দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি এসিআই লিমিটেড ডুবতে বসেছে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে পণ্য বিক্রির আয়ে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে থাকলেও কয়েকটি সাবসিডিয়ারির লোকসানে বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছে কোম্পানিটি। সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে এবার মূল কোম্পানি বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসিআইর সাবসিডিয়ারিগুলো ১০টি খাতে বিভক্ত। এর মধ্যে পাঁচটি খাতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট করা নয়, এমন কয়েকটি ছোট খাতেও লোকসান দিতে হচ্ছে এসিআইকে।
এ ছাড়া লাভজনক সাবসিডিয়ারি থেকেও মুনাফা কমতে দেখা গেছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে পণ্য বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও দীর্ঘ সময় ধরে সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর লোকসান টানতে গিয়ে মূল কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। সাবসিডিয়ারির জন্য নেওয়া ব্যাংকঋণের ফাঁদে পড়ে চলতি হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৩৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা নিট লোকসানে পড়েছে। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ৪০ কোটি টাকা নিট মুনাফায় ছিল এসিআই। সাবসিডিয়ারি ও যৌথ উদ্যোগ মিলিয়ে মোট ১৮টি কোম্পানি রয়েছে এসিআই গ্রুপে।
চলতি তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসিআই লিমিটেডের বিক্রি থেকে আয় সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়েছে। এতে মোট আয়ও সামান্য বেড়েছে। তবে প্রশাসনিক, বিক্রি ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বাড়ায় পরিচালন আয় আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে। একই সময়ে সুদবাবদ ব্যয় বাড়ায় তৃতীয় প্রান্তিকে এসে ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা নিট লোকসানে পড়ে।
২০১৭-১৮ হিসাব বছরের তুলনায় চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে এসিআই লিমিটেডের পণ্য বিক্রিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ শতাংশ। চলতি তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত পণ্য বিক্রি থেকে এসিআইর আয় হয়েছে ৪ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রশাসনিক, বিক্রি ও বাজারজাতকরণ ব্যয় বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ। আর সুদবাবদ ব্যয় হয়েছে ২২৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের প্রথম নয় মাসের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি। মূলত সুদবাবদ ব্যয় বাড়ায় চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ)।
এ লোকসানের কারণ হচ্ছে পাঁচ খাতে ব্যবসা করা সাবসিডিয়ারিগুলো ভালো ব্যবসা করতে না পারায়। এসিআইর সাবসিডিয়ারিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান দিচ্ছে রিটেইল চেইন শপ ‘স্বপ্ন’। এ কোম্পানিটি চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে ১১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার কর-পূর্ববর্তী লোকসান দিয়েছে। কনজ্যুমার ব্র্র্যান্ড খাতে এসিআইর কর-পূর্ববর্তী লোকসান হচ্ছে ৪৯ কোটি টাকা।
এ ছাড়া অ্যানিমেল হেলথ, খাদ্য ও প্লাস্টিক খাতে ৩৫ কোটি টাকার বেশি কর-পূর্ববর্তী লোকসান দিয়েছে। এর বাইরে নির্দিষ্ট করা নয়, এমন কয়েকটি ছোট খাতে ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে এসিআই। তবে ফার্মাসিউটিক্যালস, ক্রপ কেয়ার অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, মোটরস, পিউর ফ্লাওয়ার ও লবণ খাতের ব্যবসায় মুনাফা অব্যাহত আছে।
এসিআইর গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বপ্নসহ কয়েকটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের টানা লোকসানে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে এখন লোকসানে পড়ে গেছে। পুঞ্জীভূত মুনাফাও কমে যাচ্ছে। অনলাইন জায়ান্ট আমাজনও একই সমস্যায় পড়েছিল।
২০১০ সালে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ৫৪৫ মিলিয়ন ডলারে কুইডজি নামে এক প্রতিষ্ঠান কেনে। প্রায় ১১০০ জনবলের কুইডজি পরবর্তী সাত বছর টানা লোকসান দেয়। এমন পরিস্থিতিতে মুনাফায় আনতে না পেরে ২০১৭ সালে কুইডজি বন্ধ ঘোষণা করে আমাজন।
লোকসানি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করায় আমাজনের মুনাফা বাড়ে। তবে এসিআই সাবসিডিয়ারি নিয়ে সংকটে পড়লেও সেগুলো বন্ধ কিংবা বিক্রি করার মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে লোকসানের পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে।
এসিআই লিমিটেডের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত স্বপ্নর মোট ব্যাংকঋণ ছিল ৮৬৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। তবে ২০১৮ সালের জুন শেষে এ ঋণের পরিমাণ কমে ৬৪০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। তবে ঋণ কমলেও সুদ পরিশোধের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে স্বপ্নকে সুদবাবদ ৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, যা পুরো গ্রুপের সুদ ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ে স্বপ্নর সুদ ব্যয় ছিল ৬৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এসিআইর মোট রেভিনিউর ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ আসে স্বপ্ন থেকে।
২০০৮ সালে স্বপ্ন নাম নিয়ে সুপারশপ ব্যবসায় প্রবেশ করে এসিআই লিমিটেড। সারা দেশে স্বপ্নর মোট ৭৩টি আউটলেট রয়েছে। প্রতিষ্ঠার ১১ বছরে দেশের শীর্ষস্থানীয় রিটেইল চেইন শপে পরিণত হলেও শুরু থেকেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনছে।
দিন যত যাচ্ছে, লোকসানের পরিমাণও বাড়ছে। ২০১৭-১৮ হিসাব বছর শেষে স্বপ্নর পুঞ্জীভূত লোকসান ছিল ৮৯১ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় ছিল ২৬০ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে এক হাজার ২৬৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বছরে শতকোটি টাকার বেশি লোকসানে এসিআইর স্বপ্ন এখন এসিআইর শেয়ারহোল্ডারদের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
খাদ্য খাতে চলতি হিসাব বছরের নয় মাসে কর-পূর্ববর্তী লোকসান হয়েছে ২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ফলে এ খাতটিতে পুঞ্জীভূত লোকসান প্রায় ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ বছর নতুন করে লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে সাবসিডিয়ারি প্রিমিয়াফ্লেক্স প্লাস্টিক লিমিটেড। চলতি তৃতীয় প্রান্তিকে এ সাবসিডিয়ারিটি ৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ কোম্পানিটি ১৪ কোটি টাকা মুনাফায় ছিল।
লোকসানে রয়েছে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি এসিআই এগ্রোলিংক লিমিটেড, এসিআই কেমিক্যাল, এসিআই ইনফোলিটক্স বাংলাদেশ ও বায়োটেক। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওষুধ রপ্তানির উদ্দেশ্যে গঠিত এসিআই হেলথকেয়ার লিমিটেডও লোকসানে রয়েছে।
