মরে গেলেও শান্তি পাইতাম

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:২৬ এএম

রানা প্লাজা ধসে প্রাণে বেঁচে গিয়ে অনেকেই কাটাচ্ছেন দুর্বিষহ জীবন। এমনই দুজন হলেন শিলা বেগম ও ইয়ানুর বেগম। ছয় বছর পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তারা। আগামী দিনগুলো কীভাবে কাটবে, সংসার খরচ আর চিকিৎসার ব্যয় কোথা থেকে আসবে এসব নানা দুশ্চিন্তা প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করে ফিরছে বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।

মেয়েকে পড়াতে না পারলে আত্মহত্যা করবে মা

রানা প্লাজা ধসের ১৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার হন পোশাক শ্রমিক শিলা বেগম। ভবনটির ষষ্ঠ তলার ইথার টেক্স নামে একটি কারখানায় কাজ করতেন তিনি। ওই ঘটনায় তার কোমরের হাড় ভেঙে যায়, ডান হাতটাও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। পেটের মধ্যে লাগানো আছে পাইপ। অভাবের সংসারে এরই মধ্যে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন স্বামী। এখন একমাত্র মেয়ে তানজিলা আক্তার নিপাকে নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে নিপা। সমাপনী পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছিল সে। কিন্তু ভালো ছাত্রী হলেও টাকার অভাবে মেয়েকে ঠিকমতো লেখাপড়া করাতে পারছেন না শিলা বেগম। কয়েক দিন পরই নিপার পরীক্ষার ফল বেরোবে। কিন্তু মেয়ের কলেজে ভর্তির খরচ কীভাবে জোগাবেন তা নিয়ে এখন চরম দুশ্চিন্তায় ভুগছেন তিনি।

শিলা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেয়েকে কলেজে ভর্তি করাতে না পারলে আমার জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। মেয়ে বলেছে, কলেজে ভর্তি না করালে সে আত্মহত্যা করবে। তখন আমারও আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।’

মেরুদণ্ড এবং ডান হাতে আঘাতপ্রাপ্ত শিলা আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর বিকাশের মাধ্যমে ৮৪ হাজার টাকা পেয়েছিলাম যার ৫০ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। হাতে পাওয়া ৩৪ হাজার টাকা নিজের ওষুধ খেতেই শেষ হয়ে গেছে। এখন এতিম বাচ্চাটিকে পড়ানোর মতো কোনো টাকা আর আমার হাতে নেই।’

মরে গেলেও শান্তি পাইতাম

ময়মনসিংহের ভালুকার ইয়ানুর বেগম (২৮) সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় এসে কাজ নিয়েছিলেন ধসে পড়া রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলার ইথার টেক্স কারখানায়। ভবনটি ধসে পড়ার ১৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা হয় তাকে। বর্তমানে তার দুটি পা অচল। ক্র্যাচ ছাড়া হাঁটতে না পারায় স্বাভাবিকভাবে কোনো কিছু করতে পারেন না ইয়ানুর। আঘাত পাওয়ার কারণে মাঝে মধ্যে মাথায় প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করেন। তখন কোনো ভালো কথা বললেও রেগে যান তিনি। এতকিছুর পরও নিজেকেই রান্না করতে হয় খাওয়ার জন্য।

ইয়ানুর বলেন, ‘সকালে স্বামী সবকিছু আগাইয়া দিলে আমি বসে রান্নার কাজ করি। আমাকে সহায়তা করতে গিয়ে চাকরি হারিয়েছে স্বামী। বর্তমানে সে রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসারের খরচ বহন করে। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়ায় মাঝে মধ্যেই বাজার হয় না আমাদের বাসায়।’

এত কষ্টের চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো বলে আক্ষেপ করে ইয়ানুর আরও বলেন, ‘বেঁচে থেকে এত কষ্ট আর ভালো লাগে না। ছোট ভাইবোন কিছু চাইলে দিতে পারি না। ওষুধ খাওয়ার মতো টাকাও হাতে নাই। এত লেখালেখি করেন আপনারা। আমার একটা চলার মতো ব্যবস্থা যাতে হয় সেটা একটু দেখবেন আপনারা।’

ভবন ধসের ঘটনায় কারও শাস্তি চান কি না জানতে চাইলে ইয়ানুর বলেন, ‘আমার বিচারই তো কেউ করে দিচ্ছে না, আমি আবার কার বিচার চাইব। চাওয়া পাওয়ার তেমন কিছু নাই। নিজের চিকিৎসা আর বাকি জীবনটা কোনোরকমে খেয়েপড়ে চলে যেতে পারলেই খুশি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত