সাভারে ‘রানা প্লাজা’ ধসের পর গত ছয় বছরে বদলে গেছে পোশাক খাতের কর্মপরিবেশ। এ খাতের মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিক নেতা ও গবেষকরাও এ কথা স্বীকার করেছেন। তারা বলছেন, রানা প্লাজায় ১ হাজার ১৩৩ শ্রমিকের প্রাণহানির পর ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতা জোটের চাপে ৮০ ভাগ কারখানা মালিক বাড়তি বিনিয়োগ করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেছেন। বাকিগুলোতেও সংস্কারকাজ চলছে, যা শেষ হতে বছরখানেক সময় লাগবে। বাংলাদেশের পোশাক খাত যে এখন নিরাপদ ও কমপ্লায়েন্ট তা প্রকাশ্যেই স্বীকার করছেন বিভিন্ন সময়ে এ খাতের সমালোচনা করা পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরাও। তবে শ্রমিক অধিকারের ক্ষেত্রে আরও কিছু করার রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারখানা মালিকরা বলছেন, আগে প্রায় প্রতি বছরই পোশাক খাতে কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটত। কিন্তু ছয় বছরে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এ সময়ে ইউরোপের ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতা জোট অ্যালায়েন্সের সুপারিশ অনুযায়ী, কারখানাগুলোতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে পোশাক খাত ভেতর থেকে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এ কারণেই মালিকরা এখন ক্রেতা হারানোর বদলে তৈরি পোশাকের দাম বাড়ানোর জন্য দরকষাকষি করার ওপর জোর দিচ্ছেন। ‘রানা প্লাজা’ ধসের বছর অর্থাৎ ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি হয়েছে ২১ বিলিয়ন ডলার। পরের দুই অর্থবছরে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। তবে গত দুই বছরে তার গতি আবার বেড়েছে। গত অর্থবছর পর্যন্ত তা বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ১২ ভাগেরও বেশি। দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। পোশাক খাতের বদলে যাওয়ার গল্প বিশ্বজুড়ে ব্র্যান্ডিং করে আগামী তিন বছরে রপ্তানি আয় ৬৬ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিচ্ছেন মালিকরা। বিজিএমইএ নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, এজন্য প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এতে পোশাক খাতের যাত্রাকাল থেকে ‘রানা প্লাজা’ ধস পর্যন্ত সময়কালের পরিস্থিতি ও তারপর এ খাতের ইতিবাচক পরিবর্তন তুলে ধরা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল বাংলাদেশের ৬৭টি পোশাক কারখানাকে লিড সনদ দিয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি লিড প্লাটিনাম। আরও ২৮০টি কারখানা সনদ পাওয়ার পথে রয়েছে। বিজিএমইএ বলছে, বিশ্বে পরিবেশবান্ধব শিল্পোদ্যোগে শীর্ষে রয়েছে দেশের পোশাক খাত। পোশাক খাতের বদলে যাওয়ার গল্প তুলে ধরে দর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে জোর দিয়েছেন সংগঠনটির নতুন সভাপতি রুবানা হকও।
তারা জানান, রানা প্লাজা ধসের পর পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতারা আমদানিকারক ব্র্যান্ডগুলোর কার্যালয়ের সামনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তিন মাসের মাথায় ২০১৩ সালের জুন মাসে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে ২০ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের শর্ত দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জিএসপি পুনর্বহালের জন্য সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করে সরকার, যদিও তা ফিরে পাওয়া যায়নি। ইউরোপের দেশগুলোও পোশাক খাতে সময়াবদ্ধ সংস্কারের জন্য চাপ দেয়। তার পরিপ্রেক্ষিতেই অ্যালায়েন্স ও অ্যাকর্ড বাংলাদেশের পোশাক খাত সংস্কারে কাজ শুরু করে। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের অধীনে ২ হাজার ২৫৪টি কারখানা মান যাচাই শেষে ত্রুটির প্রায় ৯০ ভাগই সারিয়েছে। সংস্কার না করায় ১৯৪টি কারখানাকে ব্যবসার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ৬২৫টি কারখানা প্রাথমিক সংস্কারের কাজ পুরোপুরি শেষ করেছে। এই সংস্কার কাজে ভবনের দেয়াল থেকে শুরু করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সবকিছুই পরীক্ষা করে ত্রুটি দূর করতে হয়েছে মালিকদের।
কারখানা মালিকরা জানান, এ সময়ে মালিকদের দাবি মেনে করপোরেট কর হার, উৎসে কর হার কমিয়ে সমর্থন জুগিয়েছে সরকার। তৈরি পোশাক কারখানায় অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। গত ছয় বছরে রানা প্লাজার মতো ভবনগুলোতে যেসব ছোট ও সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা গার্মেন্ট ছিল, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অথবা অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হয়েছে। সরকারও এ সময় পোশাক খাত সংস্কারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে।
