২৭৪ থেকে এক লাফে বেড়ে হলো ৩২৪। বাংলায় তৃতীয় দফার নির্বাচনের আগে এক ধাক্কায় আরও ৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করে দিল নির্বাচন কমিশন।
ভোটে শান্তিরক্ষায় শাসকের ‘ধামাধরা’ রাজ্য পুলিশে ভরসা নেই বিরোধীদের। ভরসা নেই কমিশনেরও। এই কথাটাই মান্যতা পেল অবশেষে। নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করতে আরও বেশি বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়োগের পাশাপাশি সব বুথকেই অতিস্পর্শকাতর ঘোষণার দাবি তুলেছিল বিজেপি। সে দাবিতে কম-বেশি গলা মিলিয়েছিল কংগ্রেস ও বামেরাও। অবশেষে কমিশনের পক্ষ থেকে অভয় দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, মঙ্গলবার তৃতীয় দফার নির্বাচনে ৯২ শতাংশ বুথেই থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। বাকি ৮ শতাংশ বুথে পাহারায় থাকবে রাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী। আর লাঠিধারী খাকি পোশাকের পুলিশকে রাখা হবে বুথের ২০০ মিটার দূরে। কমিশনের ইঙ্গিত, নির্বাচনের আগামী চার দফায় আরও বাড়তে পারে কেন্দ্রীয় ফৌজের বহর। রাজ্যের ১০০ শতাংশ বুথেই মোতায়েন করা হতে পারে আধাসামরিক বাহিনী। অর্থাৎ শান্তিরক্ষায় পুরোপুরি ব্রাত্য থাকবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের পুলিশ। কমিশনের এহেন সিদ্ধান্তে বেজায় ক্ষুব্ধ রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস।
আজ ২৩ এপ্রিল তৃতীয় দফায় দেশের ১৩ রাজ্য ও ২ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ১১৬টি সংসদীয় কেন্দ্রে নির্বাচন। এর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের পাঁচ কেন্দ্রÑ জঙ্গিপুর, বালুরঘাট, মালদহ উত্তর, মালদহ দক্ষিণ ও মুর্শিদাবাদ। এসব কেন্দ্রে প্রচার পর্ব শেষ হলো। এখন সৈন্যসামন্ত সাজিয়ে চূড়ান্ত গণরায় গ্রহণের অপেক্ষায় নির্বাচন কমিশন।
তবে রাজ্য পুলিশের ওপর এই আস্থাহীনতা ও কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে নিরাপত্তার চক্রব্যূহ রচনার এই বাড়বাড়ন্তকে মোটেই ভালো চোখে দেখছে না রাজ্যের শাসক দল। ৯২ শতাংশ বুথে কেন্দ্রীয় ফৌজ মোতায়েনের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ‘বিজেপির চক্রান্তের’ গন্ধ পাচ্ছে তৃণমূল। তাদের বক্তব্য, কমিশনের এমন তৎপরতা তো অন্য রাজ্যে চোখে পড়ছে না।
তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলেছে এ রাজ্যে কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক অজয় নায়েকের এক মন্তব্য। ‘বাংলার বর্তমান (হিংসাত্মক) পরিস্থিতি ১০ বছর আগে বিহারের পরিস্থিতির মতো’Ñ নায়েকের এই মন্তব্যে বেজায় গোসা হয়েছে এ রাজ্যের শাসক দলের। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার তথা বিজেপিকে সন্তুষ্ট করার জন্যই নায়েক এহেন মন্তব্য করেছেন। অন্যথায় দিন কয়েক আগেও তো বাংলায় দুই দফার নির্বাচনকে ‘শান্তিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। সংঘাতটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে নায়েককে রাজ্য থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে কমিশনকে চিঠিও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের তরফ থেকে। তারা বলছে নায়েকের এহেন মন্তব্য বাংলার অপমান।
তবে বলা বাহুল্য, কমিশন এবং বিরোধীদের আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। মাত্রই বছরখানেক আগে রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসার যে লাগামছাড়া আন্দোলন দেখেছে বাংলার মানুষ, তাতেই মনের কোণে জমেছে সিঁদুরে মেঘ। সে নির্বাচনে গোটা বাংলায় খুন হন অন্তত ৫০ জন রাজনৈতিক কর্মী। ভোটের আগে ও পরে লাগাতার হিংসা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে এক-তৃতীয়াংশ আসনে মনোনয়নই পেশ করতে পারেনি বিরোধীরা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যান শাসক দলের প্রার্থীরা। এ নিয়ে জল হাইকোর্ট-সুপ্রিম কোর্টে গড়ালেও লাভ বিশেষ হয়নি। গণতন্ত্রের নামে সেই ‘প্রহসনের নাটকে’ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের, কেননা পঞ্চায়েত ভোট হয়েছিল রাজ্য নির্বাচনী দপ্তরের অধীনে।
লোকসভা নির্বাচনের মতো এক অতিগুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাই বাংলায় যে আর ঝুঁকি নিতে নারাজ নির্বাচন কমিশন, তা বোঝা গিয়েছিল রাজ্যের ৪২ আসনের নির্বাচনকে সাত দফায় ভাগ করে নির্ঘণ্ট ঘোষণায়। এ নিয়েও এর আগে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে তৃণমূল। কমিশনের একের পর এক সিদ্ধান্তের ধাক্কায় তাদের সাজানো মেকানিজম যে ক্রমশ তছনছ হয়ে যাচ্ছে সে কথাটা অনুধাবন করেই কিছুটা উদ্বিগ্ন তৃণমূল নেতৃত্ব। শাসকের প্রতি আনুগত্যের মাশুল দিয়ে ইতোমধ্যে বদলি হতে হয়েছে ছয় আইপিএস অফিসারকে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার তনুজ শর্মা, বিধাননগর পুলিশ কমিশনার জ্ঞানবন্ত সিং ছাড়াও বীরভূমের এসপি শ্যাম সিংহ, ডায়মন্ড হারবারের এসপি এম মেলভামুরুগান, কোচবিহারের এসপি অভিষেক গুপ্তাকে সরানো হয়েছিল আগেই। এবার নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগে সরানো হলো মালদহর পুলিশ সুপার অর্ণব ঘোষকেও। তাৎপর্যবাহী কথাটি হলো, এদের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ জানিয়ে আসছিল কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি। শুধু ইভিএম নয়, লড়াইটা চলছে অন্য স্তরেও।
