হাফেজ কাদেরের কক্ষে বসেই নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৪৪ এএম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আরও দুজন। তারা হলো আবদুর রহিম ওরফে শরীফ ও হাফেজ আবদুল কাদের। গত বুধবার  এবং গতকাল বৃহস্পতিবার ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফউদ্দিন আহমদের আদালতে ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি দেয় তারা। অন্যদিকে নুসরাত হত্যায় গ্রেপ্তার মো. শামীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল দুপুরে একই আদালতের বিচারক এ আদেশ দেন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগের বিশেষ সুপার মো. ইকবাল দেশ রূপান্তরকে জানান, নুসরাত হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গত বুধবার আদালতে জবানবন্দি দেয় আবদুর রহিম ওরফে শরীফ। এদিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আদালতে আনা হয় তাকে। রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত টানা ছয় ঘণ্টা তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। এর আগে গত ১৪ এপ্রিল আদালতে নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমের দেওয়া জবানবন্দির তথ্যের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। শরীফ তার জবানবন্দিতে নুসরাতকে হত্যা পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে।

শরীফের জবানবন্দি উদ্ধৃত করে পিবিআই কর্মকর্তা মো. ইকবাল বলেন, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নির্দেশে ও পরামর্শে নুসরাতকে হত্যার জন্য গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগানো হয়। এজন্য ২৮ ও ৩০ মার্চ দুই দফা কারাগারে থাকা সিরাজের সঙ্গে দেখা করে শরীফ। এরই ধারাবাহিকতায় ৪ এপ্রিল সকালে সোনাগাজীতে ‘অধ্যক্ষ সাহেব মুক্তি পরিষদ’র সভা করা হয়। পরে ওই দিনই রাতে নুসরাত হত্যা মামলার আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরের কক্ষে শরীফসহ ১২ জনের উপস্থিতিতে এক সভায় নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। তার (শরীফ) দায়িত্ব পড়ে মাদ্রাসার ফটকে। সেখানে নুরউদ্দিন ও আবদুল কাদেরও ছিল। মাদ্রাসার ছাদে বোরকা পরিহিত অবস্থায় ছিল শাহাদাত, জোবায়ের ও জাবের। এছাড়া ছাদে ছিল কামরুন নাহার মণি ও উম্মে সুলতানা পপি।

এদিকে গতকাল একই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় নুসরাত হত্যা মামলার অন্যতম এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদের। বেলা ১১টা থেকে জবানবন্দি রেকর্ড শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তা শেষ হয়। কাদের জবানবন্দিতে বলেছে, সে ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। ঘটনার দিন হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়াদের নিরাপত্তায় মাদ্রাসার ফটকে পাহারায় ছিল সে। এছাড়া এই হত্যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যেও অন্যতম। তার কক্ষে বসেই নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

কাদের সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক ও ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গত মঙ্গলবার রাতে তাকে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নুসরাত হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত চারজনের জবানবন্দি আদালত রেকর্ড করেছে। তারা সবাই হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে।’

এর আগে গত ১৪ এপ্রিল নুসরাত হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় মামলার অন্যতম আসামি নুরউদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম।

 

পাঁচ দিনের রিমান্ডে শামীম

নুসরাত হত্যায় গ্রেপ্তার মো. শামীমকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছে আদালত।

কোর্ট পরিদর্শক গোলাম জিলানী দেশ রূপান্তরকে জানান, শামীমকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পদির্শক শাহ আলম সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে।

এর আগে গত সোমবার বিকেলে সোনাগাজী উপজেলার পশ্চিম তুলাতলি গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শামীমকে। সে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী।

গত ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজীতে স্থানীয় ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ (বর্তমানে বরখাস্ত) সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন ওই মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি। এতে অধ্যক্ষের রোষানলে পড়েন তিনি। পরে গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষার দিন সকালে ওই মাদ্রাসা ভবনের ছাদে নুসরাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সিরাজের অনুসারীরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঁচ দিন চিকিৎসার পর গত ১০ এপ্রিল রাতে মৃত্যু হয় নুসরাতের।

আলোচিত এ মামলা এ পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। এদের মধ্যে রয়েছে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মুকসুদ আলম, শিক্ষক আবছারউদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের হোসেন, নুরউদ্দিন, শাহাদাত হোসেন, মো. শামীম, কামরুন নাহার মণি, জান্নাতুল আফরোজ ও শরিফুল ইসলাম ওরফে শরীফ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত