জামায়াতে ইসলামীর একটি বড় অংশ দলের বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন ‘জনআকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ নামে রাজনৈতিক মঞ্চে যোগ দিচ্ছেন বলে জামায়াতের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব নেতা বলেছেন, দলের যেসব নেতা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে চান না, তারা ও তাদের অনুসারীরা এই মঞ্চের নেতৃত্বে গঠন হতে যাওয়া নতুন রাজনৈতিক দলে থাকছেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ থাকবেন ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতারা। এমনকি বিভিন্ন সময় আদর্শের দ্বন্দ্বে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া ও দলে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় নেতাদের নতুন মঞ্চে যোগ দেওয়া এখন সময়ের ব্যাপার বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক নেতা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ‘জনআকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত জামায়াতে ইসলামীর এক সাবেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করা প্রভাবশালী নেতা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক নতুন দলে থাকছেন এটা নিশ্চিত। মূলত তিনিই হবেন এই দলের ‘থিংক ট্যাংক’। তবে তার পদ কী হবে তা এখনো ঠিক হয়নি। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জু একসময় চট্টগ্রাম কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরেরও সভাপতি ছিলেন। গত বছর বহিষ্কৃত হওয়ার আগে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ছিলেন তিনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মজিবুর রহমান মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজ্জাক সাহেব (ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক) এখনো নেই। তবে থাকবেন। যুক্ত হবেন।
‘আবদুর রাজ্জাক মূলত বিভিন্ন দেশে যেসব জামায়াত নেতা ও জামায়াত অনুসারীরা রয়েছেন, তাদের সংগঠিত করতে সাহায্য করবেন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রাখবেন। দলের থিংক ট্যাংক হবেন’ জানান মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত ছাত্রশিবিবের এক সাবেক নেতা। এই নেতা আরও বলেন, জামায়াতের সংস্কারপন্থিরা থাকছেন।
জামায়াতের নেতারা বলেন, দলের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসি কার্যকর ও নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিলের পর থেকেই নতুন দল গঠনের কৌশল নেয় দলটি। তবে আদর্শের জায়গায় এক হতে না পেরে এখন পর্যন্ত সম্মিলিতভাবে নতুন দল গঠনের কোনো উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। বরং মতানৈক্যের কারণে দলে ভাঙন দেখা দেয়। গত ফেব্রুয়ারিতে দল থেকে পদত্যাগ করেন প্রভাবশালী নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। পরে তার পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ায় বহিষ্কৃত হন ছাত্রশিবিরের সাবেক জনপ্রিয় নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জু। দলে ভাঙন ঠেকাতে উঠেপড়ে লাগেন দলের মূল নেতৃত্ব। এরই মধ্যে গতকাল শনিবার জামায়াতে ইসলামী থেকে সদ্য বহিষ্কৃৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে দলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠল।
গতকালের সংবাদ সম্মেলনে এই মঞ্চকে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কবে নাগাদ ও নতুন দলে ধর্মীয় রাজনীতির অবস্থান ঠিক কী হবে, তা স্পষ্ট করেননি মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল করব না।’ তবে দলের আদর্শে ‘ধর্ম’ থাকবে না- এমনটাও বলেননি তিনি।
নতুন দল গঠন নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্তে কথা হয় মজিবুর রহমান মঞ্জুর। কবে নাগাদ নতুন দল হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মাত্র ঘোষণা দিলাম। এর আগে দলের অনেকেই যোগাযোগ করেছেন। এখনো করছেন। এতদিন তাদের সংগঠিত করিনি। এখন করব। তবে দল গঠনের দিনক্ষণ নির্দিষ্ট হয়নি। নির্দিষ্ট সময়ও বলতে পারব না। এটা নির্ভর করবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিও ফ্যাক্টর।’
শোনা যাচ্ছে জামায়াতের একটা বড় অংশ যোগ দেবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যোগ দেবেন। তবে কারা দেবেন এখনই কিছু বলছি না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
এটা কি জামায়াতের নতুন দল- জানতে চাইলে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘নতুন কনসেপ্ট। আমরা জামায়াত বা কম্যুনিস্ট পার্টি কারোর বিরোধী না। এ ধরনের রাজনীতি বিরোধ তৈরি করে। আমরা খোলামেলা রাজনীতি করব।’
‘দলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের লোকজন যোগ দিতে পারবে। ক্লিন ইমেজের নেতৃত্ব থাকবে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করব না। জনআকাক্সক্ষার দল হবে।’
জামায়াতে ইসলামী কোনো বাধা দিচ্ছে কি নাÑ জানতে চাইলে এর সরাসরি উত্তর দেননি এই নেতা। তিনি বলেন, ‘জামায়াত আমাকে বের করে দিয়েছে। আমার ফেসবুক দেখলে বুঝবেন ওরা বাধা দিচ্ছে কি না। এ নিয়ে আমি কিছু বলব না। চোখকান খোলা রাখলে যে কেউই জামায়াতের অবস্থান বুঝতে পারবেন।’
নতুন রাজনৈতিক মঞ্চের ঘোষণা জামায়াতের মূল নেতৃত্বকে চাপ ও উদ্বেগে ফেলেছে বলে জানিয়েছেন দলের একাধিক নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক কর্মপরিষদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গতকাল শনিবার নতুন করে দলের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের সংস্কারপন্থি নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জড়িতদের পর্যবেক্ষণে রেখেছেন জামায়াতের নীতিনির্ধারকরা। দলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যাতে নতুন দল গড়ার উদ্যোগে অংশ না নেন, সে জন্য কড়া নজরদারির পাশাপাশি সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহী অঞ্চলের জামায়াত ও শিবিরের অন্তত অর্ধশত নেতা ও সদস্যকে ডেকে আলাদাভাবে কথা বলেছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। শিগগির কেন্দ্রীয় নেতারা দলের সাংগঠনিক সফরে বের হবেন।
এ ব্যাপারে জানতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেন্দ্রীয় সংগঠন প্রয়োজন মনে করলে এ ব্যাপারে জানাবেন। তা ছাড়া এটা নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কী করবে না করবে সেটা তাদের অধিকার।
নতুন মঞ্চের আত্মপ্রকাশ
শনিবার ঢাকার একটি হোটেলে মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘জনআকাক্সক্ষার বাংলাদেশ’ সেøাগানের একটি মঞ্চের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করা হয়। এটা তাদের রাজনৈতিক দল গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ বলেও জানানো হয়। তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর সংস্কারপন্থি নেতারা। আজ থেকে আমাদের কাজ শুরু হলো।’
মঞ্জু জানান, পূর্ণাঙ্গ দল গঠনে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ শুরু করেছে। তিনি এই উদ্যোগের সমন্বয়ক। এসব কমিটিতে দেশে-প্রবাসে কর্মরত তাদের মতের সঙ্গে সম্পৃক্ত চিন্তাধারার মানুষ এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
ছাত্রশিবিরের এই সাবেক নেতা বলেন, ‘আমরা কোনো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি না। আমরা যে রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি, তা হবে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য।’
এই উদ্যোগে জামায়াতসহ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের নতুন দলের কোনো সম্পর্ক এবং এই উদ্যোগের পেছনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কোনো মদদ নেই বলেও জানান মঞ্জু।
জামায়াতের এই বহিষ্কৃত নেতা আন্তর্জাতিক মানদ- বজায় রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিষ্পত্তির দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট ১৯টি বিষয়ে একমত হয়েছি। নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করছি না। জনগণের আকাক্সক্ষাভিত্তিক দল গঠন করব।’
সংবাদ সম্মেলনে মঞ্জু বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার দায় স্বীকারের আহ্বান জামায়াত নেতৃত্ব অগ্রাহ্য করেছে। এই রাজনৈতিক অবস্থানের বোঝা একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্মের বহন করা উচিত নয় বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
মঞ্জু লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আবুল হাশিম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে খাজা নাজিমুদ্দীনকেও স্মরণ করেন। তিনি প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানও স্বীকার করেন।
বিজয় একাত্তর হোটেলে এই সংবাদ সম্মেলনে মঞ্জুর পাশে তাজুল ছাড়াও ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হক, গোলাম ফারুক, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তফা নূর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন, মাওলানা আবদুল কাদের, নাজমুল হুদা অপু, মো. সালাউদ্দিন, ব্যারিস্টার জোবায়ের আহমেদ ভূইয়া, আবদুল হক প্রমুখ। সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, নুরুল ইসলাম ভূইয়া ছোটন, গৌতম দাশ, রুবী আমাতুল্লাহ, সুকৃতি কুমার ম-লও এই অনুষ্ঠানে ছিলেন।
