শিবরামকে চিনতে শিব্রাম বনাম শিবরাম

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৩৬ পিএম

শিবরাম চক্রবর্তী বাংলা সাহিত্যের এক বিস্ময়কর লেখক। বাংলা সাহিত্যে হাসির গল্পের লেখকদের নাম বলতে গেলে শুরুতেই যার নাম মনে আসে তিনি শিবরাম চক্রবর্তী (১৯০২-১৯৮০)। শিবরাম চক্রবর্তী নিজের নামের বানান লিখতেন শিব্রাম। এখান থেকেই তার সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। ‘শিব্রাম চকোরবরতি’ যে লেখক নিজেকে নিয়ে এমন স্যাটায়ার করতে পারেন, তিনি অবশ্যই বড় মাপের লেখক। প্রেমেন্দ্র মিত্র তার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্যে ছোট গল্পকারের অভাব নেই। কিন্তু হাসির গল্পের জাত সাহিত্যিক মাত্র দুজন পরশুরাম (রাজ শেখর বসু) ও শিবরাম চক্রবর্তীন

শিবরাম চক্রবর্তী শিশুদের জন্য লিখেছেন প্রচুর। বিনির দাদা শিব্রাম, যিনি রেফারি নামক ঢালের পেছনে দাঁড়িয়ে, আড়াল থেকে ঘুষি চালিয়ে আর রেফারিকে ঘুষি খাইয়ে নামকরা বক্সারকে হারিয়ে বিনির কাছে মুষ্টিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে চান! তিনি যে আবার গল্পের আড়ালে বাস করা একজন একাকী বিষণ্ন মানুষ। সরল বক্রোক্তিতে সামাজিক অসংগতিকে ধরিয়ে দেওয়া এক দুঃসাহসিক ব্যক্তিত্ব বা কখনো কখনো বড়দের জন্য হয়ে ওঠা এক বিতর্কিত লেখক তখন তিনি আলোচনার বিষয় বৈকি! শিবরাম চক্রবর্তীর অনবদ্য সৃষ্টি হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন সিরিজের দুই ভাইয়ের চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে তিনি সমাজের নানা অসংগতি প্রহসনে নির্মাণ করেছেন। হর্ষবর্ধন ও গোবর্ধন এই দুই ভাই আসামে কাঠের ব্যবসা করে প্রচুর টাকা-পয়সা কামিয়েছেন, আর সেই কাঁচা পয়সা ওড়াতেই উঠতি বড়লোকের পেজোমি, যা যা করতে পারা যায়, তা করতেই তাদের কলকাতায় আসা। তাই বাস কন্ডাক্টরের হাতে এক শ টাকা ধরিয়ে দিয়ে হর্ষবর্ধন নিশ্চিন্ত থাকেন এই ভেবে যে, এখন পুরো বাসটার মালিক সে। আবার কোনো এক সিরিজে হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন অমরত্ব লাভের জন্য লেখক নন্দলালকে দেখে প্রাণপণে সাহিত্যিক হওয়ার চেষ্টা করে। সেখানে লেখক হতে চাওয়া হর্ষবর্ধন একটা বইয়ের দোকানই কিনে ফেলে। তারপর রাত গভীর হলে দোকানের সব বইয়ে রাবার স্ট্যাম্প মেরে যেতে থাকে। যেখানে বইয়ের লেখকের নাম বরাবর স্ট্যাম্পের ছাপ পড়তে থাকে ‘শ্রী হর্ষবর্ধন সম্পাদিত’ আর ছবির ওপর অন্য একটা স্ট্যাম্পে লেখা ‘শ্রী হর্ষবর্ধনের নির্দেশে অঙ্কিত’।

সংস্কৃতি জগতের এই আপাত হাস্যকর অথচ আসলে গভীর দুঃখের ও ট্রাজিক ধারাবাহিকতা লক্ষ করেছিলেন শিবরাম। পয়সা থাকলেই সবকিছু হওয়া যায়, এমনকি লেখক-কবিও। এ খেলা তো আগের রাজা-জমিদাররা অনেক দেখিয়েছেন। ভাড়াটে লেখক দিয়ে তারা একের পর এক গ্রন্থ রচনা করিয়েছেন নিজেদের নামে। আর পরে পয়সার মালিক বড় বড় পত্রিকার কর্তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কে লেখক আর কে লেখক নন। তাদের এই প্রচারে হয়তো তেমন কিছু এসে যায় না। কিন্তু আমজনতা, যারা পয়সা খরচ করে পত্রিকা কিনছেন এবং খুঁটিয়ে পড়ছেন, তারা এই চাকচিক্যময় প্রচারে খানিকটা বিভ্রান্ত হন বৈকি! শিবরাম চক্রবর্তী হাসির ছলে হর্ষবর্ধন-গোবর্ধনকে দিয়ে সাহিত্য জগতের এই বে-আক্কেলপনা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা আজও সত্য। কিন্নর রায় শিবরাম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেন, ১৯২৮-২৯ সালে তিনি লিখেছিলেন, “‘মস্কো বনাম পিচেরি’ কিন্তু তারপর কী যে হলো, মস্কো বনাম পচেরির বিতর্কিত প্রাবন্ধিক ‘দেবতার জন্মের’ মতো গল্পের লেখক ‘মানুষ’, ‘চুম্বন’ নামের কবিতার রচয়িতা শিবরাম একটু একটু করে ছোটদের লেখক, হাসির রাজা, রস সাহিত্যিক, পানের কারিগর এসব ফ্রেমে আটকা পড়ে যেতে থাকেন। এই ফ্রেমবন্দি হয়ে পড়া হয়তো তার পলাতক মনের নিছক টালমাটাল হাতছানি।”

