দিদির ঘর পোড়ার আশায় বিজেপি

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৩১ এএম

তিনি কখনো হুংকার দেন, ‘কান পাতলেই শোনা যাবে ঢাকের চরাম চরাম।’ কখনো বলেন, ‘গুড়-বাতাসা’, ‘পাঁচন’ বা ‘নকুলদানা খাওয়ানোর’ কথা। এসব অদ্ভুত বুলি লেগেই আছে তার মুখে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্দরের খবর যারা রাখেন না, তাদের পক্ষে এহেন সব রহস্যময় শব্দব্রহ্মের অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তিনি অনুব্রত মন্ডল, শাসক দল তৃণমূলের বীরভূম জেলা সভাপতি। এবং ‘দিদির’ (মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) অত্যন্ত স্নেহভাজন।

২০১৮-এর পঞ্চায়েত ভোটের আগে অনুব্রত বলেছিলেন, ‘বিরোধীরা মনোনয়ন পেশ করতে গিয়ে দেখবেন পথে উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে।’ কার্যক্ষেত্রে অক্ষরে-অক্ষরে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তার কথা। গোটা পঞ্চায়েত নির্বাচন পর্ব জুড়ে বাঁশ-লাঠি, ছুরি-বোমা নিয়ে বুথ পাহারা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘উন্নয়ন’। অনুব্রতর গড় বীরভূম জেলা পরিষদের ৪২টি আসনের ৪১টিতেই বিরোধী প্রার্থীরা মনোনয়ন পেশ করতে পারেননি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যায় তৃণমূল।

শুধু বীরভূম নয়, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্যের শাসকদলের বাহুবলী আস্ফালন দেখেছে গোটা রাজ্য। এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি গ্রাম পঞ্চায়েত আসনে বিরোধীরা প্রার্থী দিতে না পারায় ওয়াকওভার পেয়ে যায় তৃণমূল। ব্যালটের লড়াই গড়ায় আইনি লড়াইয়ে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট অবধি। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে না পারার ক্ষোভ এক বছর পরও জ¦লছে ধিকধিক করে। সেই অতৃপ্তি আর অধিকার হরণের ক্ষোভই চলতি নির্বাচনে বিজেপির অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বস্তুত, এই আশঙ্কার চোরা স্রোত বইছে তৃণমূলের অন্দরেও।

প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও তৃণমূলের জেলাস্তরের একাংশ নেতা জনান্তিকে মানছেন, পঞ্চায়েত ভোটে দলের বাহুবলী ভাবমূর্তি বুমেরাং হতে পারে তাদের কাছে। কেননা, ক্ষোভে ফুঁসছে সন্ত্রাসে বীতশ্রদ্ধ বাংলার মানুষ। আর যেহেতু ওই লাগামছাড়া সন্ত্রাসের পর্বেও সামান্য হলেও প্রতিরোধটা এসেছিল বিজেপির তরফ থেকেই, তাই মানুষের নেতিবাচক ভোটের একটা বড় অংশ ঢলতে পারে গেরুয়া শিবিরের দিকেই। এই আশাতে বুক বেঁধে আছে কেন্দ্রের শাসক দলও।

বলা বাহুল্য, পঞ্চায়েত নির্বাচনের সেই বে-লাগাম সন্ত্রাসের প্রত্যক্ষ ফল, পশ্চিমবঙ্গে সাত দফা ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা। এ রাজ্যের ক্ষেত্রে এ এক প্রায় নজিরবিহীন নির্বাচনী নির্ঘণ্ট। সাম্প্রতিক অতীতের দৃষ্টান্ত সামনে রেখে আর কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি নির্বাচন কমিশন। নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরই প্রতিবাদে সরব হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ভ্রান্ত রিপোর্ট কমিশনকে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। একইভাবে তিনি সরব হয়েছেন নির্বাচনে নিয়োজিত কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধেও।

চলতি নির্বাচন যত এগোচ্ছে ততই বাড়ছে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বহর। আগামী সোমবার চতুর্থ দফার ভোটে রাজ্যের আট কেন্দ্রে ৫৮৪ কোম্পানি আধাসামরিক বাহিনী পাহারায় থাকবে বলে জানিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শুধু বুথের চারপাশে নয়, ফৌজ মোতায়েন থাকবে গ্রামে গ্রামে, রাস্তাঘাটে। যাতে ভয় দেখিয়ে ভোটারদের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে আসতে কেউ বাধা দিতে না পারে।

নিরাপত্তার এত নিñিদ্র বাঁধন, তবু বাংলার ভোটে সন্ত্রাসে বাঁধ দেওয়া যায়নি। মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় খুন হয়েছেন এক কংগ্রেস কর্মী। চলছে চোরাগোপ্তা, প্রকাশ্য হামলা। আক্রান্ত হয়েছেন এমনকি বিরোধী দলের একাধিক প্রার্থী। রক্ত ঝরছে সমানে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত তৃণমূল। তবে পাল্টা মার খাচ্ছে তৃণমূলও। সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের এই মহোৎসবে আতঙ্কের কালো ছায়া মাঝেমধ্যেই মাথাচাড়া দিচ্ছে। তবু পঞ্চায়েত ভোটের তুলনায় এ নেহাতই নস্যি, যে প্রহসনপর্বে প্রাণ গিয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষের।

এ রাজ্যে শাসকের সন্ত্রাস এবার বিজেপিরও অন্যতম প্রচারের হাতিয়ার। রাজ্যের নেতা-পাতি নেতাদের কথা বাদই দেওয়া গেল। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ নিয়ে সরাসরি আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রীর দিকে। সুদূর বারানসিতে শুক্রবার নিজের মনোনয়ন পেশ করে তুলে এনেছেন বাংলায় বিজেপির নেতাকর্মীদের ওপর লাগাতার সন্ত্রাসের অভিযোগ। বলেছেন, ‘ক্ষমতায় এসে এত পাল্টে গেছেন মমতা দিদি!’ বাম জমানার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো যে দিদিকে তিনি চিনতেন তিনি যে এত বদলে যাবেন তা তিনি ভাবতে পারেননি। মোদির এই সূক্ষ্ম খোঁচায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ তৃণমূল নেত্রী। এর কড়া প্রতিক্রিয়ায় তৃণমূল বলেছে, এ মন্তব্য করে মোদি বাংলার মানুষকেই অপমান করেছেন।

তবে বাংলার মানুষই যারা ছড়িয়ে আছেন বীরভূম, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, নদীয়ায় তারা চাইছেন কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকুক পাহারায়, দিল্লি দখলের এই লড়াইয়ে তাদের ভোটটাও যেন সুনিশ্চিত হয়। জোড়া ফুল, না পদ্ম ফুল তা জানুক শুধু ইভিএম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত