বিশ্বের কোথাও কোনো সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সংঘটিত হলে আইএস-এর দায় স্বীকার যেন একটি অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। তাই যেকোনো নাশকতার পরপরই বিশ্বগণমাধ্যমের মনোযোগ কেড়ে নেয় আমাক নিউজ এজেন্সি। কারণ আইএস-এর যাবতীয় দায় স্বীকার এবং হুমকি-ধামকির মতো প্রেস রিলিজগুলো এই মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। শ্রীলঙ্কার ইস্টার সানডে হামলার দায় স্বীকার করতে না করতেই এবার বাংলা ভাষায় আইএস-এর একটি হুমকিপত্রও প্রকাশিত হয়েছে আমাক নিউজ এজেন্সিতে। এই এজেন্সির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং এর আইএস সংযোগ নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি
আইএস ও আমাক নিউজ এজেন্সি
কে ভেবেছিল, একুশ শতকে পা দিয়েই একেবারে আমেরিকার খাস-তালুকে হানা দেওয়ার সাহস দেখাবে আল-কায়েদা? তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। আমেরিকায় ঢুকে এত বড় ক্ষতি আর কে করতে পেরেছে? তবু গত সাত/আট বছর ধরে বিশ্ব গণমাধ্যমের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু আল-কায়েদা নয়, বরং আইএস বা ইসলামিক স্টেট নামের সন্ত্রাসী সংগঠনটি। অনেকে বলছেন, আল-কায়েদার দিন ফুরিয়েছে, সময় এখন আইএস-এর। এর কারণটা সম্ভবত লুকিয়ে আছে আইএস-এর সংগঠন পরিচালনার কায়দা-কৌশলেই। আমাক নিউজ এজেন্সি এই কৌশলেরই একটি অংশ।
আটলান্টায় জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সিনিয়র প্রফেসর শার্লি উইন্টারের গবেষণা থেকে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর আগেই একেবারে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি নিউজ এজেন্সি চালু করেছে আইএস, যার নাম ‘আমাক নিউজ এজেন্সি’ (এএনএ) বা ‘আনা’। এই এজেন্সি প্রতি মুহূর্তে, প্রতি ঘণ্টায় এবং প্রতি দিন ‘খবর’ পাঠিয়ে চলেছে বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই, সাধারণ মানুষের কাছে। এসবের মধ্যে আছে তাদের সংগঠন, তাদের মতাদর্শের খবর। আইএসের সক্রিয় সদস্যরা কীভাবে চলেন, তাদের জীবনযাপনের পদ্ধতি কেমন, তাদের নিয়মানুবর্তিতা কতটা, তাদের মতাদর্শ কতটা নিখাদ, কতটা স্বচ্ছতা রয়েছে তাদের সংগঠন চালানোর পদ্ধতি-প্রকৌশলে, বিনোদন বলতে তারা কী বোঝে, মহিলাদের সম্পর্কে তাদের কী ধ্যান-ধারণা, ওই নিউজ এজেন্সির মাধ্যমে সেটাই কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
শুরুর দিকে আমাক নিউজ এজেন্সি বা এএনএ’র সব খবর প্রকাশিত হতো আরবি ভাষায়। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও তিনটি ভাষা রুশ, ফরাসি আর ইংরেজি। আমাক নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত খবরগুলোর খুবই সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়। সে সব লেখার কায়দাও বেশ কৌশলী। যেন কোনো সাংবাদিকের রসিয়ে-রসিয়ে লেখা। গভীরে ঢুকে লেখা। সেই লেখায় কালেভদ্রে থাকে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম। থাকে না বললেই চলে আইএসের সর্বাধিনায়ক বা তার কোনো কমান্ডারের ছবি বা প্রতি দিনের বিবৃতি। এমনকি, লোকজনের মাথা কাটার কোনো ছবি বা ‘খবর’ও দেয় না সেই নিউজ এজেন্সি।
তার ‘খবর’ দেওয়ার ভাষাটা এতই ‘ভদ্র’ যে আইএসের ‘আত্মঘাতী জঙ্গি’ বা ‘সুইসাইড বম্বার’কেও সেখানে বলা হয় ‘মর্টারডম অপারেশনস’ বা ‘শহীদের কাজ’।
প্রতিষ্ঠাতা এক সিরিয়ান সাংবাদিক
সিরিয়ান সাংবাদিক বারা কাদেক ২০১৩ সালে আইএস-এ যোগ দেন। তার হাত ধরেই গঠিত হয় আইএস-এর গণমাধ্যম হিসেবে বহুল পরিচিত আমাক নিউজ এজেন্সি। এসময় তার সঙ্গে আরও সাতজন সহযোগী ছিলেন। মূলত তাদের সবাই কাজ করতেন হালাব নিউজ নেটওয়ার্কে। মার্কিন গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, আমাক নিউজ এজেন্সির সঙ্গে আইএস-এর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এই নিউজ এজেন্সি মূলত আইএস নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এর নামটি গ্রহণ করা হয়েছে আমিক উপত্যকার নামানুসারে। হাদিসে বর্ণিত আছে, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ হাতায় প্রদেশের আমিক উপত্যকায় অবিশ্বাসসীদের সঙ্গে মুসলিমদের এক যুদ্ধজয়ের কাহিনী। সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে আমাক নিউজ এজেন্সির নামকরণ।
