ বুঝে। একতারা, সারিন্দার জায়গায় চলে এসেছে সিডি-ভিসিডি। আমরাও যেন ‘কী আর করা’ এ রকম এক আত্মসান্ত¡নায় দায়বোধ থেকে বেঁচেছি। অথচ গ্রামকে মনে পড়লেই এখনো আমরা এক নিবিড় নদীবাহিত ছায়াভরা জনপদকেই দেখতে পাই। মানুষের মন-মর্জির মধ্যে যেখানে বর্ষা নামে। গাঢ় হয়ে ঘুম আসে, আসে কুয়াশামাখা মোলায়েম সকাল। যেদিকে চেয়ে শহর বেঁচে থাকে। আমাদের কী নেই! ডাক্তার, চাকুরে, বিজ্ঞ বনেদি, বলিহার মেট্রো, আছে লোক-লস্কর, হাজার মোটর কার। তেলওয়ালা, ট্রাকওয়ালা, টাকাওয়ালা মোটা দরের দলবল সব আছে, খালি একজন পুরদস্তুর জীবনানন্দ দাশ নেই। যিনি আমাদের নাড়ি ধরে বলে দেবেন, দেখ এইখানে আমাদের রক্তের ভেতরে খেলা করে বিপন্ন এক বিস্ময়।

শহুরেরা এখন হেমন্তকে খুঁজে পায় না। স্টেজ বানিয়ে নগুরে কায়দায় প্রাণহীন নবান্ন করে তারা। দুধের মজা তো আর ঘোলে মেটে না। কোথাও না কোথাও তবু গন্তব্য আছে। রাখা আছে সুন্দর। গ্রামে গ্রামে ঢুকে ঢুকে দেখেছি। শহরের তান্ডব গ্রাম বরদাশত করতে পারেনি। বরং মানুষের বিষয়ী হাতে যতটুকু পাল্টে গেছে, সেটুকু ফেলেই নিজকে গুটিয়ে নিয়েছে গ্রাম। তারপর আগের মতোই গুলজারে মজেছে সে। ঋতুবদল দেখতে গেলে শুধু শহরে দাঁড়ালে হবে না। শহরতলি ফেলে আরও দূরে। মেদুর গ্রাম থাকে আরও গভীরে।

হেমন্তের একদিন তাই পরানদহকে মনে করে সাতক্ষীরা শহর থেকে ছুটতে থাকি। দু বছর আগে যেখানে একদিন শিশিরের শব্দের মতো হেমন্ত নেমেছিল। শহর ফেলে উপজেলার ঝকমারি রেখে নামতে থাকি ভাটিতে, মেঠোপথে। সবুজ পোক্ত ধান মাসান্তে সোনালি হয়ে মাঠে মাঠে নুয়ে আছে। গোঁয়ার আবাদ ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে পাথার থেকে পাথারে। ধান কাটার দিনকে গাঁওয়ালিরা নবান্ন বলে না, বলে নবান। পরানদহের নিরাময়ী দিগন্তে চেয়ে দেখি পাকাধান কেটে গানখোলা মতোন করা হয়েছে। খুঁটিতে মাইকের চোঙ টাঙিয়ে শামিয়ানার তলে টেবিল পেতে গান চলছে। আখতারুজ্জামান বয়াতি মাউথপিস হাতে নেচে নেচে গাইছে

ও বাংলার কিষান ভাই

চলো আমরা ধান কাটিতে যাই।

নতুন ধানের চিঁড়া মুড়ি

ভালোবাসে বুড়াবুড়ি।

বাঁধা পদে আখতার সুর তুলে দুলে ওঠেন। তারপর কলি ধরে খানিক এগিয়ে গিয়ে লম্বা টানে ছেড়ে দেন। সহ-গায়েনরা কলির কোরাসে গলা মেলাচ্ছেন। শেষ অন্তরায় নাকি সুরে দ্যোতনা তোলেন একজন। মুখ এবং তালযন্ত্র বরাবর মাইক্রোফোন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাজ-বাজনার মধ্যেই রহিমুদ্দি গলায় ঢোল ঝুলিয়ে দমাদম আওয়াজ তুলছেন। নাড়ার মাঠে ঘুরে ঘুরে পায়ে পা মেলাচ্ছেন। দেখার মতো। নাচতে নাচতেই তিনি ধপ্ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। ভঙ্গিমা তুলে সমবেতদের কুর্নিশ করেন, তড়াং উঠে দাঁড়ান। পরানদহের কৃষকরা  হৈ দিয়ে কুর্নিশের জবাব দেন। গাদাগাদি থেকে পোলাপানেরাও চিৎকার করে ওঠে। উৎসাহ পেয়ে রহিমুদ্দি দ্বিগুণ আহ্লাদে লাফাতে থাকেন। আইলে দাঁড়ানো শরমেন্দা মহিলারাও ঘন হয়ে আসেন। ভিড় করে মজমা দেখেন। রোদ গাঢ় হতে থাকে। আগ্রহ কমে না। কৃষক দল জমিতে নেমে যায়। গানে গানে ধান কাটা চলে। বহুদিন পর সহজাত এক আনন্দবোধে জেগে ওঠে পাথার। রাখালিয়া সুর আর গেরুয়া আবাদের ম ম গন্ধে একাকার হতে থাকে পরানদহ...। পহেলা অগ্রহায়ণের রঙিন দৃশ্যকে সামনে নিয়ে বুনজারদের মনে পড়ে যায়। বর্ষাবরণের দিনে এরকমই এক আনন্দদৃশ্য দেখেছিলাম বিরলের বহবলদিঘিতে। সারা বছর এমনিতেই নিভে থাকে। তার ওপর শীতকালে যখন দেদার কুয়াশা ছাড়ে তখন আরও খানিক ঝাপসা হয়ে যায় বুনজারপাড়া। কিন্তু বোশেখ এলেই পাড়াটা দপ্ করে জ্বলে ওঠে। নাচ-গান আর হাড়িয়া মচ্ছবে দুলতে থাকেন বুনজাররা। পাড়ামুখেই রঙের হোলি চলছিল।  ভালো করে কথা বলার সুযোগ হলো না। গানে গানে রোল উঠল

জাগুয়া বানে লে, বানে লেকে লাগুয়া

জাগুয়া বানেলে, লাগুয়া

কাহিনকে ছারা রারা

কাহিনকে ছারা রারা

ফুর্তি ছুড়ে একদল মহিলা ঝুমনাচ নেচে চলেছে। ধাড়ি ইঁদুরের ঝালমাংস আর খিচুড়ি পাকানো হলে মচ্ছব জমে যাবে। বৈরাগীকে সঙ্গে নিয়ে নেপাল বুনজার বসে বসে কল্কি সাজছিলেন। সঙ্গে আসা সাংবাদিক কুদ্দুস হাঁক দিলেন ‘ঐ বৈরাগী সানাই আছেরে, নি আয়, প্র্যাকটিকেলি গান শুনিবা হবি’। বৈরাগী সানাই বাজানো শুরু করলে সদু বুনজার ঢোলে আওয়াজ তুললেন ডুমাক ডুমাক ডুম ডুম, ডুম ডুম ডুমাক। জনা দশেক মহিলা বারান্দা থেকে অটোমেটিক আঙিনায় নেমে পরস্পর হাতে হাত রাখলেন। তারপর ওপর নিচে মাথা দুলিয়ে পায়ে পা ঠুকে গোলাকারে ঘুরতে থাকলেন। আগামাথা বোঝার আগেই বাজনা থেমে গেল। মহিলারা সমস্বরে কলি ধরে তালি বাজাতে লাগলেন

খুটা চিরি, গুনকে বোরা

তামান বোরা

খায়া গ্যালো

পবনশাহের ঘোড়া

কো কো করে সানাই ডেকে উঠল। মহিলারা নাচের পুনরাবৃত্তি করলেন। মিনিট বিশেক হুলুস্থুল গান-বাজনার পর ছোট মেয়েরা হাঁপিয়ে উঠলে দিপালি বুনজার বায়না ধরলেন ‘এইবার ব্যাটাছেলেদের ফাগুয়া নাছটা হবা লাগিবে’। এক তরফে মহিলারা গান ধরলেন। অন্য তরফে পুরুষরাই বাজাতে লাগলেন। বিজেন আর বাবুলাল মাঝখানে দমাদম নাচ জুড়ে দিলেন। ফের ওড়াল উঠল

ওরে পাখি ঝমাঝম

বসে পাখি গেদারে...

তাক ডুমাক ডুক তাল উঠে গেল। ছেলেছোকরা বলে আর কথা থাকল না। দেদার বিড়ি ভাং চলছে। কোন্ ফাঁকে বেলা ডুবে গেল বুঝতেই পারিনি। ঘর থেকে গীতা বুনজার উলু দিতেই হরেক প্রদীপ জ্বলে উঠল। চট্ করেই পরিবেশটা বদলে গেল। মনে আছে আলো-আধারির ভেতর রঙিলা বুনজারদের সঙ্গে আমরাও কোরাস দিয়ে দুলে উঠেছিলাম সেদিন...। কল্পনা ছেড়ে গানে মন দিলাম। আগের চেয়ে ভিড় কমেছে। বয়াতি গেয়েই চলেছেন

ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে...

পাথার রেখে খাল ধরে হাঁটতে লাগলাম। তিরতিরে বাতা বয়ে ছিমছাম বাজার। ঝাপতোলা গোটাকয়েক দোকান, চা-স্টল আর মাটিতে পাত পাতানো কাঁচা সবজি নিয়ে গেঁয়োবাজার। গোধূলির নরম আনাগোনা মাড়িয়ে শেষভাগে চলে গেলাম। মুদিখানায় টেবিল পেতে এক ছোকরা চা বানাচ্ছে। জলচৌকির ওপর সাদাকালো টেলিভিশন চলছে। লোকজন গভীর মনোযোগে হস্তিনী নায়িকার জলকেলি দেখছে। যারা বসতে পারেননি তারা দাঁড়িয়েই দেখছেন। একজনের গায়ে হাত লাগিয়ে ইশারায় রং চায়ের কথা বললাম। সংবাদটা যাওয়া মাত্র সকলেই ঘাড় ঘুরিয়ে বার কয়েক দেখে নিল আমাকে। প্রত্যেকের চাহনির মধ্যেই কেমন অপরাধ ভাব। দোকানি সিডির লাইন খুলে বিটিভি চালু করে দিল। পরানদহের এ পাশটা মেলানো যাচ্ছে না। উন্নতির এক পর্যায়ে এসে আধখ্যাঁচড়া জনপদে পরিণত হয়েছে। সবিস্তারে দেখা হলে দক্ষিণ দিকে যেতে থাকলাম। কাঁচাপথের কিনার ধরে রেনট্রির সারি। ছোট খেজুর গাছগুলো পাতা ছড়িয়ে পথেই ঝুলে পড়েছে। কাঁটা বাঁচিয়ে মোটরসাইকেল চালাতে হচ্ছে। ধূ-ধূ আবাদ সোনা রং নিয়ে হলুদ হয়েছে। কোথাও নিচু জমিতে বক পড়েছে। হাত ইশারা দিতেই বৃদ্ধদ্বয় জমিন থেকে উঠে এলেন। আলাপি মকসেদ সরদার ছবদেলকে সাক্ষী মেনে পুরনো দিনে চলে গেলেন ‘আগে গাঁয়ে আনন্দ ছ্যালো। আমরা সাগরভাসা যাত্রা কত্তাম। বছরের পয়লা দিনত পান্তা খায়ানি হইতক। গাঁয়ে এখন এসব কিচু হয়নাকো। ধানকাটা হলি ফের জারি ও জরিনার পালা হতো’। ছবদেল আরও যোগ করতে লাগলেন ‘আগের মতো সেসব মান্যগণ্যি আর নাই। বেশিরভাগ পোলাপানরাই ঝাঁউলি টাইপের। মুরিব্বিদের কোনো মানাগুনা নাই; খালি টিপি ভিসিপি দেখে বেড়ায়। তাছাড়া যি গ্রাম আপনে দেখতিছেন, এতি এখন আর গ্রাম নাই। গাঁজা হিরো থেকি সব রকম নেশাপানি পাবেন এখানতি’। বৃদ্ধদের খোলামেলা মন্তব্য শুনে মনটা ক্রমেই কালো হয়ে যায়। এ কী হচ্ছে গ্রামে! আমাদের স্বপ্নময় গ্রামগুলো বদলে গেছে! একটা দুর্ভাবনা নিয়ে বৃদ্ধদের বিদায় জানাই। ফাঁকাপথে যেতে যেতে কুষ্টিয়ার রহিম বাউলের মুখটা ভেসে ওঠে। রহিমশাহ্ ছবদেলদের মতোই নিরাশ হয়েছিলেন দ্যাকেন এখন খেলা ছাড়া পার্বণ হয় না। ছুকরিবাজি আর জুয়াখেলা ছাড়া কোনো ম্যালা নাই। ম্যালা-পার্বণের আসল জিনিস কিংবা আমোদ বলতে কিছু নাই। কেন এমন হচ্ছে, প্রশ্ন করেছিলাম। রহিম শাহ্ কপট হেসে লালনের পদ বললেন

না জানি কলির শেষে

আরও কত কী

ঘটবে দেশে।

লালন ভেঁড়ুয়ার দিন গেছে

যে বাঁচবে সে দেখবে ভাই।

আজগুবি বৈরাগীর লীলা দেখতে পাই।

‘লালন আগেই বুঝতি পারিছিল যে, ট্যাডির জমানা আসবে। সামনে এমন সব মানুষ আসবে যে ভেদ পরিচয় জানবে না। তখন আজগুবি এক কারবার ঘটবে। বাইরে আজগুবি ভাব ভিতরে সদরঘাট’। কাদাখালি ছেড়ে কাথন্ডা হয়ে ফেরার পথে আরও টেলিভিশনওয়ালা দোকান দেখি। সে সবে আর মন লাগে না। শহর পেতে তখনো ছ’ কিলোমিটার। কুয়াশার সঙ্গে জ্যোৎস্না নেমেছে। বিলের কিনার ধরে যাওয়ার সময় শেষবার পরানদহ আমাকে স্পর্শ করে নেয়। সুদূরে চেয়ে মনে মনে বলি, আমি তো গ্রামে ফেরার জন্যই অপেক্ষা করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত