বসিলার সন্দেহভাজন আস্তানায় র‌্যাবের অভিযান

দুই ‘জঙ্গি’র ছিন্নভিন্ন লাশ

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৯, ০৩:৩৮ এএম

রাজধানীর বসিলায় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানায় র‌্যাবের অভিযানে গুলি ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। গত রবিবার রাত ৩টা থেকে গতকাল সোমবার বিকেল পৌনে ৪টা পর্যন্ত প্রায় ১৪ ঘণ্টার অভিযান শেষে সন্দেহভাজন দুই জঙ্গির ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ দুটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ঘটনাস্থলে চারটি অবিস্ফোরিত বোমা, দুটি পিস্তল, একাধিক পাগড়ি ও মোবাইল ফোন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব-২-এর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, অভিযানকালে জঙ্গিদের গুলি ও বিস্ফোরণের জবাব দিতে গিয়ে র‌্যাবের পক্ষ থেকে অন্তত ২৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়েছে। নিহত জঙ্গি সুজন (২৫) ও সুমনের (২৫) লাশ দেখে মনে হচ্ছে আত্মঘাতী বিস্ফোরণে তাদের মৃত্যু ঘটেছে। তারা দুজনই পুরনো জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ বা জেএমবির মাঠপর্যায়ের সক্রিয় কর্মী ছিল। র‌্যাব, পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, গোপন সংবাদে বসিলার মেট্রো হাউজিংয়ের ৯ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় ‘বুড়িগঙ্গা নদীর খাল’ সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় বাঁশ ও টিনের তৈরি তিন কক্ষের বাড়িটিতে রবিবার রাত ৩টার দিকে র‌্যাব-২-এর সদস্যরা অভিযান চালান। দরজার কড়া নাড়লে ভেতর থেকে এক নারী সাড়া দেন। তাদের অনুরোধে দরজা খোলার পর ভেতর থেকে জিকির করার শব্দ পান র‌্যাব সদস্যরা। ওই নারীর কাছে জিকিরকারীর পরিচয় জানতে চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় গুলি। এরপর র‌্যাব সদস্যরা সেখান থেকে বের হয়ে দূরে অবস্থান নেন এবং বাড়িটি ঘিরে ফেলেন। এরপরও বাড়ির ভেতর থেকে থেমে থেমে গুলির শব্দ আসছিল।

র‌্যাব-২ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, বাসা থেকে প্রথমে চারজনকে বের করে আনা হয়। তারা হলো বাড়ির কেয়ারটেকার সোহাগ, তার স্ত্রী মৌসুমী ও তাদের দুই সন্তান।

সোহাগদের প্রতিবেশী মিন্টুর স্ত্রী রহিমা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, টিনশেড একতলা বাড়িটির মালিকের নাম ওহাব। বাড়িটির তিনটি কক্ষের একটিতে মসজিদ ছিল। আরেকটিতে কেয়ারটেকার পরিবার নিয়ে থাকত। অন্য কক্ষটি যাদের ভাড়া দিয়েছিল তারা বেশিরভাগ সময় তালা মেরে রাখত। তাদের কখনো দেখেননি তিনি।

বাড়িটির আশপাশের একাধিক বাসিন্দা জানান, ওহাবের বাড়িটি সরকারি খাসজমির ওপর গড়ে উঠেছে। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পর তিনি কৌশলে ওই বাড়ির একটি কক্ষকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। এমনকি পাশের একটি মাদ্রাসার একজন শিক্ষককে ওই মসজিদের ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেন।

অভিযানে থাকা র‌্যাবের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বাড়ির মালিক ওহাব, মসজিদের ইমাম ইউসুফ, কেয়ারটেকার ও তার স্ত্রীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘একটি বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) নিরাপত্তাকর্মী পরিচয় দিয়ে ১৫০০ টাকায় মসজিদের পাশে ছোট্ট একটা কক্ষ ভাড়া নেয় দুই তরুণ। তারা নিজেদের সুমন ও সুজন বলে পরিচয় দিয়েছিল বলে কেয়ারটেকার সোহাগ জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।’

ওহাবের বাড়ির পাশে তানিয়া বেগমের বাড়িতে থাকেন বৃদ্ধা জোবেদা বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাত আড়াইটার পর র‌্যাব সদস্যরা বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। মাইকিং করে আমাদের সবাইকে নিরাপদে সরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। এরপরও আমরা যারা ঘুমিয়েছিলাম, তাদের জোর করে বাইরে সরিয়ে নিয়ে যান তারা। ফজরের আজানের আগ মুহূর্তে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। তারপরই কয়েক দফায় গুলির শব্দ শোনা যায়।

বিস্ফোরণের পর আস্তানায় আগুন : অভিযান চলাকালে গতকাল সকালে সন্দেহভাজন ওই আস্তানায় আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

মিঠু নামে আরেক প্রতিবেশী বলেন, ‘রাতে ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। ৩টার দিকে গোলাগুলি শুরু হয়। বিষয়টি বোঝার জন্য সবাই ছাদে উঠি। পরে র‌্যাবের লোকজন আমাদের ছাদ থেকে নামিয়ে দিলে দরজা-জানালা বন্ধ করে ভেতরেই অবস্থান নিই। এরপর কয়েক দফায় বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ওই বাড়ির একটি কক্ষ মেস হিসেবে ভাড়া দিয়েছিল কেয়ারটেকার সোহাগ। কিন্তু মেসে কেউ থাকত না। সবসময় তালা মারা থাকত।

আস্তানায় যা মিলল : গতকাল বিকেলে ওই আস্তানায় গিয়ে দেখা গেছে, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে টিনশেড বাড়িটির বেশিরভাগ আসবাবপত্র পুড়ে গেছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সন্দেহভাজন জঙ্গিদের খণ্ডিত তিনটি পা ও একাধিক মাথা, পোড়া লেপতোশক, সেলাইমেশিন, ফ্রিজ, প্লাস্টিকের ঝুড়ি, আলুভর্তি হাঁড়িসহ নানা জিনিসপত্র। বাড়ির দেয়ালে ফাটল ও গুলির চিহ্নও দেখা গেছে। এরই মধ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা আলামত সংগ্রহ করছিলেন। বিকেল পৌনে ৪টার দিকে তারা চলে যাওয়ার পর লাশের খণ্ডিত অংশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত