নুসরাত, তনু, সাগর-রুনি হত্যাসহ সব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার নবপ্রত্যয় ও শুভবোধ জাগ্রত করার বার্তা নিয়ে শুরু হলো বাংলা নতুন বছর ১৪২৬। রাজধানীর রমনার বটমূলে ছায়ানটের এবারের বর্ষবরণ আয়োজনের মূল স্লোগান ছিল ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’। সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে। এরপর দেশজুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। এই প্রতিবাদের ঢেউ লেগেছিল এবারের বর্ষবরণের আয়োজনেও।
শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার আহ্বান জানিয়ে পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনে বর্ষবরণ শুরু হয়। এ সময় নুসরাত হত্যার বিচারের দাবি জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সব অন্যায়ের প্রতিবাদে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ছায়ানটের সভাপতি সন্্জীদা খাতুন বলেন, ‘আমরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করব, আমাদের ক্ষোভ জানাব, প্রতিবাদ জানাব, অনাচারের বিরুদ্ধে। নুসরাত জাহান, তনু, সাগর-রুনি যে সমস্ত বিষয়ে আমরা আজ পর্যন্ত কোনো খবর পেলাম না বিচারের, সেসব বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে এবং বিগত প্রাণগুলোর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা ১ মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকব।’
এ সময় শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানিয়ে ছায়ানট সভাপতি আরও বলেন, ‘আমরা যেন নীতিবিহীন অন্যায়-অত্যাচারের নীরব দর্শকমাত্র হয়ে না থাকি। প্রতিবাদে, প্রতিকার সন্ধানে হতে পারি অবিচল। নববর্ষ এমন বার্তাই সঞ্চার করুক আমাদের অন্তরে।’
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকাল ৯টায় বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেখানেও ছিল অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার আহ্বান। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’। শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ, চিত্রশিল্পী নেসার হোসেনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। এবার শোভাযাত্রার শিল্পকাঠামোতে বাঘের মুখ থেকে কাঁটা তোলার চিরায়ত গল্পটি উপস্থাপিত হয় বাঘ ও বকের অনুষঙ্গে। মঙ্গলের বার্তা নিয়ে ছিল পেঁচা। সমৃদ্ধির কথা বলেছে ছাগল আর সিংহের সমন্বয়ের বিশেষ মোটিফ। লোকজ ঐতিহ্যের চিত্র মেলে ধরে গাজীর পটের গাছ। চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শোভাযাত্রাটি শাহবাগ মোড় ঘুরে ঢাকা ক্লাব ও শিশুপার্কের সামনে দিয়ে টিএসসি হয়ে চারুকলার সামনে এসে শেষ হয়।
মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষ হওয়ার পর সংস্কৃতিকর্মীরা নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে পদযাত্রা বের করে। চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে এই পদযাত্রা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় সবার পরনে ছিল টি-শার্ট, যেখানে লেখা ছিল- ‘নুসরাত জাহান রাফি, কন্যা সাহসিকা’। এতে অংশ নেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, নাট্যজন ঝুনা চৌধুরী, ইশরাত নিশাত, সেলিনা শেলী, ড. মোহাম্মদ বারী, অনন্ত হিরা, মোহাম্মদ আলী হায়দার, অলোক বসু প্রমুখ।
অন্যদিকে নুসরাতের জন্মস্থান ফেনীর সোনাগাজীতে এবারের বর্ষবরণের আয়োজনে ছিল প্রতিবাদের বার্তা। সকাল সাড়ে ৯টায় সোনাগাজী মো. ছাবের সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠ থেকে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। পৌরশহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে অফিসার্স ক্লাব মাঠে গিয়ে এটি শেষ হয়। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সোহেল পারভেজের সভাপতিত্বে সংক্ষিপ্ত সভায় বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বক্তারা মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। এ ছাড়া যশোর, গোপালগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের নানা জায়গায় বর্ষবরণের আয়োজনেও ছিল নুসরাতের হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার দাবি এবং নতুন বছরে সব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার আহ্বান।
এদিকে রাজধানীতে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সুরের ধারা ও চ্যানেল আই। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। সকাল সোয়া ৬টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বর্ষবরণ উৎসবস্থলে এসে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা অনুষ্ঠান উপভোগ করেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী। বাংলার সঙ্গে বর্ষবরণের গান শোনানো হয় ভুটানি ভাষাতেও। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনও উপস্থিত ছিলেন এ অনুষ্ঠানে। এবারের এ আয়োজনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘লোক সুরে বাংলা গান’।
অন্যদিকে ‘জাগো নব আনন্দে’ স্লোগান ধারণ করে রাজধানীর শিশুপার্কের সামনে ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী বর্ষবরণ উদযাপন করে। উৎসবে সভাপতিত্ব করেন ঋষিজ সভাপতি ফকির আলমগীর। গান, নৃত্য, আবৃতিতে মাতিয়ে তোলেন শিল্পীরা। এ বছর ঋষিজ সম্মাননা প্রদান করা হয় সংগীতশিল্পী তপন চৌধুরী, আবৃত্তিশিল্পী ঝর্ণা সরকার ও ইকবাল খোরশেদকে। তাদের হাতে স্মারক তুলে দেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পহেলা বৈশাখে। মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। শোভাযাত্রাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, ওয়াইজ ঘাট, আহসান মঞ্জিল, মুন কমপ্লেক্স, পাটুয়াটুলী, বাটা ক্রসিং হয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে। মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল- ‘নদী’। মূল স্লোগান ছিল- ‘বাঁচলে নদী বাঁচবে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’।
এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দুই দিনব্যাপী বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল। পহেলা বৈশাখ সকাল ৮টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুক্তমঞ্চে হয় লাঠিখেলা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা এবং বিকেল ৩টায় একাডেমি প্রাঙ্গণে হয় হাডুডু খেলা, লাঠি খেলা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও লোকনাট্য পরিবেশনা।
বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে আয়োজন করা হয় নববর্ষ-বক্তৃতানুষ্ঠান। মূল বক্তা ছিলেন প্রাবন্ধিক-গবেষক মফিদুল হক। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন সেমন্তী মঞ্জরী, জুলি শারমিন, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, মশিউর রহমান রিংকু ও ইসরাত জাহান জুঁই। নববর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে একাডেমি প্রকাশিত ‘বইয়ের আড়ং’। ১০ বৈশাখ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে ‘বইয়ের আড়ং’।
এ ছাড়া হোটেল সোনারগাঁও, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল, ঢাকা রিজেন্সি, খাজানাসহ হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোর উদ্যোগে উদযাপিত হয় নতুন বছর। ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাব, অফিসার্স ক্লাবের উদ্যোগেও ছিল নানা আয়োজন। রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় ফ্যান্টাসি কিংডম ও বারইপাড়ার নন্দন পার্কে ছিল বৈশাখী কনসার্ট।
