মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভাষা আন্দোলন থেকেই আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের বীজ থেকে স্বাধিকারের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের দিকে অগ্রসর হয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়েও আমরা
বি-উপনিবেশীকরণের পথে খুব একটা অগ্রসর হতে পারিনি। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি ছাড়া কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে যে উপনিবেশের প্রলম্বিত অভিঘাত থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়, দুনিয়ার ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। এই বিবেচনায় দেশের ভাষা পরিস্থিতির দিকে তাকালে আমাদের অনগ্রসর অবস্থানটা খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়। দেশে সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রচলনের জন্য আইন রয়েছে, রয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশনাও। তথাপি, শিক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং আইন-আদালতেও বাংলা ভাষা এখনো উপেক্ষিত। বলা ভালো, দেশে সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠা এখনো একটি প্রপঞ্চ হয়েই আছে।
সম্প্রতি ইংরেজি ভাষাকে ‘দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা’ হিসেবে চালু করার বিষয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদনের কারণে নতুন করে দেশের ভাষা পরিস্থিতির মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে হচ্ছে। লক্ষ করা প্রয়োজন যে, দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষার কোনো স্বীকৃতি বা বিধান ব্যতিরেকেই ইংরেজি ভাষা বাস্তবিক অর্থে ইতিমধ্যেই সরকারি-বেসরকারি দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যে পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্যই ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন’ করা হয়েছিল। কিন্তু তিন দশক পেরোলেও তা কেবল কাগজ-কলমের আইনই রয়ে গেছে, প্রায়োগিক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই আইন লঙ্ঘন না করে সর্বস্তরে বাংলা চালুর জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনারও কয়েক বছর পেরিয়েছে। কিন্তু অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, বিপণিবিতান থেকে শুরু করে গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, নামলিপি, নম্বর প্লেটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনো বাংলা ভাষা নয়, ইংরেজি ভাষা ব্যবহারের নজিরই অব্যাহত রয়েছে। তাহলে ‘দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা’র স্বীকৃতির প্রয়োজন কীসের স্বার্থে? এমন স্বীকৃতি সমাজে কী বার্তা দেবে তা নিয়েও বিশদ আলোচনা প্রয়োজন।
ভাষা এবং সাংস্কৃতিক রাজনীতি বহুমাত্রিক ও জটিল একটি বিষয়। জাতীয়তাবাদী চরিত্রের মতোই এর একটি অর্থনৈতিক ও শ্রেণিচরিত্র রয়েছে। দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের পক্ষে কখনোই একটি বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করে তার বাজারি সুবিধা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীকে একটি বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করিয়ে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলাও অত্যন্ত কঠিন। এই ক্ষেত্রে প্রাচ্যের চীন-জাপানের অভিজ্ঞতাকে আমলে নিলে আমরা দেখতে পাব মাতৃভাষায় গণিত-বিজ্ঞান-চিকিৎসা-প্রযুক্তি থেকে শুরু করে মানবিক ও কলা শিক্ষার লক্ষ্যে অনুবাদের ওপর গুরুত্বারোপ করে তারা কতটা দ্রুত অগ্রসর হতে পেরেছে। কেবল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নয়, মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষায় গুরুত্ব প্রদানই তাদের এই অগ্রগতির নেপথ্যে উল্লেখযোগ্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এদিক থেকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তুলনা করলে দেখা যাবে এমনিতেই সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় বিভক্ত হয়ে থাকা আমাদের শিক্ষার্থীরা কতটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে। সাধারণ স্কুল-কলেজে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা প্রদান করা হলেও মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যমে মাতৃভাষা বাংলা এখনো খুবই উপেক্ষিত। আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চর্চা বাড়াতে না পারায় মানসম্মত উচ্চশিক্ষা এখনো সুদূরপরাহত হয়ে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, সে লক্ষ্যে প্রস্তুতির জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন। আগে বাংলা ভাষার গাঁথুনিটা পোক্ত করা প্রয়োজন, তারপর ইংরেজি শিক্ষার পত্তন। তা না করে ইংরেজিকে ‘দ্বিতীয় দাপ্তরিক ভাষা’ করা হলে তা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতোই হবে। এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর এক ভাষণের কথা দিয়ে উপসংহার টানা যেতে পারে। ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে এক বক্তৃতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমি ঘোষণা করছি, আমার দল ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই সকল সরকারি অফিস, আদালত ও জাতীয় জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে বাংলা চালু করবে। এ ব্যাপারে আমরা পরিভাষা সৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করব না। কারণ, তাহলে সর্বক্ষেত্রে কোনো দিনই বাংলা চালু করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় হয়তো কিছু কিছু ভুল হবে। কিন্তু তাতে কিছু যায়-আসে না। এভাবেই অগ্রসর হতে হবে।’
