রোজার আগমনের আর কয়েক দিন বাকি অথচ এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের বাজারে দরবৃদ্ধির হিড়িক পড়ে গেছে। প্রতি রোজায় অনিবার্য দরবৃদ্ধিতে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে ছাড়ে। দরবৃদ্ধির এই প্রবণতা আমরা প্রতি রোজার মাসেই প্রত্যক্ষ করি। খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যে রোজার আগাম বার্তা বয়ে আনে, এটি অনেকটা নির্ধারিত। রোজা মানেই দরবৃদ্ধি। রোজা মানেই খাওয়া-খাদ্যের চরম বিলাসিতা। প্রতি রোজায় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলতে হয় খাদ্যপণ্যের মূল্য রোজায় যাতে বৃদ্ধি না করে, সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়। পাশাপাশি সরবরাহের যেন ঘাটতি না ঘটে, সেটিও নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের এবার আহ্বান জানিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেই পুরনো প্রবচনটিতে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী।
এ অনুরোধ যখন ব্যবসায়ীরা অবলীলায় অবজ্ঞা করেন, তখন আর কার-ই-বা কী করার থাকে! তবে এ নিয়ে নানা প্রশ্নের উদ্ভব যে ঘটে না তা কিন্তু নয়। যেমনÑ সরকারপ্রধানের নির্দেশ কেন পালিত হয় না, তার পেছনে কারণ কী? নানা কারণ
থাকতে পারে। প্রধানত, যে কারণটি উল্লেখ করা যেতে পারে সেটা হচ্ছে আমাদের শাসকগোষ্ঠী প্রসঙ্গে। যেমনÑ আমাদের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের শাসনামলে সাংসদ এবং সরকারে অন্তর্ভুক্ত কত শতাংশ রাজনীতিক আর কত শতাংশ ব্যবসায়ী? তিনশ আসনের সংসদে যারা বসেন তাদের সিকি ভাগ রাজনীতিক হলে অবশিষ্ট বৃহৎ অংশই শিল্পপতি-ব্যবসায়ী থেকে নানা পেশার পেশাজীবী। রাজনীতিকদের পরিমাণ যে এক-চতুর্থাংশ, সেটা অনায়াসে বলা যায়। তাহলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পালন কারা করছেন না এবং কেন করছেন না সেটাও অপরিষ্কার থাকে না। যারা করছেন না তারা ওই শাসকশ্রেণিরই অন্তর্গত। অর্থাৎ মুনাফাভোগী ব্যবসায়ী সমাজ। যারা তাদের ব্যবসাকে আরো স্ফীত করার অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে নিজেদের কায়েমি স্বার্থকে নিরঙ্কুশ করতে সমর্থ হয়েছেন। রাজনীতি এখন অর্থনীতির ওপর এতটাই পরনির্ভর যে, সর্বক্ষেত্রে ওই ব্যবসায়ীদের স্বার্থটিই প্রধান হয়ে পড়েছে। অভাগা রাজনীতিকরা সেই চাপে চিড়েচ্যাপটা।
একসময় আমাদের বাজার ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের একক আধিপত্য ছিল না। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ছিল। যেমনÑ টিসিবি, কসকর, রেশন শপ, ন্যায্যমূল্যের দোকান ইত্যাদি। রাষ্ট্রের দর্শন পুরোপুরি পুঁজিবাদী মতাদর্শের কারণে ওইসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটেছে। তাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিদ্যমান। রাজনীতিতে সাংসদ-মন্ত্রীদের তুলনা বিচারেও সংখ্যাধিক্য ওই ব্যবসায়ীরা। যাদের একমাত্র লক্ষ্যই মুনাফা। অতি মুনাফা লাভের অভিপ্রায়েই তারা রাজনীতিতে শামিল হয়ে নিজেদের অর্থ-বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছেন। সেই অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে, নানা পথে।
আমাদের বাজার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কার্যত কোনো ভূমিকা নেই, নেই নিয়ন্ত্রণও। সবটাই ব্যবসায়ীদের দখলে। তারা চাহিদার বিবেচনায় ক্রমাগত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করলেও এর জন্য তাদের কোনো জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় না। আমাদের শাসকশ্রেণির যে বৃত্ত গড়ে উঠেছে, তারাই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জনগণের পকেট কাটছে। বিত্তবান বা উচ্চমধ্যবিত্তদের দরবৃদ্ধির জন্য তেমন অসুবিধা না হলেও সামষ্টিক মানুষের দুর্দশার যেন অন্ত নেই। আমাদের কৃষিপণ্যের উৎপাদক কৃষক কিন্তু তাদের রক্ত-ঘামে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পান না। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া, পাইকার-ব্যবসায়ীরা স্বল্পমূলেই খরিদ করে বিভিন্ন পরিবহনে শহরে চালান করে। কৃষকের জমি থেকে কেনা পণ্য তিন-চার হাত বদলে তিন-চার গুণ বেশি মূল্যে বিক্রি হয় শহরের পাইকারি আড়তে। আড়ত থেকে খুচরা বিক্রেতাদের হাতে পণ্য পৌঁছায় কয়েক হাত ঘুরে। এই হাত ঘুরেই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। প্রকৃত উৎপাদক কৃষক বঞ্চিত হয় ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে, মধ্যস্বত্বভোগীরা হাতিয়ে নেয় সর্বোচ্চ মুনাফা। পণ্য বিপণনের এই ব্যবস্থা যত দিন অটুট থাকবে, তত দিন ঘাম-ঝরানো পণ্য উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য যেমন কৃষক পাবেন না, তেমনি ভোক্তাসাধারণের পক্ষেও ন্যায্য দামে পণ্য ক্রয় সম্ভব হবে না। তাই সর্বাঙ্গে জরুরি এই সিন্ডিকেট ভাঙা। যেটি একমাত্র সরকারের পক্ষেই সম্ভব। কিন্তু সদিচ্ছার অভাবে মুখে বুলিবাগীশ যতই করুক না কেন, বাস্তবে সেটা পরিণত হচ্ছে না এবং হবেও না। কেননা ক্ষমতাসীন দলে ও সরকারে ব্যবসায়ীদের সর্বাধিক আধিক্যের কারণে।
আমাদের বাজার ব্যবস্থা জুড়ে নৈরাজ্য চলছে। রোজার আগমনে সেটা প্রতি রোজায়ই তীব্রতর রূপ ধারণ করে। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার মাশুল দিতে হয় অসহায় সমষ্টিগত সাধারণ মানুষকে। বিত্তবান ও উচ্চমধ্যবিত্তদের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপে খুব একটা যায়-আসে না। তাদের ক্রয়ক্ষমতা অধিক শক্ত-পোক্ত বলেই অল্পমূল্যের পণ্য উচ্চমূল্যে ক্রয়ে বেগ পেতে হয় না। অন্যদিকে মর্জিমাফিক মূল্যে পণ্য বিক্রিও করতে পারছে ব্যবসায়ী নামধারী অসাধু চক্র।
গত ১৯ এপ্রিল দৈনিক প্রথম আলো তাদের নিজস্ব প্রতিনিধির বাজারদর সম্পর্কে শেষ পৃষ্ঠায় রোজার আগেই অস্বাভাবিক খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। রোজার মাসে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে সে দায় ব্যবসায়ীদের ওপর বর্তাবে। সে দায় এড়াতে রোজার আগেই ব্যাপক হারে মূল্যবৃদ্ধি এবার ঘটেছে বলা হলেও বাস্তবতা হচ্ছে প্রতি রোজার আগেই খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে থাকে। বিষয়টি মোটেও নতুন কিছু নয়।
ওই একই সংখ্যায় প্রথম আলোতে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আগামী রোজায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না বলে মনে করেন। পাশাপাশি পণ্যের মজুদ ভালো আছে এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও বাজার তদারকির কথা বলেছেন। তিনি আশা করছেন রোজায় বাজার স্থিতিশীল থাকবে। সচিবালয়ে চাল ব্যবসায়ীদের সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি এসব কথা বলেছেন।
শুরুতেই বলেছি আমাদের শাসকরা বাজার ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপে পুরোপুরি ব্যর্থ। কেবল আশ্বাস আর নানা ছেলে-ভোলানোর বুলি আওড়িয়ে থাকেন। বাস্তবে সেসব বুলি কেবলই কথার কথা আর মিথ্যে সান্ত¡না মাত্র। বাংলায় প্রবচন আছে, ‘সরিষায় ভূত থাকলে সে সরিষা দিয়ে ভূত ছাড়ানো যায় না’, আমাদের দেশের বাস্তবতায় প্রবচনটি যথার্থই খাটে। আমাদের দেশের অথর্নীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে করপোরেট ব্যবসায়ী কাম রাজনীতিকরা, রাজনীতিও ওই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে, তাই সরকারপ্রধান থেকে মন্ত্রীদের আহ্বানে ব্যবসায়ীরা সাড়া না দিয়েও নিরাপদ নিষ্কণ্টন অবস্থানে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
প্রতি রোজাই যেন আসে মূল্যবৃদ্ধির দুর্ভোগ নিয়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না, স্বল্প আয়ের সামষ্টিক মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগে অতিষ্ঠ হবে। নিয়তি বলে মেনেও নেবে। কেননা তাদের রক্ষা যারা করবে তারা তো শ্রেণিস্বার্থের বৃত্তে আটকে রয়েছে। সমষ্টিগতদের স্বার্থরক্ষায় নিজেদের শ্রেণিস্বার্থকে ত্যাগ করতে পারেনি, পারবে না। যারা বলেন, বাঙালিরা ধৈর্যহীন জাতি তাদের উদ্দেশে অনায়াসে বলা যায়Ñ আমাদের দেশের মানুষরা চরম ধৈর্যশীল বলেই পর্বতসমেত অনাচার, শোষণেও মুখে শব্দ করছে না। নিয়তি বলেই সব অবিচার-অনাচার সহ্য করে যাচ্ছে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