তার স্বভাবে পলায়নপরতা ছিল স্পষ্ট। তার লেখা বই ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ নিয়ে চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র। ‘মস্কো বনাম পিচেরি’ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, যেখানে কমিউনিজম তত্ত্ব নিছক কথার ছলে শিবরাম কি অভাবনীয় ধারায় ভারত তত্ত্বের কথা বলে গেছেন। সেই সময়কার রচনায় তার সহজিয়া গদ্যভাষা যে কত কূট প্রস্তাবটির নিষ্পত্তি করে দিয়েছে, সেও কম অবাক ব্যাপার না। বোদ্ধারা কখনো বা একে গোঁড়ামিপূর্ণ ভেবেছেন। কিন্তু এ কথাও সত্যি যে, তারুণ্যের সাহসকে গোঁড়ামি ভাবাও এক ধরনের গোঁড়ামি। সেই সময়কার শিবরাম বলছেন, ‘বার্ধক্য ভালো, কিন্তু যৌবনের চেয়ে ভালো নয়; কেননা তা সৃষ্টিশক্তিকে বন্ধ্যা আর দৃষ্টিশক্তিকে আচ্ছন্ন করে দেয়।’ তার ধারালো কলমের আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি কেউ। সমাজবাদী উদারনৈতিক মানবিকতাকে সম্পদ করে সে যুগের চিন্তাশীল শিবরাম নলিনীকান্ত গুপ্তের গীতা-উপনিষদভিত্তিক ধোঁয়াটে তত্ত্বকথাকে নস্যাৎ করেছেন, মহেন্দ্র রায়ের একরোখা ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যকে ধূলিসাৎ করেছেন। দুঃসাহসিক নির্মমতায় শচীন সেনের ধনসঞ্চয়ের অর্থনীতিকে অর্থহীন করে দিয়েছেন। সুরেশ চক্রবর্তীর অতিমানববাদের তত্ত্ব যুক্তির তীরযোগে অসাড় করে দিয়েছেন।

সমাজের মানুষে মানুষে মমত্ত্ব ও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশ মানবিকতার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ বলে শিবরাম মনে করেন। আর তাই রবীন্দ্রনাথের মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান বিশ্বভারতীও তার কাছে উদ্দেশ্যহীন মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘দেশের ও বিদেশের সাধারণ বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় এর এমন কোনো মৌলিক প্রভেদ নেই, যাতে এর অস্তিত্বের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ হতে পারে। এ যুগে আর সব ইউনিভার্সিটির কাজ যেমন হায়ার অর্ডার অব মেডিওক্রিটি সৃষ্টি করে পেটেন্ট মানুষের সংখ্যা বাড়ানো বিশ্বভারতী ঠিক তাই নয় কি?’ আর তাই সে সময়ে শিবরামের দুঃসাহসিক মন্তব্য, ‘বিশ্বভারতী রবীন্দ্রনাথের এক বিরাট অপকর্ম।’ কারণ তার মতে, মানুষকে ট্রেনিং দেওয়া মানে মানুষকে তার স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের পথ থেকে বিচ্যুত করা। তাই তো তিনি বলেছেন, ‘ বিশ্বভারতী রবীন্দ্রনাথের নিজের কাছে যতটা প্রয়োজন সাধন করেছে, দেশের পক্ষে ততটা বিশিষ্ট হয়ে ওঠেনি।’

শিবরাম চক্রবর্তী যিনি একই সঙ্গে বহু ঘটনার ধারক। তার ঘটনাবহুল জীবন গল্পকেও হার মানায় রাজপরিবারে জন্ম অথচ বঞ্চিত, স্বদেশি আন্দোলনে যোগদান, সাংবাদিকতা, জেলখাটা, যুগান্তর পত্রিকা চালানো, বসুমতি পত্রিকায় ‘বাঁকা চোখে’ নামে সংবাদ টিপ্পনী লেখা, ফিচার লেখা, ছোটদের জন্য বেশি বেশি লেখা, বড়দের জন্যও লেখা, লিখেই জীবিকা অর্জন করা, সর্বোপরি একটা মেসবাড়িতে আমৃত্যু ষাট বছর কাটিয়ে দেওয়া এতগুলো এমন ঘটনা যখন একজন লেখকের জীবনে ঘটে আর সেই লেখককে এক মলাটে পাওয়ার বাসনা যদি কোনো পাঠকের থাকে, তাহলে পাঠককে অবশ্যই পড়তে হবে ‘শিব্রাম বনাম শিবরাম’ বইটি।

প্রকাশক : মিত্র ও ঘোষ, কলকাতা

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত