ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে শ্লীলতাহানি করার পর তাকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী মডেল থানা থেকে প্রত্যাহারকৃত ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনসহ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন জমার পরপরই মোয়াজ্জেমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে বলে আভাস মিলেছে। তা ছাড়া ফেনীর পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকারকেও বদলি করা হতে পারে। আগামী সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে দাখিল করবে তদন্ত কমিটি।
জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) মোখলেসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোনাগাজীতে যে ঘটনা ঘটেছে তা মর্মান্তিক এবং নারীর প্রতি সহিংসতার একটি চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত বলে মনে করি। এটা পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার দগদগে একটি ঘা। এখানে পুলিশ বলুন বা অন্য কেউ বলুনÑ একটা পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থার প্রতিফলন। ভিকটিম পরিবারটি যে শুধু পুলিশের কাছে এসেছে তা কিন্তু নয়। বিচার পেতে তারা আরও শক্তিশালী কর্নারে গিয়েছিলেন। সেখানেও কিন্তু তাদের কথা শোনা হয়নি। শেষে এসেছেন পুলিশের কাছে। যেভাবে তাদেরকে সময় দেওয়া এবং তাদের কথা শোনা উচিত ছিল তা পুলিশ করে নাই। ভুল কাজের জন্য যে পুলিশ কর্মকর্তা এই কাজটি করেছেন তার খেসারত দিতে হচ্ছে এবং তাকে শাস্তির আওতায় আসতেই হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
পুলিশ সদও দপ্তরের তদন্ত কমিটির প্রধান উপমহাপরিদর্শক (মিডিয়া) রুহুল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই আমরা আইজিপি স্যারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করব। পুলিশের অনেকেরই দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। তদন্তে আমরা যা যা পেয়েছি তাই উল্লেখ করা হবে। কারোর পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই।’
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা করার পর পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, আওয়ামী লীগ নেতা ও মাদ্রাসার ম্যানিজিং কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। ফেনীর পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার ওসিকে রক্ষা করতে আইজিপিসহ পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠালে পুলিশের মধ্যেই সমালোচনা হয়। এরপর সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করে আর্মড ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করা হয়। মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে আসামিদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ ওঠে। নুসরাতকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ভিডিও করার অপরাধে তার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম ফেঁসে যাচ্ছেন তা বলা যায়। এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকারও ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। তা ছাড়া এসআই ইকবাল নুসরাত ও তার পরিবারের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সেই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি আইজিপি স্যারের কাছে দাখিল করার পর ওসিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে। রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে যে আচরণ করেছেন তা তিনি করতে পারেন না। তিনি আসামিদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করেছেন। তা ছাড়া নুসরাতের ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীকে অর্থও দিয়েছেন বলে তদন্ত কমিটি তথ্য পেয়েছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এসপি তার পক্ষ নিয়ে যে চিঠি দিয়ে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন, তাকে যে কোনো সময় প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হতে পারে। তবে তার প্রত্যাহার ঠেকাতে ফেনীর কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা নানাভাবে তদবির চালাচ্ছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য এসেছে।’
