চব্বিশে এপ্রিল হাজারো চেষ্টায় ভুলবার নয়। গত বছর ঐ দিনে রাজধানী ঢাকার ফার্মগেট এলাকা থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে সাভার অঞ্চলে অবস্থিত রানা প্লাজার ভবন ধসে মারা পড়ে নিখোঁজসহ ১১৭৫ জনেরও (সূত্র : বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির গবেষণা) বেশি শ্রমিক। যার মধ্যে এখনো নিখোঁজ আছে ১৬২ জনের ওপর। ঐদিন খুব ভোরে দল বেঁধে এসেছিল ওরা। একে একে উঠেছিল নিউ ওয়েভ বটম লি:, ফ্যান্টম অ্যাপারেল, ফ্যান্টম টেক, ইথারটেক্স এবং নিউওয়েভ স্টাইলের মোট পাঁচটি কারখানায়। তিন তলা থেকে আট তলা পর্যন্ত এক একটি কারখানা। নয় তলা ভবনের নিচের দুই তলায় দোকানপাট, ব্যাংক, মার্কেট আর ওপরের তলা ফাঁকা, মাঝখানে পাঁচ-পাঁচটি কারখানা। ‘দানব’ জেনারেটরগুলো নিচতলার বদলে ছিল তিন তলা আর আট তলায়। বিল্ডিংয়ের বাইরের অংশের নীলাভ কাচের দেয়াল দেখে ভেতরের নড়বড়ে অবস্থা বোঝার উপায় নেই কারও। আগের দিন নানা খবর শুনে কারখানা পর্যন্ত পৌঁছে নানা আতঙ্ক কাজ করছিল শ্রমিকদের। কিন্তু প্রশাসনের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত কাজে ঢুকল সবাই। শ্রমিকদের জীবনের চেয়ে মালিকের কাছে শিপমেন্ট অনেক জরুরি, নিরুপায় শ্রমিক না জেনে না বুঝে কাজে হাত দেয়।
হঠাৎ তুফানের মতো শব্দ করে চারদিক মুহূর্তে দেবে যেতে থাকে। যেন কবরের মধ্যে আটকা পড়ে সবাই। অনেক চেষ্টা করল, দোয়া-কালাম পড়ল, আল্লাহর কাছে জীবন ভিক্ষা চাইল, কিন্তু কিছুতেই রেহাই মিলল না। কেউ চিৎকারে চিৎকারে ক্লান্ত হলো, কেউ অজ্ঞান হলো একটু পর পর। চোখ খুলে মোবাইলের আলোতে দেখল মেশিন আর কংক্রিটের নিচে লাইন ধরে পড়ে আছে কাজ করা মানুষগুলো। কোথাও দেয়াল ঘেঁষে পড়ছে রক্তের ফোঁটা। কারও সিঁড়ির নিচে কেবল পা দুটো বাইরের দিকে ঝুলে আছে। কারও পেট ফুটো হয়ে বেরিয়ে আছে লোহার রড। কেউ দেখল একসারি পা অথবা একসারি মাথা, ছিন্নভিন্ন শরীর। তারা সব মৃত। বেঁচে থাকা মানুষগুলো এখানে সেখানে আটকে, কেউ বিমের নিচে ভীত-সন্ত্রস্ত, কারও চুল মেশিনের মধ্যে জড়িয়ে আছে। অন্ধকারে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করল। নারী-পুরুষ, স্বামী-স্ত্রী, হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান, বাঙালি-সাঁওতাল কোনো কিছুর ‘বিভেদ’ তখন চিন্তার ধারেকাছেও ছিল না। মৃত্যুকূপ থেকে দুদিন পরে বেরিয়ে আসা শ্রমিক জেসমিনের কথায় সেটা আরও স্পষ্ট হয়। জেসমিন বলে, ‘এমনভাবে আটকে ছিলাম, বাঁচার কোনো আশা ছিল না। একজন অচেনা পুরুষ তার বুকের মধ্যে আমাকে আগলে ধরে ছিল। একজন মহিলা মানুষ হয়ে পরপুরুষের বুকের মধ্যে আশ্রয় খোঁজা খুব সহজ না। তখন বেঁচে থাকার চরম ইচ্ছা ছাড়া, আমার মেয়েকে একবার দেখার ইচ্ছা ছাড়া লাজলজ্জা কোনোকিছু মাথায় আসেনি। আমি সারা জীবন দোয়া করি সেই ভাইকে, যার জন্য আমি এখনো বেঁচে আছি।’
ঘটনার নির্মমতায় রাগে-ক্ষোভে ফেটে পড়ে অন্যসব কারখানার শ্রমিক সহযোদ্ধারাও, বিচার চায় এই ঘটনার। কিন্তু রেহাই পায় না পুলিশ প্রশাসনের কাছ থেকে। ঘটনার পর রানা প্লাজার আশপাশে সাভার, আশুলিয়াসহ দেশের অন্যান্য পোশাক কারখানার শ্রমিকরা প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রকাশ করলে সরকার-বিজিএমইএ বসে বসে তার মধ্যেও ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজে। বিস্ময় যে, এত বড় ঘটনার পর শ্রমিকদের এই ফেটে পড়া, ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ার তৎপরতাকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার-বিজিএমইএ। ২০ দিনের মাথায় মোনাজাত করে উদ্ধারকাজের সমাপ্তি ঘোষণা এলো। ঐ ঘোষণায় অনেকের বুকের ভেতর মুচড়ে উঠেছিল, বিশেষভাবে যারা তাদের সন্তানকে খুঁজে পাননি, তেমনি শত শত শ্রমিক পরিবার মানতে পারেনি এ ঘোষণা। লেখক, অ্যাক্টিভিস্ট, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী অনেকেই ছুটে গেছেন খবর পেয়ে। শ্রমিকরা বিভিন্ন এলাকার মোড়ে জমায়েত হয়ে ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে চাইলে তাদের লাঠিপেটা করে শায়েস্তা করা হয়। পুলিশ, আর্মির কড়া প্রহরা ঠেলে কেউই থামাতে পারেনি সে সিদ্ধান্ত।
প্রাণে মারা গেছে সরকারি ঘোষণা মতে ১১৩৬। কিন্তু নিহত, নিখোঁজ আর ডিএনএর হিসাব কষে আমরা দেখেছি প্রায় ১১৭৫-এর বেশি শ্রমিক মারা গেছেন এই ধসে। অদ্ভুত যে, এত মানুষ নাই হয়ে যাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত রানা প্লাজার পাঁচটি কারখানায় মোট ক’জন শ্রমিক কাজ করতেন, ক’জন নিহত, ক’জন নিখোঁজ তার কোনো প্রকৃত হদিস মেলেনি। শ্রমিক সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন, অন্যান্য সংস্থা তাদের উদ্যোগে যেসব নিখোঁজ তালিকা তৈরি করেছে সেসবের কোনো সমন্বয় হয়নি। সরকার-বিজিএমইএর প্রকৃত তালিকা তৈরির অনীহা দেখে মনে হয় তারা বলতে চাইছেÑ ‘ওদের নাম-পরিচয়, এতসব তথ্য-তালাশের কী আছে? ওরা তো এমপি, মন্ত্রী, সেনা কর্মকর্তা, পুলিশ, আমলা কেউই না; ওরা প্রাণ নয় সংখ্যা, ওরা শ্রমিক, টাকা তৈরির নাটবল্টু। ওদের পরিচয় তালিকা নিয়ে ভাববার সময় কই সরকার-মালিক আর বিদেশি ক্রেতাদের।’ স্পেকট্রাম থেকে রানা প্লাজার ঘটনা পর্যন্ত এই দীর্ঘ নয় বছরের ঘটনাগুলোতে তালিকা তৈরি বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি, বিশেষভাবে নিখোঁজদের তালিকা।
কারখানা ইতিহাসের এই নিষ্ঠুরতম ঘটনার শিকার মানুষগুলোর জীবন সরকার-মালিক-বিদেশি বায়ারদের কাছে অগুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের দেশের নাগরিকদের কাছে কি তাই? রানা প্লাজার শ্রমিকরা তো এদেশেরই নাগরিক। দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এরাই তো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রানা প্লাজার শ্রমিকদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ১৩ থেকে ৩০-এর মধ্যে। শতকরা ৫৮ ভাগ শ্রমিকই ছিলেন ১৮ থেকে ২৫ বয়সের মধ্যে। এই শ্রমিকরা গত ত্রিশ দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা পোশাক শিল্পের শ্রমিকদেরই অংশ। বেশির ভাগ শ্রমিক যেমন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য, তেমনি এই পেশায় অনেক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা খণ্ডকালীন কাজ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনাকে সরকার-মালিক-বায়ার প্রত্যেকেই ট্র্যাজেডি কিংবা দুর্ঘটনা বলে আখ্যা দেয়। তারা এটাকে হত্যাকাণ্ড কিংবা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলতে একেবারেই নারাজ। পাছে তাদের ‘হত্যাকারী’ উপাধি পেতে হয় কিংবা হত্যাকারী হিসেবে শাস্তি পেতে হয়, এসব নানা আতঙ্কে। এটা সত্য যে এই শ্রমিকদের ছুরি মেরে, পিটিয়ে কিংবা গুলি করে হত্যা করা হয়নি। কিন্তু যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে তাদের কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে সেখানে তাদের মৃত্যু ছিল অনিবার্য। আগের দিনই দেখা দিয়েছিল ফাটল। কার্যত ভবনটি হয়ে গিয়েছিল একটি মৃত্যুফাঁদ। ছয় তলার জায়গায় নয় তলা, দুর্বল পিলার, সস্তা নির্মাণ সামগ্রী এবং দুর্নীতি আর অনিয়মের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ভবনটি হাজার শ্রমিকের ভার বহনে সক্ষম ছিল না। তারপরও ফাটলধরা ভবনে ঠেলে-পিটিয়ে ঢোকানো হয় শ্রমিকদের। ২০০/৩০০ টাকা হাজিরা বোনাস কিংবা বেতন কাটার ভয়ে হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে কারখানায় ঢোকেন সবাই এবং প্রাণ হারান হাজারজন।
এই অবহেলা-অমনোযোগকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ছাড়া কেবল দুর্ঘটনা বলার কোনো সুযোগ কি আছে? এত এত ভবন ধস ও অগ্নিকাণ্ডের পরও আমাদের দেশের অভিযুক্ত সরকারের পরিদর্শক কমিটির সদস্যরা, সরকারি প্রকৌশলী এবং মালিকরা গা বাঁচিয়ে চলতে পারছে। কারণ এদেশে অবহেলা-অমনোযোগের কারণে মৃত্যুর জন্য দায়ীর বিরুদ্ধে আইন কার্যকর নেই। দুর্ঘটনা এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনার শাস্তি সমান নয়। আইনের ফাঁক গলে সরকারি কর্তাব্যক্তি-মালিক নিজেদের রেহাইয়ের পথ হিসেবে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডকে তাই দুর্ঘটনা বলে প্রচার করছে। কিন্তু শত প্রচার কিংবা চিৎকারে এ অপরাধ ঢাকার পথ নেই। হাজার মানুষের মৃত্যু, পঙ্গু হওয়া, মানসিক ভারসাম্য হারানো অবস্থাÑ এসবের পেছনে কোনো দৈবাৎ দুর্ঘটনা নয়, বরং রয়েছে সরকার-মালিক-বিদেশি ক্রেতা সকলের সম্মিলিত অবহেলা, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা আর প্রবল মুনাফা আকাক্সক্ষার প্রত্যক্ষ ভূমিকা।
বাংলাদেশের শ্রমিকদের বেহাল দশার পরিবর্তনে সবাই যেন নানা পথ হাতড়াচ্ছেন। নানা গবেষণা, নানা ফান্ড তৈরি হচ্ছে এই ‘সস্তা মজুর’দের নিয়ে গবেষণার জন্য। কেউ বলছেন টেকসই ভবন নির্মাণ করতে হবে, কেউ বলছেন ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের শাস্তির আইন পাকাপোক্ত করতে হবে। কেউ বা বলছেন রক্তমাখা এই কাপড় কেনা বর্জন করতে হবে। আবার কেউ বলছেন, ভিক্ষাবৃত্তি নয়, সংগ্রামই মুক্তির পথ।
মজুরি বৃদ্ধি, বকেয়া পাওনা, এমনকি রানা প্লাজার মতো ঘটনায় যখন শ্রমিকরা প্রতিবাদ করেন তখন সরকার-মালিক শিল্প ধ্বংসের পাঁয়তারা বলে আন্দোলনকারীদের হেনস্তা-হয়রানির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে শ্রমিক আন্দোলন শ্রমিকদের সংগ্রামী চেতনাকেই ঊর্ধ্বে তুলে ধরে, শ্রমিকদের দাবি আদায়ের পথকে প্রশস্ত করে, শিল্পের ভিত্তিকেই মজবুত করে। আন্দোলন না থাকলে উল্টো শ্রমিককে হয় কম মজুরিতে না খেয়ে মরতে হয় নয়তো ভবনের নিচে চাপা পড়ে মরতে হয়। সুতরাং এটা পরিষ্কার ভিক্ষুকের মতো দ্বারে দ্বারে ঘুরে নয়, বরং অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামই পারে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ভূমিকা রাখতে।