২০১৪ সালে আইএস কর্তৃক সিরিয়ার কোবানি শহর দখলের সময় উগ্রপন্থিদের নিয়ে কাজ করা মার্কিন গণমাধ্যম সাইট ইন্টেলিজেন্স সর্বপ্রথম আমাক নিউজ এজেন্সির সন্ধান পায়। আমাক নিউজ এজেন্সি সে সময় আইএস যোদ্ধাদের মধ্যে খবরাখবর শেয়ার করত। পরে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দায় স্বীকার করতে আইএস যখন এই মাধ্যমটিকে বেছে নিত তখন থেকেই এর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সান বার্নারদিনোতে এক মুসলিম দম্পতি ১৪ জনকে গুলি করে হত্যা করলে ওই ঘটনার পরদিনই আমাক নিউজ এজেন্সিতে দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয় আইএস। এরপরই বিশ্ব গণমাধ্যম আগ্রহী হয়ে ওঠে নিউজ এজেন্সি সম্পর্কে। সানবার্নার্দিনোতে হামলাকারী ওই স্বামী-স্ত্রী ঘটনাস্থলেই নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে গুলিবিনিময় করে নিহত হয়েছিলেন। এ দুজনের মধ্যে সাইদ রিজয়ান ফারুক ছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, আর তার স্ত্রী তাশফিন মালিকও ছিলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত, তবে তিনি সৌদি আরবেই বেশির ভাগ সময় ছিলেন।
২০১৫ সালে আইএস কর্তৃক সিরিয়ার পালমিরা অঞ্চল দখলে নেওয়ার সময় আমাক নিউজ এজেন্সির একজন ক্যামেরাম্যান প্রথমবারের মতো ওই যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও প্রকাশ করেন। একই বছরে আমাক-এর একটি মোবাইল অ্যাপও যাত্রা শুরু করে এবং গোয়েন্দাদের দ্বারা সৃষ্ট এই নিউজ এজেন্সির কয়েকটি নকল সাইট সম্পর্কে গ্রাহকদের সতর্ক করা হয়। এর একটি টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট এবং ওয়ার্ডপ্রেস ভিত্তিক ব্লগ চালু ছিল। যদিও ২০১৬ সালের এপ্রিলে এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের ৩১ মে একটি ফেইসবুক পোস্টে ঘোষণা করা হয় সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর মায়াদিনে এক বিমান হামলায় আমাক-এর প্রতিষ্ঠাতা বারা কাদেক রায়ান মাশালের নিহত হওয়ার খবর। মার্কিন জোটের ওই বিমান হামলায় মাশালের কন্যাও নিহত হয়। ফেইসবুকে ওই পোস্টটি প্রকাশ করেছিল মাশালের ছোট ভাই। তাৎক্ষণিকভাবে ওই খবরের সত্যতা সম্পর্কে কোনো কিছু জানা না গেলেও ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই মাশালের কন্যাসহ নিহত হওয়ার খবরটি আমেরিকার পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়।
২০১৭ সালেরই জুন মাসে জার্মান পুলিশ মোহাম্মদ জি. নামধারী ২৩ বছর বয়সের এক সিরিয়ান যুবককে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি সুইডেনে মালমো মুসলিম কম্যুনিটি সেন্টারে অগ্নিসংযোগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন আমাক নিউজ এজেন্সিতে রিপোর্ট করার জন্য।
২০১৯ সালের ২১ মার্চ মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাক নিউজ এজেন্সি’কে আইএস-এর দোসর হিসেবে ঘোষণা করে এবং এটিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে।
যেভাবে খবর প্রকাশিত হয়
লিখিত এবং ভিডিও দুভাবেই ছোট ছোট খবর প্রকাশ করে আমাক নিউজ এজেন্সি। মোবাইল অ্যাপ এবং টেলিগ্রামের মধ্য দিয়ে ওই খবরগুলো প্রকাশিত হতো। মূলধারার সাংবাদিকতার মতোই ‘ব্রেকিং নিউজ’ হেডিং এবং আইএস-এর যুদ্ধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশ করে আমাক। প্রতিবেদনগুলো তৈরি করা হয় কিছুটা নিরপেক্ষ ভাব নিয়ে, যদিও এর ভাষাটা অনেকটা জিহাদি স্টাইলে।
আন্তঃসাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা বিষয়ে কাজ করা জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষক চার্লি উইন্টার এবং সাইট ইন্টেলিজেন্সের রিটা কাট্জ বলেন, আমাক নিউজ এজেন্সিটির আচরণ অনেকটা আইএস-এর রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতো। যদিও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কখনোই এ ধরনের কোনো স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়নি।
রিটা কাট্জ বলেন, আমাক-এর ধরন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মতোই। আর আইএস সংগঠনটি নিজেদের একটি রাষ্ট্রই ভাবে। আর প্রত্যেকটি রাষ্ট্রেরই একটি নিজস্ব সংবাদমাধ্যম প্রয়োজন। আমাক মূলত আইএস-এর মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। তাই আমাক-এর সংবাদগুলোতে আইএস’কে বৈধতা দেওয়ার সুরটি পাওয়া যায়।
বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু?
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগামী সংবাদ সংস্থা ‘আল-মাসদার নিউজ’-এর ক্রিস থমসনের বক্তব্য অনুযায়ী, আমাক নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত আইএস বা ইসলামিক স্টেটের অগ্রযাত্রা সম্পর্কিত খবরগুলো সাধারণত সত্যই হয়ে থাকে, তবে তাদের খেলাফত হারানোর খবরগুলো খুঁজেই পাওয়া যায় না।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর রুকমিনি ক্যালিমাচি বলেন, ‘সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কৃতিত্ব নিতে এই গণমাধ্যমটিতে আইএস তাদের দায় স্বীকারমূলক বিবৃতি প্রদান করে। তবে, অনেক ক্ষেত্রেই মূল ঘটনার সঙ্গে আইএস-এর হয়তো কোনো সংযোগই থাকে না। দায় স্বীকারের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, ওই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কিত ভুল তথ্য উপস্থাপন করছে আইএস কিংবা ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। তবে, ওই দাবির সারকথাটি সাধারণত সত্যই হয়ে থাকে।’
ক্যালিমাচি আরও বলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে, আইএস কর্মীরা সরাসরি জড়িত এমন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের দায় স্বীকার ছাড়াও সরাসরি কর্মী নয় এমন সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ডকেও নিজেদের বলে চালিয়ে দিতে সচেষ্ট হয় সংগঠনটি। এটা তাদের প্রচারণারই একটি অংশ। উপরন্তু বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হত্যাকারীদের পরিচয় প্রকাশের আগেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দায় স্বীকার করে নিয়েছে তারা।’
দ্য আটলান্টিক পত্রিকার নিয়মিত লেখক ও সাংবাদিক গ্রায়েম উড বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী কার্যকলাপগুলো সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়ার পর এর কৃতিত্ব নিজের করে নিতে একটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ করে আইএস। উদাহরণস্বরূপ আমাক-এর বরাত দিয়ে ২০১৭ সালে লাস ভেগাস শ্যুটিংয়ের কৃতিত্ব দাবি করে আইএস। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, ওই হামলাটির সঙ্গে আইএস-এর কোনো যোগ নেই। এটি ঘটিয়েছিলেন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত স্টিফেন প্যাডলক নামে এক শ্বেতাঙ্গ। ৫৮ জনকে হত্যা করে তিনি নিজেও আত্মহত্যা করেছিলেন।’
২০১৭ সালের অক্টোবরে মার্কিন গণমাধ্যম দ্য হিল-এ প্রকাশিত এক আর্টিকেলে বলা হয়- এক সঙ্গে অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যার ঘটনাকে সাধারণত নিজেদের সমর্থকদের করা কাজ হিসেবে দাবি করে আইএস। তবে, এই দলটিকে যেসব গবেষক খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তারা মনে করেন, অপরাধীর সঙ্গে সংগঠনটির সরাসরি যোগ না থাকলেও আদর্শগত মিল থাকে অনেকাংশেই।
বর্তমানে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত হচ্ছে আইএস। এর আগে ফিলিপাইনের ‘রিসোর্টস ওয়ার্ল্ড ম্যানিলায়’ গুলি এবং বিস্ফোরকের সাহায্যে ৫৮ জনকে হত্যার ঘটনায় হামলাকারীকে নিজেদের বলে দাবি করেছিল আইএস। তবে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই দেখা যায় ওই ব্যক্তির সঙ্গে সংগঠনটির কোনো যোগসূত্র নেই।
সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের রিটা কাট্জ বলেন, ‘আমাক নিউজ এজেন্সিটি সন্ত্রাসীদের খেলাফতের যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেয়। নিজেদের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে উদ্বুদ্ধ করতে আইএস’ও তাদের কর্মীদের ঠিক এই উপায়ে বিশেষায়িত করে।’
