দাদাবাড়ি দেখা হলো না জায়ানের

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৩৯ এএম

নাতির সঙ্গে পরিবারের জমিদারির অতীত গৌরব ও আভিজাত্যের গল্প করতেন দাদা মতিনুল হক চৌধুরী। আর বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সের কাছ থেকে সুনামগঞ্জের হাওর, নদী ও গ্রামের বর্ণনা শুনতে শুনতে দাদাবাড়ি ঘুরে দেখার ইচ্ছে জন্মে শিশু জায়ানের মনে। তাই দাদুর কাছে বায়না ধরে দাদাবাড়িতে নিয়ে যেতেই হবে তাকে। নাতিকে নিজেদের পূর্বপুরুষের স্মৃতিবিজড়িত জমিদারির সীমানা ঘুরে ঘুরে দেখানোর ইচ্ছে ছিল দাদুরও। তাই এ বছরের নভেম্বর মাসে জায়ানকে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় পারিবারিকভাবে। নাতি বাড়ি আসবে, সেই খুশিতে দাদা মতিনুল হক ঢাকা থেকে চলে আসেন গ্রামের বাড়িতে। শুরু করেন বাড়ির সংস্কারকাজ। গ্রামের বাসিন্দাদের নাতির আসার খবরও দেন। কিন্তু জায়ান ও তার দাদার ইচ্ছে আর পূরণ হবে না কোনোদিনই। গত রবিবার বিকেলে পাওয়া দুঃসংবাদে সব এলোমেলো হয়ে গিয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় গত রবিবার একযোগে তিনটি হোটেল ও তিনটি গির্জায় বোমা হামলা হয়। পরে আরও দুটি স্থানে বিস্ফোরণ হয়। এতে এখন পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি মারা গেছেন। ওই হামলায় জায়ান চৌধুরীও নিহত হয়। জায়ান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মেয়ের ছেলে। একই হামলায় আহত জায়ানের বাবা মশিউল হক চৌধুরী শ্রীলঙ্কার একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।

ভাটিপাড়া গ্রামে জায়ানের দাদাবাড়িটি এলাকায় ‘জমিদার বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত। তাদের পূর্বপুরুষ এলাকার জমিদার ছিলেন। বিশাল বাড়িটি বেশ পুরনো। বাড়ির বেশিরভাগ ঘর এখন খালি পড়ে থাকে। পরিবারের সদস্যদের বেশিরভাগই থাকেন ঢাকায়। মাঝে মধ্যে তারা বেড়াতে আসেন।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মতিনুল চৌধুরী ঢাকা থেকে এক সপ্তাহ আগে বাড়িতে এসেছিলেন। তিনি বাড়ির সংস্কারকাজ শুরু করেছিলেন। শ্রমিক লাগিয়ে বাড়িঘর পরিষ্কার এবং বসতঘর ও রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ শুরু করেন। বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল ফ্রিজ ও জেনারেটরসহ নানা আসবাবসামগ্রী। এই কাজ নিয়েই বাড়িতে মহাব্যস্ত ছিলেন মতিনুল চৌধুরী। গত রবিবারও সংস্কারকাজ করছিলেন তিনি। বিকেলের দিকে ঢাকা থেকে আসা ফোনে জানতে পারেন, ছেলে প্রিন্স ও নাতি জায়ান শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে নিখোঁজ। এতে মুষড়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে রওনা দেন ঢাকার উদ্দেশে। ওইদিন রাতে সিলেটে স্বজনদের বাসায় অবস্থান করে সোমবার সকালে তিনি ঢাকায় চলে যান।

মতিন চৌধুরীর ভাতিজা সুজাত চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জায়ান আগামী নভেম্বরে বাড়িতে আসবে, এ নিয়ে চাচার খুশির শেষ ছিল না। তাই চাচা পুরনো বাড়িঘর সংস্কার ও সাজাতে এসেছিলেন। কিন্তু তার শেষ আশা আর পূরণ হলো না।’

মতিন চৌধুরীর প্রতিবেশী ভাটিপাড়া গ্রামের সৈয়দুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘বাড়িতে এসে মতিনুল চৌধুরী খুব ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। প্রথমবারের মতো নাতি বাড়িতে আসবে, তাই তাকে রাজকীয় বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। দামি ফার্নিচারসহ আসবাবপত্র আগে থেকেই বাড়িতে নিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এ দুর্ঘটনা সব এলোমেলো করে দিল। আমরা এলাকাবাসীও এই ঘটনায় মর্মাহত। আমরা এখন প্রার্থনা করছি জায়ানের বাবা প্রিন্স চৌধুরী যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে।’

ভাটিপাড়া গ্রামের আরেক বাসিন্দা সালেহীন চৌধুরী বলেন, ‘শুনেছি জায়ান তার দাদার সঙ্গে গ্রামে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু জায়ানের সেই স্বপ্নপূরণ হলো না। তার মৃত্যুতে পুরো গ্রামবাসীই শোকাহত। আমরা কারও এমন মৃত্যু চাই না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত