বন্ধুত্বের ফাঁদ পেতে অপহরণ

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৪:১০ এএম

রাজধানীতে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করে অভিনব কৌশলে অপহরণের ফাঁদ পাতছে একটি চক্র। এর পেছনে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে নারীদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অপহরণের ৯৫ শতাংশ ঘটনাই ঘটছে নারী দ্বারা। চক্রটি ফেইসবুকে সুন্দরী নারীর ছবি দিয়ে বিত্তশালীদের সঙ্গে গড়ে তুলছে বন্ধুত্ব ও প্রেম। পরে ফাঁদ পেতে হাতিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। এ ছাড়া প্রাইভেট গাড়িতে ভাড়ার নামেও অপহরণ করছে চক্রটি। পরে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করছে। সম্প্রতি রাজধানীতে এমন ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবার মুক্তিপণ দিয়ে গোপনেই অপহৃতকে মুক্ত করছে। অভিযোগ পেলে উদ্ধার অভিযানে নামে র‌্যাব।

র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সাড়ে তিন মাসে রাজধানীতে অপহরণের অভিযোগ পেয়ে ২৪টি অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব। অভিযানে অপহরণকারী চক্রের ৪২ সদস্য আটক হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ২১ জন ব্যক্তি। এসব ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া গত বছর অপহরণের ঘটনায় ১১টি অভিযানে ১৮৪ জন গ্রেপ্তার হয়। ৮৪টি মামলা ছাড়াও উদ্ধার করা হয় অপহৃত ১১৬ জনকে। এর মধ্যে রয়েছে ৩১ শিশু ও ২২ নারী।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান মুফতি মাহমুদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন চক্র অভিনব পদ্ধতিতে অপহরণ করছে। অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযানে নামে র‌্যাব। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপহরণকারী চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি জনগণকেও এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।’

একাধিক অপহরণের ঘটনা তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব ৪-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. সাজেদুল ইসলাম সজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপহরণের ৯৫ ভাগই ঘটনাই ঘটছে নারী দ্বারা। বাকি অল্প কিছু অপহরণ ভিন্ন পন্থায় হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনো না কোনোভাবে নারী দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়। এরপর তাকে দেখা করার জন্য ডাকেন ওই নারী। চক্রটির জন্য নিরাপদ এলাকায় ভিকটিমকে ডেকে অপহরণ করে।’

র‌্যাবের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে অপহরণের নানা কৌশল। কর্মকর্তারা জানান, অপহরণকারীরা সুন্দরী নারীর ছবি দিয়ে ফেইসবুকে ভুয়া আইডি খুলে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও চাকরিজীবীদের টার্গেট করে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের মাধ্যমে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ এবং পরে ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে দেখা করার বায়না করে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা তাদের পূর্বপরিকল্পিত এলাকায় নিয়ে আসে এবং আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে। পরে পরিবার ও পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করে। অনেক সময় ভিকটিমের পরিবার টাকা দিতে না চাইলে অপহরণকারীরা পরিবারের সদস্যদের মারধরের শব্দ, কান্না ও চিৎকার শোনায়। এরপরও টাকা দিতে না চাইলে ভিকটিমকে হত্যার হুমকি দিতে থাকে।

এ ছাড়া ঢাকাসহ আশপাশের বাস স্টেশন থেকে যাত্রীদের চাহিদামতো গন্তব্যে যাওয়ার কথা বলে মাইক্রোবাস বা প্রাইভেটকারে তুলে অপহরণ করে একটি চক্র। যাত্রীবেশে আগে থেকে গাড়িতে থাকা তিন-চারজন ব্যক্তি চলন্ত অবস্থায় ভিকটিমকে অজ্ঞান করে বা হাত-পা ও মুখ বেঁধে তাদের আস্তানায় নিয়ে যায়। পরে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে।

রাজধানীর মিরপুর থেকে অপহৃত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক মোনায়েমুল বাশারকে (৪০) গত ৩ এপ্রিল টাঙ্গাইলের মধুপুর ভাওয়াল বন থেকে উদ্ধার করে র‌্যাব। এ সময় অপহরণকারী চক্রের ছয় সদস্য গ্রেপ্তার হয়। তারা হলো, মো. আবদুস সালাম (৫৫), আলমগীর হোসেন (১৮), মো. ফয়েজ উদ্দিন (৩২), মো. ফয়সাল (১৮), মো. হালিম (৫২) ও বিল্লাল হোসেন (৩৮)। চক্রের এক নারী সদস্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রোগী সেজে ওই চিকিৎসকের মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তার সঙ্গে দীর্ঘদিন কথা বলে। একপর্যায়ে দেখা করার কৌশলে অপহরণকারী চক্রের কয়েকজন সদস্য তাকে রাজধানীর মিরপুর থেকে টাঙ্গাইলের মধুপুর ভাওয়াল বনে একটি বাসায় নিয়ে যায়। এরপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। না দিলে খুন করার হুমকি দেয়। গত ১৬ এপ্রিল রাজধানীর কলাবাগান এলাকা থেকে মো. রায়হান নামের এক ব্যক্তিকে প্রাইভেটকারে উঠিয়ে অপহরণের ছয় দিন পর সাভারের আমিন বাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করে র‌্যাব। এ সময় অপহরণকারীচক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। চক্রটি রায়হানের পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত