উন্নতি তো অবশ্যই, কিন্তু কোন ধরনের

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৩১ পিএম

উন্নতি যে ব্যাপক হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যেদিকে তাকান দেখতে পাবেন। বিশেষ করে অবনতির দিকে চোখ রাখলে একবারেই নিশ্চিত হওয়া যাবে যে কেমন গগনস্পর্শী সব উন্নতি ঘটেছে এবং ঘটছে। আর অবনতিগুলো উন্নতির নিদর্শনগুলো থেকে খুব দূরে রয়েছে তা মোটেই নয়, তাদেরকেও একেবারে সংলগ্ন অবস্থাতেই পাওয়া যাবে, উন্নতির পায়ের কাছেই। তাদের নিচুতা দিয়েই উন্নতির উচ্চতা মাপা যেতে পারে, ইচ্ছা করলেই হলো। এটা বিশ্বব্যাপীই ঘটছে। একের উন্নতি মানেই তো অন্য অনেকের অবনতি। যেমন ধরা যাক, স্বাস্থ্যের ব্যাপারটা। চিকিৎসাশাস্ত্রের অত্যাশ্চর্য উন্নতিতে স্বাস্থ্য রক্ষা বড়ই সহজ হয়েছে কিন্তু অপরদিকে আবার এই উন্নত বিশ্বেই বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। বার্ড ফ্লু মানুষকে পাখির অসহায় স্তরে নামিয়ে এনেছে, এখন তার সঙ্গে সোয়াইন ফ্লু যুক্ত হয়ে মানুষকে রীতিমতো পশুর পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে। অতি উন্নতির পাশাপাশি, বলা যায় পিঠাপিঠি, এই যে মর্মান্তিক অবনতি, একে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা বলা যাবে না। পুঁজিবাদের এটাই নিয়ম, উন্নতি ও অবনতি একসঙ্গেই ঘটবে। সেটা ঘটবে আমাদের এই বাংলাদেশেও যাকে আমরা সোনার বাংলা বানাব বলে আস্ফালন করেছিলাম। তা কেউ কেউ এখানে সোনাদার হয়েছেন বটে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই এখন দেনাদার, বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ঋণদাতা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মহাজনের কাছে। বাংলাভাষা যে আসলেই জনগণের ভাষা তার বহুচিহ্ন এর শব্দভা-ারে সংরক্ষিত রয়েছে। এদেরই একটি হচ্ছে সুদখোরকে ‘মহাজন’ বলা। শখ করে বলা হয়নি, বলতে হয়েছে। ভয়ের কারণে, সুদখোর ব্যক্তিটি পাছে ঘাড় চেপে ধরে।

আমরা কয়েকজন যাচ্ছিলাম মানিকের নানাবাড়িতে। মানিক মানে ঔপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ১০৬ বছর আগে ১৯০৮ সালে যার জন্ম। নানাবাড়িতে তিনি নিশ্চয়ই থেকেছেন, অল্প সময়ের জন্য হলেও। সেই গ্রামের নাম গাওদিয়া। গ্রামটি বিক্রমপুরের লৌহজং থানার অংশ। লৌহজংয়ের অনেকটা পদ্মায় ভেঙে গেছে, গাওদিয়া টিকে থাকবে কি না কে জানে। কিন্তু বাস্তবে না থাকলেও সাহিত্যে থাকবে, কেননা মানিকের সেই কালজয়ী ঔপন্যাস ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ ওই গ্রামকে নিয়েই লেখা। ‘পদ্মানদীর মাঝি’তে যে নদী আছে সেটিও ওই গ্রাম থেকে দূরে নয়। আমরা যাচ্ছিলাম গাওদিয়া গ্রামে একটি পাঠাগারের উদ্বোধন উপলক্ষে। উন্নতির প্রশ্নটা ওই যাওয়ার সময়েই বিশেষভাবে মনে পড়ল।

উন্নতি হয়েছে বৈকি। আগে ওই সব এলাকায় যেতে হতো নৌকায় চেপে। একসময়ে নৌকা ছাড়া উপায় ছিল না। অথচ আমরা যাচ্ছিলাম মাইক্রোবাসে করে। কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা রাস্তা। আঁকাবাঁকা বটে, তবু রাস্তা তো এবং বাস গিয়ে থামল একেবারে গাওদিয়া গ্রামেই। মানিকের সময়ে যে উন্নতি ছিল, কল্পনারও অতীত। পথিমধ্যে বাস্তবিক উন্নয়নের দুটি অতিপ্রকৃষ্ট নিদর্শন একেবারে মূর্তিমান হয়েই দেখা দিল। একটি হলো মস্ত বড় একটি মাদ্রাসা, অপরটি মাদ্রাসার সঙ্গেই তুলনীয় একটি হাসপাতাল। এক অর্থে তো দুটিই চিকিৎসা কেন্দ্র; একটি নৈতিকতার, অপরটি অসুখের। তবে তফাৎ তো আছেই; মাদ্রাসাটা অবৈতনিক, হাসপাতালটি ব্যবসায়িক। এক হিসাবে কিন্তু ওই দুটির সঙ্গেই মুনাফা যুক্ত। মাদ্রাসাটি যারা করেছেন তারাও মুনাফা পাবেন বলে আশা করেছেন। কেবল যে পারলৌকিক তা নয়, ইহজাগতিকও বটে। আর কিছু না হোক সমাজে মানসম্মান তো বাড়বে, খ্যাতি তো জুটবেই। আর হাসপাতালটি তো চলবে পুরোপুরি ব্যবসায়িক ভিত্তিতে। এলাকার দুজন বিত্তবান ব্যক্তি, সহোদর ভাই তারা, এই দুটি মস্ত বড় প্রতিষ্ঠান গড়েছেন ওই এলাকায়। যে ছবির সঙ্গে তুলনীয় কোনো দালান আশপাশে চোখে পড়ল না।

ঠিক ১০৬ বছর না হোক আশি-নব্বই বছর আগে ওই গ্রামের শশী ডাক্তার কলকাতার মেডিকেল কলেজ থেকে ডিগ্রি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে সে তার ওই নিতান্ত অনগ্রসর হতচ্ছিরি গ্রামেই থাকবে, সেখানেই মানুষের চিকিৎসা করবে। চিকিৎসার জন্য সে একটি হাসপাতালও গড়বে। বলাবাহুল্য, সেটি কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ হবে না। মুনাফা লাভের প্রশ্নই থাকবে না। উদ্যোগটা হবে পুরোপুরি সামাজিক। শশী ডাক্তার কলকাতার জীবন দেখেছে। সে জীবনকে তার মনে হয়েছিল ‘বন্ধুর বিবাহের বাজনার মতো’ আনন্দের। কলকাতার আকর্ষণকে ছিন্ন করার সময় শশীর মনে হয়েছিল, ‘ওই সব অশিক্ষিত নরনারী, ডোবাপুকুর বনজঙ্গল মাঠ, বাকি জীবনটা এখানেই কাটাইতে হইবে নাকি? ও ভগবান একটা লাইব্রেরি পর্যন্ত যে এখানে নাই।’

ছিল না। গাওদিয়া গ্রামে একটি লাইব্রেরি পর্যন্ত ছিল না। সেদিন ছিল না। গত আশি-নব্বই বছরেও ছিল না। এতকাল পরে স্থানীয় কয়েকজন উৎসাহী মানুষের সামাজিক উদ্যোগে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামেই, তার স্মৃতিকে উদ্দেশ্য করেই। উদ্যোগটা যারা নিয়েছে, ‘অন্বেষা’ প্রকাশনের মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, তাদের একজন। তিনিই আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছিলেন পাঠাগারটি উদ্বোধন উপলক্ষে। গাওদিয়ার অনেক উন্নতি হয়েছে, বিশাল মাদ্রাসা ও আধুনিক হাসপাতালের কথা তো বললামই, এখানে অনেক ধনী ব্যক্তি আছেন, এদের কেউ কেউ বিদেশে থাকেন। কারও বা ব্যবসা আছে ঢাকা শহরে। কিন্তু গ্রামে একটি পাঠাগার নেই। পাঠাগার এই প্রথম হলো। কিন্তু মাদ্রাসাটির তুলনায় এটি কিছুই নয়, অতিসামান্য বটে।

আর যা নেই তা হলো পানি। নদী নেই, খালও নেই। তবে সড়ক হয়েছে। এবড়োথেবড়ো। বিপজ্জনক। ফেরার পথে অন্ধকারে আমাদের মাইক্রোবাসটি বিকল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, পরে জেনেছি অন্যটি যেটি একটু পরে ছেড়েছে, সেটি পথিমধ্যেই আড়াই ঘণ্টা বিকল হয়ে পড়ে ছিল। শেষে অনেক দূর থেকে মেরামতকারী এনে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। আমাদেরটিও বুড়িগঙ্গা ব্রিজ পার হয়ে যানজটে পড়ে আটকে ছিল এক ঘণ্টা।

উন্নতি তো বটেই। কিন্তু নদী কোথায়? খাল গেল কই? ‘পুতুলনাচের

ইতিকথা’র একেবারে প্রথম বাক্যটিতেই যে খালের কথা আছে, সেই খালটি আজ নেই, ভরাট হয়ে গেছে এবং প্রায় ওই খালের ওপরেই ছোট একটু জায়গা করে নিয়ে এই পাঠাগারটি দাঁড় করানো হয়েছে। সে কাজটা সহজ হয়নি, বোঝাতে হয়েছে যে জমিন বেদখল হয়ে যাবে না। গাওদিয়ার শশী ডাক্তার ভাবত তার জীবন নদীর মতো নিজের খুশিতে চলবে, পরে বুঝেছে সেই স্রোত সে পাবে না, তার জীবন হবে মানুষের হাতে কাটা খালের মতো। কিন্তু এখন স্বাভাবিক নদী তো দূরের কথা, হাতে কাটা খালও নেই। উন্নতি সব পানি শুষে নিয়েছে।

নদী বলি, খাল বলি এরা তো উপমামাত্র নয়, এরা তো জীবনেরই অপরিহার্য অঙ্গ। পানি না থাকলে জীবন নেই। সংবেদনশীলতা, করুণা, যোগাযোগ সব কিছু পানির অবদান। ওই যোগাযোগের কথাটাই ধরি না কেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যে উন্নতির কথা বলে সেটা নদীর নয়, সড়কেরই; কিন্তু তারই এক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে যে বাংলাদেশে নৌপথে এক টন ওজনের জিনিস এক কিলোমিটার দূরে নিতে খরচ পড়ে নব্বই পয়সা, রেলপথে নিলে খরচটা দাঁড়ায় দুই টাকা পঞ্চাশ পয়সা আর সড়কপথে পড়বে চার টাকা চুয়াত্তর পয়সা। প্রায় পাঁচগুণ। অথচ সড়কই গড়ে তোলা হচ্ছে, নদীকে বাদ দিয়ে। উন্নতি ওপরের দিকে খাড়াখাড়ি উঠে যাচ্ছে, আড়াআড়ি প্রবাহিত হচ্ছে নাÑনদী যেমনটা হয়। পদ্মা নদীতে এখন ইলিশের বড় অভাব, পদ্মা নদীর মাঝিরা কে কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জীবিত থাকলে বিশ্বাসই করতে পারতেন না যে এমনটা ঘটতে পারে।

গাওদিয়ার শশী কলকাতায় গিয়ে ডাক্তারি পড়বে, পড়েছে। তার কারণ নদীপথে কলকাতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। স্টিমার তারপাশাঘাট থেকে ছেড়ে কলকাতা বন্দরে পৌঁছে যেত। ফলে কেবল যে শিক্ষাদীক্ষায় সুবিধা হয়েছে তাই নয়, এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবনেও একটি নিজস্ব প্রবাহ গড়ে উঠেছিল। তামাকাঁসার জিনিসপত্র, পাট, তাঁতের কাপড়Ñ সব যেত কলকাতায়। দেশভাগের ফলে কলকাতা চলে গেছে অন্যত্র, গাওদিয়া পড়ে রয়েছে অর্থনৈতিক প্রবাহশূন্য এক দুর্দশায়। ওই গ্রামে একসময়ে কয়টা মুসলিম পরিবার ছিল জানা যায় না, তবে অধিকাংশ মানুষই যে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল তাতে সন্দেহ নেই। জানা গেল যে দু-দুবার স্বাধীন হওয়ার পর যে উন্নতি ঘটেছে তাতে উৎপাটিত হয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সব পরিবার চলে গেছে, কেবল একটি এখনো রয়েছে, রাজসাক্ষীর মতো। শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের কথা বলছি কেন, মুসলমানদেরই বা কী অবস্থা। দরিদ্র কৃষক ভূমিহীন হয়ে চলে গেছে শহরে, কেননা গ্রামে তার জন্য কোনো কাজ নেই। আর যারা অবস্থাপন্ন তারাও শহরেই থাকে, গ্রামে থাকবে এমনটা ভাবতেই পারে না।

একসময়ে এ অঞ্চলে একটা শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন ছিল। থাকার কারণ ওই শশী ডাক্তারেরা। তারা সামাজিক উদ্যোগে কেবল হাসপাতালই গড়েনি, সমাজকে বদলে দেওয়ার কথাও ভেবেছে। এখন সে আন্দোলনটা নেই, যেমন নদী নেই, খাল-বিল কিছুই নেই। সব ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ওসব ছিল সামাজিক সম্পত্তি, এখন সামাজিক সম্পত্তিকে ব্যক্তিমালিকানার আক্রমণ থেকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব কর্ম।

তবু একটা উদ্যোগ তো দেখলাম। সেটা কেবল মানিককে নয়, শশীকেও স্মরণ করা বটে। শশী ভাবত, ‘সে তো গ্রামের সন্তান। গ্রাম্য নরনারীর মধ্যে গ্রামের মাটি মাখিয়া গ্রামের জলবায়ু শুষিয়া সে বড় হইয়াছে।’ আমাদের প্রত্যেকের ব্যাপারেই তো ওটি সত্য, গ্রামের না হোক দেশের জলবায়ু ছিল বলেই না আমরা যে যতটা পারি ‘উন্নত’ হয়েছি।

কিন্তু এই উন্নতি যে প্রাণঘাতী হয়ে পড়েছে এটা না বুঝলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হতে বাধ্য। নদী জলাশয় পুকুর খাল বিল এসবের মৃত্যু কেবল যে প্রকৃতির মৃত্যুর সংকেত তা তো নয়, মানুষের মৃত্যুরও পূর্বাভাস বটে। উন্নতির ভয়াবহ প্রবাহকে অবশ্যই প্রতিহত করা চাই। কিন্তু কারা করবে সে কাজ? করবে তারাই শশী ডাক্তারের মতো যারা সামাজিক মানুষ, যারা বোঝে সমাজ না থাকলে মনুষ্যত্ব নেই, মানুষের মতো বাঁচাও নেই। উন্নতি তো অতিশয় দূরবর্তী কল্পনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত