জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস আজ

৯ বছরে সাড়ে তিন লক্ষাধিক সুফলভোগী

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৯, ০২:৪৪ এএম

সুপ্রিম কোর্ট ও বিচারিক আদালতগুলোতে বাড়ছে মামলা। বিচারপ্রার্থীদের ভিড় বাড়ছে আদালত প্রাঙ্গণে। এ থেকে মুক্তি পেতে খোঁজা হয়েছে নানা পথ। কিন্তু কার্যকর সমাধান মেলেনি। এমন বাস্তবতায় মামলাজট থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছে সরকারি আইনি সহায়তা (লিগ্যাল এইড) সেবা। এরই মধ্যে ৯ বছরে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ এর সুফলভোগী হয়েছেন। কিন্তু প্রচারের অভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে লোকজন এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এ সেবার প্রচার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

২০০৯ সালের ২৮ এপ্রিল সরকারি আইনি সহায়তা প্রদান সংস্থা আনুষ্ঠানিকভবে যাত্রা শুরু করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের যেকোনো নাগরিক তার সরকারি আইনি সহায়তা কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত আইনি তথ্য সেবা গ্রহণ, আইনগত পরামর্শ ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থার মাধ্যমে আইনি সেবা পাবেন। এ ক্ষেত্রে অসহায় ও দুস্থদের শর্ত সাপেক্ষে (যার বার্ষিক আয় দেড় লাখ টাকার বেশি নয়) বিনামূল্যে সব ধরনের আইনি সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য দেশের ৬৪ জেলায় লিগ্যাল এইড কার্যালয় রয়েছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের এ সেবা দেওয়ার জন্য লিগ্যাল এইড কার্যালয় রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকারি আইনগত সেবা পেয়েছেন ৩ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৫ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৩৩ হাজার ৭৩৪ জন, ২০১৭ সালে ৩৫ হাজার ১৭৮ জন ও ২০১৮ সালে ৩৪ হাজার ৭০২ জন আইনি সহায়তা পেয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আইনি পরামর্শ ও সহায়তার জন্য জাতীয় আইনগত সহায়তা পরিচালিত হেল্পলাইনের (১৬৪৩০) মাধ্যমে ২০১৬ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৫ হাজার ১৭৯ জন আইনি পরামর্শ নিয়েছেন। এর মধ্যে নারী ১৩ হাজার ৯৭, পুরুষ ৩১ হাজার ৯৬০, ১২১ জন শিশু ও ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি রয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৪টি জেলায় কমিটির মাধ্যমে ২ লাখ ২৭ হাজার ২৬১ জনকে সরকারি খরচে মামলা দায়ের করতে আইনজীবী নিয়োগসহ প্রাসঙ্গিক সব ব্যয় বহন করেছে।

২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পারিবারিক, দেওয়ানি, ফৌজদারিসহ বিভিন্ন আইনগত বিষয়ে ৪১ হাজার ৮৪৬ নারী ও পুরুষকে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ হাজার ২৪০ নারী ও ১৫ হাজার ৬০৬ পুরুষ রয়েছেন।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার দক্ষিণ ভবানীপুরে পারিবারিক কলহের জেরে শ্বশুর আবুল কাশেমের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন গৃহবধূ মনোয়ারা বেগম। এ ঘটনায় আবুল কাশেম ও তার স্ত্রী ষাটোর্র্ধ্ব সাহেরা খাতুনকে আসামি করে মামলা করে নিহত মনোয়ারা বেগমের বাবা। কিন্তু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছেলে কাওসারের কাছে মনে হয়েছে তার মা নির্দোষ। এ জন্য তার মায়ের জামিনের উদ্যোগ নেন তিনি। বিচারিক আদালতে জামিন না হওয়ায় উচ্চ আদালতে জামিনের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু ভ্যানচালক কাওসারের পক্ষে আদালতে জামিনের খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য ছিল না।

কাওসার জানান, ২০১৫ সালে এক আইনজীবীর পরামর্শে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন তিনি। এরপর  লিগ্যাল এইডের পক্ষ থেকে হাইকার্টে ফৌজদারি আপিল দায়ের করা হয়। শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৯ মে জামিন পান ৬৫ বছরের বৃদ্ধ ও অসুস্থ সাহেরা খাতুন। তার ছেলে কাওসার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বড় ভাইয়ের স্ত্রীর খুনের সঙ্গে আমরা মা জড়িত নন। তিনি নির্দোষ। তাই তার জামিনের চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ম্যালা টেহা পয়সা লাগে। ওনারা (সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল এইড) অনেক সাহায্য করেছে। নইলে আমার মতো ভ্যান ড্রাইভার হাইকোর্টে আসতে পারত না।’

রাজধানীর পোস্তগোলার করিমউল্লাহরবাগ এলাকার বাসিন্দা জোবেদা বেগমের সম্পত্তি জাল দলিল তৈরি করে হাতিয়ে নেয় তারই মেজো ছেলে আবদুল বারেক। স্থানীয়ভাবে সালিশ করে জোবেদা বেগমকে জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হলেও দখল ছাড়েনি বারেক। তার আরেক ছেলে আবদুল কাদের জানান, উপায়ান্তর না দেখে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু মামলার খরচের কথা চিন্তা করে পিছিয়ে যান। পরে এক আইনজীবীর পরামর্শে ঢাকা জেলা জজ আদালতের লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন আবদুল কাদের।

২০১০ সালে ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত সহকারী জজ আদালত ২০১৬ সালের ৩ মে রায় দেয়। রায় তাদের পক্ষে আসে বলে জানান আবদুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতো গরিবদের জন্য সরকার আইনি সাহায্যের ব্যবস্থা করেছে। এ কারণেই আমরা জমি পুনরুদ্ধার করতে পেরেছি।’ তিনি আরও জানান, আদালতের রায়ে জমি বুঝে পাওয়ার পর তার নামে মিথ্যা ও হয়রানির মামলা হয়েছে বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে দুটি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। এতেও লিগ্যাল এইডের ভূমিকা রয়েছে।

লিগ্যাল এইড কর্মকর্তারা জানান, সরকারি আইনি সহায়তা প্রদান সংস্থার শ্রমিক আইন সহায়তা সেল থেকে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ হাজার ৩৪৬ জনকে আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নোটিসের মাধ্যমে ৫৯১টি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতিতে এবং ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ১২ লাখ ২৪ হাজার ২৮৫ টাকা আদায় করা হয়েছে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার পরিচালক (সিনিয়র জেলা জজ) আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গরিব, অসহায় ও দুস্থ বিচারপ্রার্থীদের জন্য এ ব্যবস্থা ইতিবাচক দিক বয়ে আনছে। সারা দেশে আমাদের লিগ্যাল এইড কর্মকর্তারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। এভাবে একদিকে মানুষ আইনি সহায়তা পাচ্ছে, অন্যদিকে মামলাজট ও মামলা করার প্রবণতা রোধে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। যদি এ বিষয়ে প্রচার বাড়ানো হয়, তাহলে অবশ্যই ভবিষ্যতে এর আরও সুফল পাওয়া যাবে।’ আজ রবিবার জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ঘটা করে পালন করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টে ২০১৫ সালে লিগ্যাল এইড সেবা চালু হওয়ার পর থেকে ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৫৩ মামলায় আইনি মতামত ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে ১ হাজার ১০৩টি মামলার মধ্যে ৫৪৮টি মামলা নিষ্পত্তিতে (জেল আপিল, দেওয়ানি আপিল, ফৌজদারি আপিল, দেওয়ানি রিভিশন, রিট আবেদন ইত্যাদি) ভুক্তভোগীদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৬০টি জেল আপিল নিষ্পত্তিতে সহায়তা করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিল্লাল খসরু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি এ সেবা যারা পেতে আসেন তাদের বেশিরভাগ স্বল্পশিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত। তাতে মনে হয়েছে এ বিষয়ে দুস্থ ও অসহায়দের সেবা দিতে সরকারিভাবে আরও ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন, যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশকে এ সেবার আওতায় আনা যায়। এতে করে মামলা করার প্রবণতা কমবে।’ সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড কমিটির সমন্বয়কারী রিপন পৌল স্ক্রু বলেন, ‘দিন দিন এ বিষয়ে মানুষের আস্থা বাড়ছে। এ সেবা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছাতে পারলে উপকারভোগী বাড়বে।’

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৮৩৬টি বিরোধ (প্রিকেইস ও পোস্ট কেইস) নিষ্পত্তির মাধ্যমে ১৩ হাজার ৭৯ জন উপকারভোগীকে বিরোধ নিষ্পত্তিতে সহায়তা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির আইনগত দাবি ও পাওনার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যস্থতা করে ১৩ কোটি ৬৪ লাখ ৭ হাজার ৬৪৮ টাকা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া এই সময়ে আইনি পরামর্শ ও এডিআরের বিধির আওতায় নিষ্পত্তিকৃত মামলা ২৩ হাজার ৬২৭। আর এর মাধ্যমে উপকারভোগী ২৬ হাজার ১৫৮ জন। 

সাবেক আইনমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারিভাবে আইনগত সহায়তা মানুষ পাচ্ছে, এটা ঠিক। কিন্তু এ বিষয়ে আরেকটু প্রচার হলে ভালো হতো; উপকারভোগী আরও বাড়ত।’

আইনমন্ত্রী ও জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার জাতীয় পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি আইনি সহায়তায় উপকারভোগী বাড়াতে আমরা আরও ব্যাপক প্রচারের পদক্ষেপ নিয়েছি। প্রচার বৃদ্ধি করার আগে আমাদের সামর্থ্য বাড়িয়েছি। মামলাজট নিরসনে এটিকে কীভাবে আরও ব্যবহার করা যায় আমরা সেই চেষ্টা করব।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত