রাজধানীর মিরপুরের ৭ নম্বর সেকশনে এলাকাবাসীর চলাচলের পথ আটকে সরকারি জমি ও ফুটপাত দখল করে এক ছাত্রলীগ নেতা স্থাপনা নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা মহানগর উত্তর (রূপনগর থানা ছাত্রলীগ) এর ব্যানার লাগিয়ে রূপনগর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ শুভ এ স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন। রূপনগর থানা ছাত্রলীগের কার্যালয় করতে এই স্থাপনা নির্মাণ করছেন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা শুভ। তবে এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, ছাত্রলীগ কার্যালয়ের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে চলছে মার্কেট নির্মাণের কাজ।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুরের ৭ নম্বর সেকশনের মিল্ক ভিটা মোড়ে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) জমিতে ইট গেঁথে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করছে সাত-আটজন শ্রমিক। সেখানে ঝোলানো রয়েছে ‘ঢাকা মহানগর (উত্তর) ছাত্রলীগ ও রূপনগর থানা ছাত্রলীগ’ লেখা একটি ব্যানার। পাশেই বসে আছে একদল যুবক। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই যুবকরা ছাত্রলীগ নেতা শাকিল আহমেদ শুভ ও অপুর অনুসারী। এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত শুক্রবার থেকে শুরু হয় এই স্থাপনাটির নির্মাণকাজ। খবর পেয়ে জাগৃক কর্মকর্তারা এসে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের কাজে বাধা দিলে সেখানে ঝোলানো হয় ছাত্রলীগের ব্যানার। একই সঙ্গে গতকাল দুপুর থেকে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়িয়ে কাজের গতিও বাড়ানো হয়। এখন সেখানে জোরেশোরে চলছে নির্মাণকাজ। স্থানীয় বাসিন্দা নূর আলমসহ আরও কয়েকজন মিলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও কাজ থামাতে পারেননি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয়-সাত ফুট উঁচু দেয়াল উঠে যায়। এ স্থাপনাটি নির্মাণ হলে পাশের বেশ কয়েকটি বাড়ির বাসিন্দাদের চলাচলের পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়বে বলে তারা জানিয়েছেন। বাড়িগুলোর বাসিন্দারা তাদের চলাচলের পথ হিসেবে জাগৃকের এই খোলা জায়গাটি ব্যবহার করে থাকেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমনই একটি বাড়ির মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চার রাস্তার মোড়ে ২৫ ফুট চওড়া আর ১৬০ ফুট লম্বা খালি জায়গা রয়েছে। এখানে এর আগে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন কয়েকটি দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছে। পরে মূল্যবান এ জায়গাটিতে চোখ পড়ে ছাত্রলীগ নেতা শুভ ও অপুর। তারা বেশ কয়েকবার এখানে দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের চেষ্টায় পেরে ওঠেনি। এবার টানা সরকারি ছুটির সুযোগে রাতারাতি সেখানে ছাত্রলীগের কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে মার্কেট নির্মাণ করছে। মূলত পুরো জায়গাটিতেই দোকান নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।’
এদিকে সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ করে এভাবে সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এলাকার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে রাজধানীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকায় বিপুল অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আর এখানে ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে দোকানপাট নির্মাণ করছে। বিষয়টি আমাদের জন্য দুঃখজনক। এ নির্মাণের সঙ্গে জড়িতরা স্থানীয় সাংসদ ও কাউন্সিলরের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় দলের কেউ কিছু বলতে পারছে না।’
তবে স্থানীয় সাংসদ (ঢাকা-১৬) ইলিয়াছ উদ্দিন মোল্লা এই অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগকে বলে দিয়েছি, সেখানে কোনো অফিস বা দোকান নির্মাণ করা যাবে না। সরকারি জমি যেভাবে আছে সেভাবেই থাকবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর (উত্তর) ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘ছাত্রলীগের জমি দখলের মতো কাজে জড়িত থাকা উচিত না। যারা ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে এ ধরনের দখলে মেতে উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জাগৃকের জমিতে স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে সংস্থাটির সদস্য (প্রকৌশল ও সমন্বয়) ফজলুল কবীর বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। শুনে মিরপুরের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলীকে তাৎক্ষণিক সেখানে গিয়ে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থাপনাটি যতটুকু নির্মিত হয়েছে সেটুকু ভেঙে দেওয়া হবে।’
রাজউকের অথরাইজড অফিসার মোবারক হোসেন বলেন, ‘এটি জাগৃকের জায়গা, নিয়ম অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনার বিষয়টি তাদেরই দেখার কথা। এরপরও আমরা রাজউকের পক্ষ থেকে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব।’
দখলের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতা শাকিল আহমেদ শুভ বলেন, ‘আমরা ফুটপাতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করছি না। সেখানে অফিসের জন্য একটি স্থাপনা করা হচ্ছে। সেটি সরকারি জমি তা অস্বীকার করব না। এ ছাড়া সেখানে আরও কিছু দোকান আছে, সেগুলো তো সরকারি জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব নিয়েও আপনারা কাজ করতে পারেন।’
