ভারতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে লোকসভা নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে পুরো ভারতে চলছে উত্তেজনা। লোকসভা নিয়ে উত্তেজনার ভেতরেই কবীর সুমন তার রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করে ভক্তদের উদ্দেশ্যে বললেন কাকে ভোট দিতে হবে।
ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে কবীর সুমন ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে নানা কথা বলেন। তিনি এই নির্বাচনে বিজেপিকে বিদায় করার আহ্বান জানিয়েছেন ভক্তদের কাছে।
মনে মনে মার্কসবাদী এই কিংবদন্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভীষণ ভক্ত। তিনি নিজের স্ববিরোধিতা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি রাজনীতির মানুষ না হলেও, রাজনৈতিক মানুষ’।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কবীর সুমনকে প্রশ্ন করেন, আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যদি ‘আমি চাই’ গানটি লিখতেন, তাহলে কোন ইচ্ছার কথা সর্বাগ্রে বলতেন? জবাবে সুমন জানান, ‘বিজেপি-আরএসএস বিদায় হোক এই দেশ থেকে। যত দিন না ওরা এই অদ্ভুত, বিসদৃশ, অযৌক্তিক জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, জাতপাতের হিসেব – এগুলি বন্ধ করছে, ততদিন… তবে বলে রাখি, আমার কিন্তু বিজেপিতে বেশ কয়েকজন বন্ধু রয়েছেন।’
পরে অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার একাধিক বন্ধু ওই দলে থাকা সত্ত্বেও বলব, বিজেপি দলিত বিরোধী, মুসলিম বিরোধী, বড়লোককে তোয়াজ করা দল। তাই বিজেপি-কে চাই না।’
তিনি আরও বলেন, ‘হ্যাঁ, একটাই চাওয়া। বন্ধু, বিজেপিকে রুখতে হবে। একই সঙ্গে সরাসরি বলছি, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে হঠাতে গেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে ভোট দিতে হবে। অর্থাৎ বিজেপিকে সিরিয়াসলি সরাতে গেলে মমতাকে ভোট দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ভোট ভাগাভাগি চলবে না। আমি যে খুব তৃণমূলপন্থী, তা কিন্তু না। তবে এই ভোটে বিজেপিকে রুখতে মমতার হাত শক্ত করতেই হবে, এটাই বাস্তবতা।’’
এদিকে তিনি চান সিপিআই নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যও জিতুন। শুধু তাই নয়, কানহাইয়াকেও বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বলে জানান কবীর সুমন।
প্রণব মুখার্জিকে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চেয়ছিলেন। এখন মমতাকে ভারতের বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান উল্লেখ করে কবীর সুমন বলেন, ‘এক সময় মনে হয়েছিল, এক বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসাবে প্রণব মুখোপাধ্যায়কে দেখতে চাই, তেমনই এখন আমি বাঙালি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মমতাকে দেখতে চাই। আমি ভীষণ খুশি হব।’
মমতাকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি জানি, আমার ইনকনসিসট্যান্সি আছে। এইটাই আমি। দেখুন, আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভক্ত। আমার মায়ের পর এমন ডায়নামিক মহিলাই আর দেখিনি। সাংঘাতিক ডায়নামিক মহিলা। ‘ফেনোমেনান, সো ফুল অফ কনট্রাডিকশনস’। শুনেছি, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অতিথি খাতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “মাই গ্রেটেস্ট ভারচু অ্যান্ড মাই গ্রেটেস্ট ভাইস, দ্যাট ইজ মাই ইনকনসিট্যান্সি”। আমার নিজেরও তাই। মমতা এটা শুনলে হয়তো রেগে যাবে, কিন্তু মমতারও তাই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘মমতা আমার ছোট বোন, একসঙ্গে লড়াই করেছি। তাই মমতাকে প্রধানমন্ত্রী দেখতে চাই। তবে, মমতার ক্ষেত্রে আমার সবচেয়ে যেটা বেশি ভালো লাগে তা হলো ওর ব্যক্তিত্ব। কারও পরোয়া না করে সোজাসুজি কথা বলছেন। যেমন ধরুন, ও প্রথম যখন দার্জিলিঙে গেল (মমতাকে সুমন ‘তুমি’ সম্বোধন করেন), তখন মঞ্চে উঠে বলল, “আগে যো সরকার থা, রাজ্যকা বারোটা বাজাকে চলা গিয়া”। নিজের হিন্দিতে উনি যা বলেছেন, সত্যিই তো তাই। কিন্তু, এইটা বলার জন্য একজনই আছেন ভারতে, তার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তিনি ভারতে যুব সমাজকে নেতৃত্বের অগ্রভাগে ;দেখতে চান জানিয়ে বলেন, ‘ভারতের বর্তমান জনবিন্যাস অনুযায়ী, পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে যাদের বয়স, তাঁদের হাতেই নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। আমি স্বপ্ন দেখি, এমন একটা তরুণ-তরুণীদের দল নেতৃত্ব দিচ্ছেন।’’
রাহুল গান্ধী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘খুবই ভালো লাগে ছেলেটাকে। গোড়ার দিকে ওঁকে একটু উদ্ধত মনে হতো। পরে বুঝেছি, ওটাই ওঁর রক্ষণের কায়দা। আসলে সারাক্ষণ মানুষ ওর ওপরে হামলে পড়ত। ইদানীং উনি যেসব কথা বলছেন, তা শুনে বেশ ভালো লাগছে। তবে এই যে হঠাৎ করে প্রিয়াঙ্কা চলে এলেন, এটা ঠিক না। গুষ্টিসুদ্ধ রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার এই প্রবণতাটা ভালো লাগে না। কাজের লোক রাজনীতিতে থাক। এই যেমন ধরুন, শুভেন্দু অধিকারী। বাপের ব্যাটা, লড়াকু ছেলে। শুভেন্দু হলেন সঠিক মানুষ, যিনি রাজনীতিতে আছেন।’’
লোকসভা নির্বাচন নিয়ে তিনি ভবিষ্যদ্বাণীও করেন। তিনি বলেন, ‘বলা খুব মুশকিল। তবে বুঝলেন, বিজেপি হারবে। আর যদি পুরোপুরি না হারে তাহলেও সরকার গড়ার জন্য নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পাবে না। আসলে কী জানেন, ওরা যা করেছে, সে জন্যই আর ভোট পাবে না। ওদের ইতিহাসই ওদের আটকে দেবে। এই দেশটাকে বহু দিন ধরেই আমার আর নিজের দেশ মনে হয় না। নাম পরিবর্তনের জন্য সংখ্যাগুরুর গালিগালাজ শুনতে হয় আমাকে। ফলে এই দেশটা আর আমার না। বলতে পারেন, আমার দেশ হল এই বৈষ্ণবঘাটা বাই-লেন (কবীর সুমনের পৈতৃক বাড়ি)। আচ্ছা বলুন তো, এ দেশে যৌবনের প্রতীক কেন (ফুটবল কিংবদন্তি) গোষ্ঠ পাল নন? কেন পাগড়ি মাথায় দেওয়া ধর্মীয় বিবেকানন্দ যৌবনের প্রতীক হবেন?