তারা আরও জানান, কারখানার মানোন্নয়নে গত ছয় বছর এ খাতে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। শ্রমিক অসন্তোষও কমে গেছে। গত ডিসেম্বরে মজুরি বৈষম্য নিয়ে আন্দোলনের আগে এ খাতে বড় ধরনের কোনো শ্রমিক অসন্তোষও হয়নি। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে নির্ধারিত সময়ের আগেই মালিকরা নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেয় মন্ত্রণালয়ে, যা নজিরবিহীন ঘটনা। রানা প্লাজা ধসের পর পোশাক শ্রমিকদের দুটি মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক অধিকার রক্ষায় দুই দফা শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন সহজ করা হয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ইপিজেডভুক্ত কারখানাগুলোতেও ট্রেড ইউনিয়ন চালুর ব্যাপারে চাপ রয়েছে। না হলে ইউরোপে পাওয়া এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) সুবিধা স্থগিত করা হতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের ব্রাসেলস দূতাবাস। শুরুতে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিয়ে ইপিজেড আইন সংশোধন করা শুরু করেছে সরকার।
‘রানা প্লাজা’ ধসের পর পোশাক খাত কতটা এগিয়েছেÑ এ প্রশ্নে বিজিএমইএ’র সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্স আসার পর বেশিরভাগ কারখানা বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে। এখন বাংলাদেশের পোশাক খাত বিশ্বের অন্যতম সেরা কমপ্লায়েন্ট খাত। এজন্য মালিকদের ঋণ করে পুরনো কারখানায় নতুন করে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে টিকে থাকতে হয়েছে। শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেছে। সব কারখানাকেই মানসম্পন্ন হতে হয়েছে।’
তবে পোশাক খাতের মান যতটা বেড়েছে, বিদেশি ক্রেতারা দাম ততটা বাড়ায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা অর্ডার বাড়াচ্ছেন। কিন্তু দাম বাড়াচ্ছেন না। গত ছয় বছরে শ্রম আইন সংশোধন হয়েছে, শ্রমিকদের ইউনিয়ন নিবন্ধন বেড়েছে, দুটি মজুরি কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। পোশাক খাতের যে ভালো ইমেজ তৈরি হয়েছে তা বিজিএমইএর নতুন পর্ষদ বিশ্বব্যাপী প্রচার করার পরিকল্পনা করছে। এজন্য প্রকল্প নেওয়া হবে।’
ফয়সাল সামাদ আরও বলেন, ‘পশ্চিমা ক্রেতারা ভারতের তৈরি পোশাকের যে মূল্য দেয়, বাংলাদেশকে তা দেয় না। এতদিন ইমেজ ভালো না থাকায় আমাদের দরকষাকষির সুযোগ ছিল না। এখন সে পরিস্থিতি নেই। আগামী দিনে পোশাকের দর বাড়ানোই হবে আমাদের প্রধান কাজ।’
গত ছয় বছরে পোশাক খাত বদলে যাওয়ার কথা স্বীকার করে জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর কারখানার ভেতরে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। কারখানায় কাজের পরিবেশ নিশ্চিত হয়েছে। শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ বেড়েছে, তাদের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। তবে এ কাজ এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। নিরাপদ কর্মক্ষেত্র বলতে যা বোঝায় তা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে চলমান সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।’
পোশাক খাতে চলমান সংস্কারকাজ এখনো শেষ হয়নি বলে স্বীকার করছেন মালিকরা। বিজিএমইএ’র সহসভাপতি ফয়সাল সামাদ জানান, ‘এখনো ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানায় সংস্কারকাজ বাকি রয়েছে, যা শেষ করতে এক বছর সময় লাগবে। তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গত বছর দেড় হাজার কারখানায় জরিপ চালিয়ে বলছে, বিজিএমইএর সদস্য কারখানাগুলোর ৭৯ শতাংশ ও বিকেএমইএর কারখানার ৭৪ শতাংশ কাঠামোগতভাবে নিরাপদ।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘পোশাক খাতের কাঠামোগত অনেক পরিবর্তন এসেছে। কারখানাগুলো নিরাপদ হয়েছে। সে বিবেচনায় শ্রমিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। আগামীতে শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়নের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।’
এফবিসিসিআইর সভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ও জার্মানির পণ্য আমদানি করতে চায়নি কোনো দেশ। যুদ্ধে পরাজয়ের পর সারা বিশ্বে তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পণ্যের মান বাড়িয়ে সে পরিস্থিতি পাল্টাতে পেরেছে তারা। রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের পোশাক নিয়েও নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছিল। একেকটি কারখানায় ৫-৩০ কোটি পর্যন্ত বাড়তি বিনিয়োগ করে নিরাপদ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এখন এগুলো বিশ্ববাসীর কাছে প্রচারে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়েই আমরা পোশাকের ন্যায্যমূল্য আদায় করতে সক্ষম হব। কারণ আমাদের পোশাকের মান অন্য দেশের তুলনায় অনেক ভালো।’
