নদীকেন্দ্রিক নতুন স্বপ্ন

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৯, ১১:১৪ পিএম

আমাদের রাজধানী ঢাকার রয়েছে অহংকার করার মতো ঐতিহ্য। স্থাপনা ও পুরাকীর্তি মিলিয়ে যা রয়েছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। বিশ্বের সুন্দর অনেক শহরের অবস্থানই নদীতীরে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস কিংবা একশ সতেরটি ক্ষুদে দ্বীপের সংযুক্ত শহর ইতালির ভেনিস-এ আমরা যেমন মুগ্ধ হই, বুড়িগঙ্গার তীরের ঢাকাও হতে পারে তেমন মুগ্ধ হওয়ার মতো শহর। তবে এ জন্য যে বড় ধরনের উদ্যোগ দরকার বলা যায় তার প্রথম ধাপ শুরু হয়ে গেছে।

বুড়িগঙ্গার দুই তীরেই চলছে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অভিযান। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক বড় বড় স্থাপনাও। এরই মধ্যে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরের হাজার হাজার অবৈধ অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকা ভবন চারতলা, দোতলা, টিনশেড, স’মিল, ডকইয়ার্ড, রড-সিমেন্টের গোডাউন কিছুই বাদ যায়নি। ঢাকার নদীবন্দরের আওতাধীন এলাকায় সদরঘাট থেকে গাবতলী পর্যন্ত নদীর দুই তীরে যত অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত হয়েছে, সব জঞ্জাল পরিষ্কার। আর দখল নয়, এবার স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ। নদীর পাড়ে হবে ওয়াকওয়ে। লাগানো হবে পরিবেশ সহায়ক সৌন্দর্যবর্ধনকারী বৃক্ষ।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে নজর দিলে আমরা যেটা দেখতে পাই, তারা প্রকৃতির ভারসাম্য ঠিক রেখেই নগরায়ণ ঘটিয়েছে। নদীগুলো শুধু রক্ষাই করেনি, তার শোভাবর্ধন করেছে, আরও বেশি চলাচল উপযোগী করেছে। ঝকঝকে-তকতকে স্বচ্ছ পানির প্রবাহ। এতদিন আমরা চলেছি উল্টোপথে!  রাজধানীর প্রতিটি স্যুয়ারেজ লাইন, কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যরে লাইন শেষ হয়েছে নদীতে গিয়ে। বিষাক্ত মিশমিশে কালো পানিতে আমাদের এই নদীগুলোয় মাছ কেন, কোনো প্রকার জলজ প্রাণীই জীবন রক্ষা করতে পারছে না। এমনকি এই নদীর ওপর নির্ভর করে যারা বাঁচত, তারাও অনন্যোপায় হয়ে অন্য পথ ধরেছে। কিন্তু বারবার উচ্ছেদ আর দখলের খেলা আর চলতে দেওয়া যায় না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীগুলোর পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। যতই দুরূহ হোক না কেন, যদি তা-ই করা যায় এটা হবে বাংলাদেশের যোগাযোগ ইতিহাস বদলে দেওয়ার মতো একটা কাজ।

পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীসহ রাজধানীর চারপাশে বয়ে যাওয়া নদীগুলো বাঁচিয়ে তোলা বিশেষভাবেই অপরিহার্য। হাইকোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। হাইকোর্ট এটাও জানিয়ে দিয়েছে যে, নদী দখল-উচ্ছেদ নিয়ে কানামাছি খেলা বন্ধ হওয়া উচিত, গত ফেব্রুয়ারিতে তুরাগ নদ রক্ষায় করা রিটের ওপর রায় ঘোষণার জন্য ধার্য দিনে এমন মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। ঘোষিত রায়ে আদালত তুরাগ নদকে লিগ্যাল বা জুরিসটিক পারসন বা জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেন। বলার অপেক্ষা রাখে নাÑ নদী ভরাট, দখল, দূষণ করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছি আমরাই! নদীগুলোর মৃত্যু হচ্ছে বলে চিৎকার করছি, আবার দখল-দূষণেও মেতে থাকছি। নিজের ক’টা দিনের আয়েশ খুঁজছি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম কিংবা সবার কথা ভাবছি না। অথচ সবাই যার যার অবস্থানে একটু আন্তরিক হলেই নদীগুলোকে আমরা রক্ষা করতে পারি, এর প্রবহমানতা বৃদ্ধি করে প্রকৃতি ও মানুষের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারি। অনেকেই বলছেন. এটাতে সরকার ও ব্যক্তি উভয়কেই উদ্যোগী হতে হবে। এখন সরকার উদ্যোগী হয়েছে, আমাদেরও উচিত এই উদ্যোগটিকে সাফল্যম-িত করতে সহযোগিতা করা। একসময় এদেশ থেকে সুদূর কলকাতা পর্যন্ত চমৎকার নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ করা অবশ্যই সম্ভব।

এক সময় আমাদের ৩৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ছিল, এখন সেটা ১২ হাজার কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নৌপথ উদ্ধারে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে যাতায়াত ব্যবস্থা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখছি। আমাদের নৌপথ যেভাবে দখল হয়ে যাচ্ছিল, নদীর পাড় যেভাবে দখল হয়ে যাচ্ছিল বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা একটি আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।

সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে নদীদূষণ রোধ ও নাব্য বৃদ্ধিসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের ৩৮তম সভায় জানানো হয় ঢাকার পাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু এই তিনটি নদীর দুই তীরে ২২০ কিলোমিটার হাঁটার পথ তৈরি করবে সরকার। এ জন্য ব্যয় করা হচ্ছে সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ, উত্তরখান, তুরাগ, মোহাম্মদপুর, কামরাঙ্গীরচর, কোতোয়ালি ও মিরপুর থানা, গাজীপুর জেলা সদর এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর, বন্দর ও সোনারগাঁও উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। ‘বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে বিআইডব্লিউটিএ।

রাজধানী ঢাকা বুড়িগঙ্গা, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী ঘেরা। এসব নদীপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীতে রয়েছে ৩টি নদীবন্দরও। যা এখন প্রাণহীন। এসব বন্দরে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হবে। নদী গবেষকদের মতে, ১৭৮২ সালে জেমস রেনেলের মানচিত্রে বুড়িগঙ্গার যে গতিপথ দেখানো হয়েছিল তাতে নওয়াবগঞ্জ চরের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ থেকে নৌকা লালবাগ ঘাটে ভিড়ত। ১৮৬৪ সালেও বুড়িগঙ্গা বয়ে যেত লালবাগের কেল্লা, চৌধুরী বাজার, রায়ের বাজার এবং পিলখানার ঘাটের ধার ঘেঁষে। তাই বুড়িগঙ্গা ও এর আদি চ্যানেল বাঁচাতে সামগ্রিক পরিকল্পনা দরকার। ঢাকার মধ্যকার খাল, নালা, ডোবা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আনার জন্যই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ৫টি নদীর ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেবে এই টাস্কফোর্স। বাংলাদেশে সাত শতাধিক নদী রয়েছে। আমরা সব নদী রক্ষা করতে চাই। এরই মধ্যে নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। সংসদে এ কমিশন গঠন নিয়ে বিল পাস করা হয়েছে। নদী রক্ষা কমিশন এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। নদী নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করা হচ্ছে। আমরা এসব তৎপরতা দেখে নদী নিয়ে আশাবাদী হতে চাই।

একসময় ঢাকা শহরের আশপাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ ছাড়াও অনেক নদীর অস্তিত্ব ছিল। বর্তমানের ধোলাই খাল ছিল দোলাই নদী। এই খালের ওপরে বক্স কালভার্ট দিয়ে রাস্তা করা হয়েছে। আরেকটি নড়াই নদী, যার একটি অংশ হাতিরঝিল, আরেকটি ধানমন্ডি লেক। নড়াই নদীর ওপর কালভার্ট দিয়ে করা হয়েছে পান্থপথের রাস্তা। রাজধানীর চারপাশের নদী আর শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট-বড় ৪৬টি খাল ঠিক থাকলে ঢাকা হতে পারত অপরূপ সৌন্দর্যের নগরী। বিশ্বের সেরা শহরগুলোর মধ্যে শোনা যেত বাংলাদেশের রাজধানীর নাম। ঢাকার ৪৬টি খালের মধ্যে ২৬টির দায়িত্ব ওয়াসাকে দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর ব্যাপারে কোনো কিছু জানে না তারা। এর মধ্যে বড় খালগুলো ছোট হতে হতে ড্রেন আকার ধারণ করে কোনোমতে টিকে আছে। সব খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহও নেই। নগর পরিকল্পনাকারীদের মতে, অতীতে ঢাকার ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ও তাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলা হয়েছিল। চারদিকে নদী এবং অভ্যন্তরে ঢাকাকে ঘিরে রেখেছিল অসংখ্য পুকুর, জলাশয়, নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী খাল ও বিল। খালগুলো ঢাকার বুকে পাতার শিরা, উপশিরার মতো ছড়িয়ে থাকত এবং চারপাশের নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঢাকার পয়ঃনিষ্কাশন ও যানবাহন চলার একটি চমৎকার ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছিল। একসময় এসব কারণে ঢাকাকে অনেকে ইতালির ভেনিস শহরের সঙ্গে তুলনা করত। আর এখন বিশ্বের অপরিচ্ছন্ন ও বসবাসের অযোগ্য নগরীর নামের তালিকায় বারবার আসছে একসময়ের তিলোত্তমা নগরী ঢাকার নাম।

গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, খালগুলো দখল হওয়ার ফলে অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর অনেক এলাকা তলিয়ে যায়। যেকোনো মাত্রার বৃষ্টি হলেই রাজধানীর অনেক রাস্তায় পানি জমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। প্রধান সড়ক থেকে নগরীর অলিগলি পর্যন্ত বন্যার মতো পানি জমে থাকে। ঢাকার অধিকাংশ এলাকার সড়কে জলাবদ্ধতার ফলে রাজধানী হয়ে ওঠে তীব্র যানজটের নগরী। প্রধানমন্ত্রী রাজধানী ঢাকায় নতুন খাল খনন এবং পুরনো খালের সংস্কার ও জলাধার সংরক্ষণ এবং রাজধানীসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীতে ড্রেজিং কার্যক্রমের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বক্স কালভার্টগুলো উন্মুক্ত করে এর ওপর দিয়ে এলিভেটেড ওয়ে নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বুড়িগঙ্গাসহ রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোর দূষণ দূরীকরণে কী করা যায় তাও ভাবা হচ্ছে। ঢাকার চারপাশেই চলেছে দখলদারিত্ব। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ দখলের কবলে পড়েছে তুরাগ। দখলদাররা কোথাও কোথাও নদীর সীমানা পিলারও উপড়ে ফেলেছেন। পরিবেশ আন্দোলনকারীরা বলছেন, তুরাগে ১৫২টি সীমানা পিলারের মধ্যে ৯০টিই অবৈধ দখলের কারণে নিশ্চিহ্ন।

১৯১২ সালে প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ বইয়ে তুরাগ সম্পর্কে লেখা রয়েছে, ‘নদীটি ময়মনসিংহ জেলা হইতে আসিয়া দরিয়াপুরের নিকটে ঢাকা জেলায় প্রবেশ লাভ করিয়াছে। তথা হইতে পূর্বাভিমুখে কিয়দ্দূর আসিয়া রাজাবাড়ি, বোয়ালিয়া প্রভৃতি স্থানের পার্শ্বদেশ ভেদ করিয়া পূর্ববাহিনী হইয়াছে। শেনাতুল্লার সন্নিকটে মোড় ঘুরিয়া প্রায় সরলভাবে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হইয়াছে; এবং মির্জাপুর, কাশিমপুর, ধীতপুর, বিরলিয়া, উয়ালিয়া, বনগাঁও প্রভৃতি স্থান তীরে রাখিয়া মিরপুরের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার সহিত মিলিত হইয়াছে।’ ওই বইয়ে টঙ্গী নদীকে তুরাগের শাখা এবং মধুপুরের জঙ্গল থেকে বহির্গত শালদহ, লবণদহ ও গোয়ালিয়র নদী তুরাগে মিলিত হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ওই বইয়ে উল্লিখিত শালদহ, লবণদহ ও গোয়ালিয়র নদী তিনটির মধ্যে শালদহ ও লবণদহ গাজীপুরের শ্রীপুর অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হতো। ইতিহাস মিলিয়ে দেখতে গেলেই বোঝা যায় এইসব নদনদী কীভাবে অস্তিত্বহীন করা হয়েছে। সারা দেশেই নদনদীর ওপর এমন অত্যাচার চালিয়েছে প্রভাবশালী দখলবাজরা। দেশজুড়ে নদীদখল রোধে যে অভিযান চলছে তার সাফল্য সময়েরই দাবি। আর তার সঙ্গে দরকার নদীতীর ঘেঁষে নতুন কর্মপরিকল্পনা। তাহলেই অনায়াসে নতুন স্বপ্নের বুননে গড়ে উঠবে মুগ্ধ হওয়ার মতো এক অনন্য বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত