নুসরাত জাহান রাফিকে হারিয়ে পুরো দেশ এখন কাঁদছে। বিচার চাইছেন সবাই। তাদের পরিবারের কী অবস্থা? কেমন ছিলেন তিনি? তার বাড়ি ঘুরে লিখেছেন রাশেদুল হাসান
২০ বছর আগে, ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর; এ কে এম মূসা মানিক ও শিরিনা আক্তারের ঘরে এলো মেয়ে। তারা নোয়াখালীর ফেনীর সোনাগাজী পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামে থাকেন। এই বাড়িকে আশপাশের মানুষ মাওলানা ওমরের বাড়ি নামে চেনেন। পরিবারটির কর্তা-গিন্নির আরও দুটি ছেলে আছে মাহমুদুল হাসান নোমান, আহমাদুল হাসান আরমান। এরপর মেয়েটি। বাবা আদর করে নাম রাখলেন ‘নুসরাত জাহান’; ডাক নাম দিলেন ‘রাফি’। এ কে এম মুসা মাদ্রাসাশিক্ষক। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সরাফতিয়া ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষক, ইবতেদায়ি শাখার প্রধান। ২৪ বছর ধরে এখানে পড়ান। গ্রামের আখতার মিয়া জামে মসজিদেরও খতিব। মুক্তোর মতো দেখতে মেয়েটিকে সব সময় বাবা ডাকতেন, ‘মুক্তা’, অন্যরা ‘রাফি’। বন্ধুরা ‘নুসরাত’। বাড়ির আত্মীয়দের কোলে কোলে নুসরাত বড় হতে লাগলেন। খুব শান্ত বলে তার সঙ্গে থাকতেও ভালো লাগত। চাচাতো বোন রাশেদা আক্তার তার ছোটবেলার খেলার প্রথম সাথি হলেন। অন্য চার শরিকের শিশুদের সঙ্গে বেড়ে উঠলেন তিনি। পুতুল, কানামাছি, দড়ি লাফ একসঙ্গে খেলেছেন।
এই পরিবারটি ধর্মভীরু। ছোটবেলা থেকে নুসরাত ধর্মানুসারে চলেছেন, ধর্ম পালন করেছেন, পোশাকও পরেছেন ইসলাম মেনে।
মায়ের সঙ্গে তার ছোট থেকে খুব খাতির। সব সময় মায়ের পেছনে ঘুরেছেন। দিনের বেশির ভাগ মা-মেয়ের একসঙ্গে কেটেছে। বড় ভাই নোমান, আরমানেরও বোন খুব আদরের। ভাই-বোনে টুকটাক লেগেছে, খুব মধুর সময়ও কেটেছে। একমাত্র বোনটির কোনো আবদারে কখনো কারও না নেই। ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হানেরও বন্ধু ছিলেন নুসরাত। ভাইকে সব বলতেন। দুজনে একত্রে মাদ্রাসায় যেতেন। এই ফেব্রুয়ারিতে মাদ্রাসা থেকে সবাই আনন্দ ভ্রমণে গেলেন। আড়াই হাজার টাকা লাগবেÑ বোনকে বলা মাত্র উত্তর দিলেন, ‘ভাবিস না, আমি দিয়ে দেব।’ রাতেই জমানো টাকা থেকে দুই হাজার, সকালে বাকিটা দিয়ে দিলেন। তবে কোনো এক কারণে রায়হানের যাওয়া হয়নি। ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় নুসরাতের বেশ খুব আগ্রহ ছিল। তার পড়ালেখার শুরু এলাকার তালিমুদ্দীন হালিমিয়া নুরানি মাদ্রাসায়। সেখান থেকে খাদিজাতুল কোবরা দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২০১২ সালে ইবতেদায়ি পাস করলেন। এরপর ২০১৫ সালে জেডিসি (জুনিয়র দাখিল এক্সামিনেশন), ২০১৭ সালে দাখিল পাস করলেন। সবগুলো পরীক্ষায় বেশ ভালো করেছেন। তারপর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। এই মাদ্রাসা থেকেই এবার আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। স্বপ্ন ছিল এইচএসসি সমমানের এই পরীক্ষায় ভালোভাবে পাস করে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেবেন।
বই পড়তে ভালোবাসতেন। বাড়িতে ফুলের চারা রোপণ করতেন। নিজের হাতে পিঠা বানাতেন, অনেক আচারের রেসিপি জানতেন। খুব আচার খেতেন। প্রায় সব পদের রান্না করতে পারতেন। তবে তার নিজের পছন্দ ছিল মাছ ও ভাত। তার রান্না করা পোলাও-মাংস খেয়ে প্রশংসা করেননি এমন মানুষ নেই। তিনি চায়ের পোকা ছিলেন। চা বানাতে, খেতে খুব চাইতেন। এত চা খাওয়ার জন্য কত বকা শুনেছেন। তবু তাকে থামানো যায়নি, লুকিয়ে হলেও খেয়েছেন। ঈদের দিন অবশ্য নুসরাতকে বাড়ির কেউ কিছু বলতেন না। বাবা নতুন জামা কিনে দিতেন। নিজের হাতে মেয়ে নানা পদ রান্না করতেন। সবাই মিলে খেতেন।
প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠতেন। এরপর নামাজ পড়ে, খেয়ে, মাকে সাহায্য করে ভাইয়ের সঙ্গে মাদ্রাসায় যেতে প্রস্তুত হতেন। বিকেল পর্যন্ত ক্লাস করে বাড়ি ফিরতেন। খেয়ে-দেয়ে ঘর গোছাতেন, গল্পের বই পড়তেন। মানুষের সঙ্গে মিশতেন। সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। তাই নুসরাতকে সবাই ভালোবাসতেন। অসহায়কে দেখলেই তিনি সাহায্য করতেন।
তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিলেন রাশেদা। পরে ফুর্তি, নিশাত, তামান্না, সাথী বন্ধু হলেন। বন্ধুদের দেখলেই প্রথমে বলতেন, ‘আই লাভ ইউ’। কয়েক দিন দেখা না হলে মন খারাপ করে জানাতেন ‘আই মিস ইউ’। বান্ধবীদের প্রায়ই নিজের হাতে বানানো খাবার খাওয়াতে জোর করে বাড়িতে নিয়ে আসতেন। আগে চা দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। নুসরাতের চা এখনো তাদের মুখে স্বাদ হয়ে আছে।
বাড়ির অন্যদেরও তার কথা খুব মনে পড়ে। ফুফাতো ভাই ইয়াসিন একই মাদ্রাসায় দশম শ্রেণিতে (দাখিল) পড়েন। তার মনে আছে ‘নানু বাড়ি এলেই নুসরাত আপু খুব আদর করতেন। আমাকে, রায়হানকে ভালোভাবে পড়ালেখার জন্য বলতেন, বকাও দিতেন।’
মাকে ছাড়া থাকতে পারতেন না বলে তার তেমন ঘোরা হয়নি। বছর তিন-চার আগে পরিবারের সবাই মিলে চট্টগ্রামের মিরসরাই গিয়েছিলেন। বিখ্যাত মহামায়া লেক দেখেছেন। মাকে ছাড়া কোথাও কোনো দিন যাননি নুসরাত। মায়ের সঙ্গে ঘুমাতে ভালোবাসতেন। মাদ্রাসা থেকে ফিরে তাকে জড়িয়ে ধরতেন। ছোটবেলা থেকে এই অভ্যাসের জন্য মা কত বকেছেন। তবু মায়ের গন্ধ, ভালোবাসা মেয়ে ছাড়েননি। সেই মেয়ে নেই বলে মা খুব কাঁদছেন। ‘রাফি’, রাফি বলে বলে বিলাপ করে চোখের পানি ফেলছেন, অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন। বাবারও জীবন শেষ। দিনের বেশির ভাগ সময় তিনি কাজে বাইরে থাকলেও রাতে ফিরলেই মেয়ে তার পেছনে ছুটত। নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াত। চেয়েছিলেন, লেখাপড়া শেষ করলে মুক্তাকে ভালো ঘরের প্রতিষ্ঠিত, সৎ ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেবেন। বিদেশে থাকেন এমন অনেক ছেলের পরিবার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। মা-বাবা মেয়েকে আড়াল করবেন না বলে রাজি হননি। দেশে থাকা ছেলের সঙ্গেই তারা নুসরাতের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। এই বছরের ২৭ মার্চ ছোটবেলার বন্ধু রাশেদার বিয়ে হয়েছে। সেদিন নুসরাতের খুশি দেখে কে? সেই মেয়েকে হারিয়ে বাবা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, প্রশাসন ছাড়া কথা বলছেন না। তবু এই সাংবাদিকের সঙ্গে বুধবার (১৭ এপ্রিল) কথা বললেন। সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ভেতরে দাঁড়িয়েই বারবার বলেছেন, ‘আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই।’
