দক্ষিণের উপকূলীয় জনপদ মোংলার মানুষ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ফণি নিয়ে ভীত নয়। স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, মোংলা এখন মাঝারি জলোচ্ছ্বাস প্রতিহত করতে প্রস্তুত। সেই সঙ্গে রয়েছে ঝড় মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি সার্বিক প্রস্তুতি। স্থানীয় মানুষও আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। বিশেষ করে মোংলা পৌরসভার কুমারখালী থেকে কানাইনগর পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার বিস্তৃত পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘শহর রক্ষা বাঁধ’ এই এলাকার মানুষকে সাহস জুগিয়েছে বেশি।
তবে ভয় ছিল গতকাল শুক্রবার রাত নিয়ে। মাঝরাতে যদি ফণি আঘাত হানে, পানির চাপ বাড়ে, ঘুমন্ত মানুষের কী হবেÑ সে ভাবনায় ছিল উপকূলের মানুষ। রাত ৮টার দিকে বৃষ্টি শুরু হয়। মোংলা বন্দর থেকে মুহুমর্হু ঘোষণা আসতে থাকে সতর্ক থাকার। দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া শুরু হয়। যদিও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফণি আঘাত হানেনি।
গতকাল সারাদিনই ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’র তেমন কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি এই উপকূলে। দুপুর ১টা থেকে সোয়া ১টা পর্যন্ত সামান্য কিছু বৃষ্টি ও হালকা ঝড়ো হাওয়া ছাড়া দিনের পুরোটা সময়ই ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া। মোংলাকে ঘিরে মূল যে দুই নদী ‘পশুর’ ও ‘ঘোষিয়াখালী’র পানি ছিল শান্ত। যাত্রী পারাপার ট্রলারগুলো নির্বিঘেœ চলাচল করেছে। এমন পরিবেশে সারাদিনই উপকূলে সতর্ক থাকতে মাইকিং করা হয়েছে।
মোংলা মামারঘাটে কথা হয় লাইফবোট চালক সত্তরোর্ধ্ব সেকেন্দার আলী শেখ ও ফারুক হোসেনের সঙ্গে। তারা জানালেন, এই উপকূলে যেকোনো ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তি হয় ও গতি পায় পশুর নদীর গভীরে চার নদীর মুখে। এই চার নদী হলো পশুর নদী, শিবসাহ নদী, ভোলা নদী ও মরা নদী। মোংলা উপকূল থেকে এই চার নদীর মুখের দূরত্ব ৭০-৭৫ কিমি। সেখান থেকে আরও ১০০ কিমি দূরে গভীর সমুদ্র। সুতরাং সেখান থেকে দক্ষিণ দিকে মংলা উপকূলে আসতে আসতে ঘূর্ণিঝড় অনেক দুর্বল হয়ে যায়। বিশেষ করে সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড়ের গতিকে আরও মন্থর করে দেয়।
‘তবে ভয় কিছুটা রাতে’ বললেন মোংলার ৬নং ওয়ার্ডের আশ্রয়কেন্দ্র ‘টিএ ফারুক স্কুলের’ শিক্ষক আবদুল হান্নান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ফণিতে ভয় পাচ্ছি না। রাতের জন্য কিছুটা ভয় হয়। পশ্চিমা বাতাস হলে ভয় নেই। ভয় পুবালি বাতাসে। এ বাতাসে পানি বেশি হয়। তার ওপর ফণির বাতাসে চাপ দিলে পানি আরও বাড়বে। তাছাড়া রাতে মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। তখনই একটু ভয়।
সেকেন্দার আলী শেখ বললেন, সাইক্লোন সেন্টার আছে। ট্যুরের বোটগুলো তৈরি। চালকও আছে। কিছু হলে উদ্ধার করবে। এই এলাকার তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছেÑ ৮নং ওয়ার্ডের পোর্ট স্কুল, ৬নং ওয়ার্ডের মাদ্রাসা রোড আশ্রয়কেন্দ্র ও টিএ ফারুক স্কুল। এছাড়া গত কয়েক দিন ধরেই সতর্কতামূলক মাইকিং করছে পৌরসভা, ফায়ার ব্রিগেড ও উপজেলা কর্তৃপক্ষ। এখানে রেডিও নেই। মাইকিং করে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলা হচ্ছে।
মোংলার মামার ঘাটের লাইফবোটচালক ইমাদুল বললেন, ’৮৮-এর বন্যায় বেড়িবাঁধ না থাকায় বন্যার পানিতে মোংলা এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। পানির স্রোতও বেশি ছিল। সতর্কতামূলক প্রস্তুতি তেমন ছিল না। ফলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা বেশি হয়েছে। আইলা ঘূর্ণিঝড়ে এখানে খুব একটা ক্ষতি হয়নি। তবে সিডরের জলোচ্ছ্বাসে পানি ঢুকে পড়েছিল উপকূলীয় এলাকায়। বাড়িঘর ভেসে গেছে। এবার সে পরিস্থিতি নেই। বেড়িবাঁধই মূল রক্ষাকবচ এখানকার মানুষের।
‘তবে এলাকাটা জোয়ার-ভাটার দেশ। জলোচ্ছ্বাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে গেলে সে পানি নামতে সময় লাগবে। ক্ষতি বেশি হবে’Ñ বললেন সেকেন্দার। তার মতে, তাদের অভিজ্ঞতা বলছে অতটা ক্ষতি হবে না এবার।
দুর্যোগ মোকাবিলায় মাঠে সবাই : দুর্যোগ মোকাবিলায় মোংলায় ৪৬ সদস্যের সাইক্লোন প্রিপেয়ারনেস কমিটি (সিপিপি) করা হয়েছে। কমিটির উপদেষ্টা স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবিবুন নাহার, চেয়ারম্যান উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তাহের হাওলাদার, কো-চেয়ারম্যান ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম। এছাড়া উপজেলার সব দপ্তর প্রধান ও জনপ্রতিনিধিরা এ কমিটির সদস্য। এর বাইরে দুর্যোগ মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা, কোস্টগার্ড, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টার কমান্ডার মো. দুরুল হুদা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধার জাহাজগুলো প্রস্তুত রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের বড় বড় যুদ্ধ জাহাজগুলো মোংলা বন্দর জেটিতে নিরাপদ অবস্থান করছে। এই চ্যানেলে বিদেশি জাহাজসহ অন্যান্য নৌযান দুর্ঘটনার কবলে পড়লে সেগুলো দ্রুত উদ্ধারের জন্য বন্দরের পাইলট ও নৌযানগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা নাহিদুজ্জামান জানান, জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে প্লাবিত এলাকা থেকে জনসাধারণকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি টিম প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া গত বৃহস্পতিবার থেকে বিভিন্ন বাহিনী ফণি থেকে রক্ষায় সতর্কতামূলক প্রচার চালাচ্ছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা এসেছে। সিপিপির ৯৯০ জন সদস্য গত কয়েক দিন ধরেই মাঠে প্রচারের কাজ করছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে উদ্বুদ্ধ করছে কর্তৃপক্ষ : গতকাল শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে বৃষ্টিপাত ও হালকা-মাঝারি ধরনের ঝড়ো হাওয়া দেখা দেয়। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মোংলার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জয়মনিরঘোল, কোলাবাড়ী, কাটাখালী এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। দুপুর থেকেই জয়মনি এলাকার আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন ও জনসাধারণকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া লোকজনের মাঝে বিকেলে তিনি শুকনো খাবার বিতরণ করেন। সকালেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে তালা ঝুলতে থাকলেও দুপুরের পর থেকে সব আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়। বিকেল ৩টা থেকে শহর ও শহরতলির সব দোকানপাট বন্ধ রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিংয়ে প্রচার চালান ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
জয়মনির লোকজন সাইক্লোন শেল্টারে : অধিক ঝুঁকিপূর্ণ চিলা ইউনিয়নের জয়মনি এলাকার লোকজন দিনে সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিতে না চাইলেও রাতে তাদের অনেকটা জোর করেই আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আসা শেফালী বেগম, শিউলি ও ইস্তিফান হালদার বলেন, দুপুরে ঝড়-বৃষ্টি ছাড়লে ভয়ে বাচ্চাদের নিয়ে এখানে চলে আসি। শেফালী আরও বলেন, বাচ্চার বাবা পাশের বৈদ্যমারী বাজারে ঝড়ের খোঁজ নিতে গেছে। যদি রাতে ঝড় বাড়ে তাহলে এখানে থেকে যাব, কিন্তু বাড়িঘরের কী হবে জানি না। দুপুর থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যারা অবস্থান করছে তাদের জন্য বিকেল পর্যন্ত কোনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়নি। তবে সন্ধ্যার পর থেকে এখানে শুকনো খাবার দিতে দেখা গেছে।
চিলা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আকবর হোসেন বলেন, এ ইউনিয়নের জয়মনিরঘোল, কাটাখালী, কোলাবাড়ী নদীপাড়ের লোকজন জয়মনি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার ও সরকারি খাদ্য গুদামে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য সন্ধ্যায় শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
