পুরো যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শ চিকিৎসক ‘প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশন অব আমেরিকা’র প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ডা. লিয়েনা ওয়েনকে নিয়ে লিখেছেন রানা মিত্র ও আনিকা তাবাসসুম অন্তরা
যুক্তরাষ্ট্রের তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করছে ‘প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশন অব আমেরিকা’। সংস্থাটির সেই দেশে প্রায় ৬শ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আছে। সেগুলোর মাধ্যমে বছরে ২৫ লাখ বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট একজন নারী। তিনিই তাদের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। জন্ম তার চীনে। আট মাস বয়সে তাকে নিয়ে মা-বাবা রাজনৈতিক আশ্রয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। তাদের সম্বল মাত্র ৪০ ডলার। দুই মেয়েকে লালন-পালনের জন্য এই মা-বাবাকে তখন কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। মা হোটেলের কর্মচারী ছিলেন। সারা দিন রুম ঝাড়ু দিতেন, পরিষ্কার করতেন। ভিডিও ক্যাসেট বিক্রির দোকানে কাজ করেছেন। বাবা ছিলেন হকার। লুকিয়ে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিক্রি করতেন। চীন থেকে ঠাণ্ডার দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এসে তাদের বড় মেয়ে লিয়েনা ওয়েনের ছোটবেলায় শ্বাসসকষ্ট রোগ হয়ে গেল। নিঃশ্বাস নিতে না পারায় তিনি কষ্টে কাতরাতেন। অসহায় মা তখন কাঁদতেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের মতো এই অভিবাসী পরিবারের স্বাস্থ্যবীমা ছিল না। হোটেলের সহকর্মীদের কাছে শুনে মেয়েকে বাঁচাতে তিনি প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ফেডারেশনের একটি ক্লিনিকে নিয়ে গেলেন। তারপর থেকে তিনি, তার ছোট বোন ও মা যেকোনো প্রয়োজনে এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়েছেন। তাদের চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর লিয়েনার এতই আস্থা যে, সেন্ট লুইসের মেডিকেল স্কুলে লেখাপড়া করার সময় তিনি একটি প্ল্যানড প্যারেন্টহুড ক্লিনিকে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে রোগীদের সেবা দিয়েছেন।
তার চিকিৎসা পেশায় আসার ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। তখন তার বয়স আট কী নয়। অভিবাসীদের পুরনো, নোংরা অ্যাপার্টমেন্ট বাড়িতে থাকতেন। পাশের অ্যাপার্টমেন্টের এক শিশুর হাঁপানির রোগ ছিল। একদিন শ্বাস নিতে না পারার কষ্টে সে নীল হয়ে যাচ্ছিল। তখন তার মা-বাবা কাজে ছিলেন। বুড়ো দাদি নাতির কষ্টে কাঁদছিলেন। কেউ কি আছে আমার নাতিকে বাঁচাবে বলে চিৎকার করে কাঁদছিলেন। থাকতে না পেরে নিজের ইনহেলার নিয়ে ছুটে গেলেন লিয়েনা। তবে তখন আর সাধারণ শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় ব্যবহার করা ইনহেলারটি কোনো কাজে এলো না। ছেলেটির অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্স ডেকে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করবেন জানালেন লিয়েনা। তবে তার দাদি রাজি হলেন না। অবৈধ অভিবাসী বলে তারা কোনোভাবে সরকারি লোকজনের সামনে পড়ে গেলে মামলা ও জেলখাটার ভয় আছে। লিয়েনা তাকে নানাভাবে বোঝাতে লাগলেন। শিশুটি তাদের সবার চোখের সামনে মারা গেল।
আরেক প্রতিবেশীর কথা এখনো তার মনে পড়ে। মানুষটির কিডনি বিকল হয়ে গিয়েছিল। তবে তিনি চিকিৎসক যে ওষুধগুলো দিতেন, সেগুলো পরিমাণ মতো খেতেন না। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর প্রতিটির অর্ধেকটি খেয়ে বাকিটি আরেক বেলা খাবেন বলে রেখে দিতেন। টাকার অভাবে ডায়ালাইসিসও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অবশেষে তিনি মারা গেছেন। সরকারি, ভালো চিকিৎসার অভাবে ভোগা আশপাশের এই মানুষগুলোর জন্য কিছু একটা করতে চিকিৎসা পেশায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন লিয়েনা।
লেখাপড়ায় তিনি খুব ভালো ছিলেন। কেন লেখাপড়াকে জীবনে এত গুরুত্ব দিয়েছিলেন এই প্রশ্নের জবাবে অসাধারণ মেধাবী এই ছাত্রীটি পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা খুব গরিব ছিলাম। মা-বাবাকে আমি সাহায্য করতে চেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল, চিকিৎসক হব। কখনো কেউ জীবনে কী হতে চাও জানতে চাইলে বলতাম, ডাক্তার হব। তবে অভিবাসী পরিবারের, তিনবেলা ভালোভাবে খেতে না পারা কোনো মানুষের সন্তানের জন্য এটি পাগলের প্রলাপই ছিল। তারা কীভাবে তার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে সেই পথও বলে দিতে পারতেন না।’ তবে মেয়েটি কোনোদিন তার স্বপ্নকে ভোলেননি। কলেজে পড়ার সময় তাদের গবেষণাগারে নিয়মিত ক্লাস করেছেন। তখনই রেমন্ড গার্সিয়া নামের মেক্সিকো থেকে আসা অভিবাসী এক চিকিৎসকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হলো। তিনিই তাকে প্রথম চিকিৎসাবিদ্যায় লেখাপড়ার উপায় বাতলে দিলেন। এরপর লিয়েনা ওয়েন
মাত্র ১৩ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অনার্সের ছাত্রী হিসেবে ভর্তি হলেন। তবে কলেজে তার কোনো বন্ধু নেই। চীন থেকে আসা গরিব অভিবাসীর মেয়েকে কে-ই বা ভালোবাসবে? সবার সঙ্গে তিনি তার প্রয়োজনে আলাপ করতেন। কারও সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলো না। তারা তাকে গোপন ছদ্মবেশ ধরে থাকা মেয়ে হিসেবে দেখত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্র নিয়ে যে প্রবল বিরোধ আছে। এত কষ্টের পরও তিনি লেখাপড়া ছাড়লেন না। আস্তে আস্তে দু:খ দূর হতে লাগলো। ২০০৩ সালে তাদের পরিবার মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করলো। তার আগেই ১৮ বছর বয়সে লিয়েনা ওয়েন অনার্স ডিগ্রি লাভ করলেন। পরে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিন থেকে চিকিৎসা পেশায় লেখাপড়া করে পাস করলেন। বিশ্বখ্যাত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স; বোস্টনের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন্স হসপিটাল করলেন। ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করে নিজেকে তৈরি করেন। তিনি হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ক্লিনিক্যাল বিভাগের ফেলো ছিলেন।
ছাত্র জীবন থেকেই ডা. লিয়েনা ওয়েন মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আন্দোলনে জড়িয়েছেন। আমেরিকান মেডিকেল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তিনি নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তিনি ও তার বন্ধুরা আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তিনি দেশের ৬৫ হাজার চিকিৎসকের প্রজনন চিকিৎসা প্রশিক্ষণের অধিকারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সে প্ল্যানড প্যারেন্টহুডে যোগ দিয়েছেন। মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর শহরের বাল্টিমোর সিটি হেলথ ডিপার্টমেন্টের কমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে পুরনো স্বাস্থ্য বিভাগ, ১৭৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগে তখন ১ হাজার কর্মচারী চাকরি করতেন। তবে তারা স্বাস্থ্যগত বৈষম্যের শিকার ছিলেন। চিকিৎসক ও ভালো পদের কর্মচারীদের মতো চিকিৎসাসেবা তারা পেতেন না। তাদের প্রতি এই অন্যায়ের বিপক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন ডা. লিয়েনা। অরো অনেক বিষয়ে তার ভূমিকা আছে। ওপিওড ওভারডোজ নামে চিকিৎসাশাস্ত্রে ব্যবহার করা ওষুধগুলোতে তখন অনেক মানুষের মৃত্যুর ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন ডা. লিয়েনা ও তার সহকর্মীরা। এই সমস্যার সমাধানে তার মাধ্যমে বাল্টিমোর সিটি হেলথ ডিপার্টমেন্ট শহরের ৬ লাখ ২০ হাজার অধিবাসীর জন্য একটি সাধারণ চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র প্রদান করে। সেটি অনুসরণের জন্য তারা চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন। ফলে তিন বছরে প্রায় তিন হাজার রোগীর জীবন বাঁচে। পুরো শহরের শতকরা ৪০ ভাগ শিশু মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায়। যেসব শিশুর চোখের রোগে চশমা পরতে হয়, তাদের প্রত্যেককে ধনী-গরিব নির্বিশেষে তিনি বিনামূল্যে সরকার ও তাদের স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে চশমা সরবরাহ করার নির্দেশ দেন। তাদের কাছে চশমা পৌঁছে।
২০১৫ সালে এই শহরে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে জনসাধারণের বিক্ষোভ হয়। এরপর তিনি শহরের ওষুধ প্রস্তুতকারকদের নিয়ে ওষুধের মানোন্নয়নের জন্য কাজ করতে শুরু করেন। তাতে ওষুধ কোম্পানিগুলো ভালো মানের ওষুধ সরবরাহ করতে বাধ্য হয়। যেকোনো ধরনের আঘাতজনিত রোগের চিকিৎসায় তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের মান উন্নয়ন করেন। তাতে সড়ক দুর্ঘটনায় আক্রান্ত রোগীরা উন্নততর চিকিৎসায় ভালো হতে থাকেন। তিনি শহরের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মানও বাড়িয়ে তোলেন। ফলে অবসাদ, বিষণ্ণতাসহ নানা রোগে আক্রান্ত মানুষরা ভালো হতে লাগলেন। কেবল চিকিৎসা ও ওষুধের মান বাড়িয়েই থেমে যাননি এই মানবিক চিকিৎসক। নিরাপদে মানুষ যাতে রাস্তায় চলাফেরা করতে পারেন, সে জন্য তাদের কাছ থেকেই তিনি তহবিল জোগাড় করেন। সাধারণ টিকাগুলো প্রদান, শিশু-কিশোরদের মোটা হওয়া ঠেকাতে অতিরিক্ত রিচ ফুড খাওয়া থেকে বিরত রাখতে ও থাকতে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারণা চালান। বর্ণবাদবিরোধী আচরণের পক্ষেও প্রচারণা চালিয়ে সমাজকে সুস্থ কাঠামো প্রদানে কাজ করেছেন ডা. লিয়েনা ওয়েন। তিনি সেখানে স্বাস্থ্যসেবার বিভিন্ন নতুন খাতের জন্মদান করেন। ফলে বাল্টিমোর সিটি হেলথ ডিপার্টমেন্ট পুরো যুক্তরাষ্ট্রের আদর্শ স্বাস্থ্য বিভাগ হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে। বছরের সেরা স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের স্বীকৃতি লাভ করেছে। সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিবর্তনে অনুকরণীয় হয়েছে। পাশাপাশি ডা. লিয়েনা সরকারের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অন্যায় নীতির বিপক্ষে যুদ্ধে নেমেছেন। মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা নীতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে অন্যায় পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন, সেগুলোর বিপক্ষে পরিবার ও নারীদের বাঁচাতে তিনি আন্দোলন করেছেন। হাজার হাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য পেশার কর্মজীবীকে নিয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গ্যাগ রুল’-এর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যান। তখন ডা. লিয়েনা ওয়েন যে বক্তব্য রেখেছেন, সেটি আজও স্মরণীয়। তিনি বলেছিলেন, এই নীতি চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্কের মৌলিক নীতিতে পরিবর্তন আনবে। নতুন নীতির ফলে নারীদের দেওয়া সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান কমে যাবে। শহরের ২৩টি স্বাস্থ্য ক্লিনিকের তহবিল রক্ষার জন্য গড়ে তোলা ‘এক্স প্রোগ্রাম’-এও তিনি পরিবর্তন আনেন। কম আয় করা নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করেন।
২০১৭ সালের মার্চে বাল্টিমোর শহরের স্থানীয় প্রশাসন মার্কিন রাষ্ট্রপতির প্রশাসনের বিপক্ষে মামলা দায়ের করে। এই অসাধারণ ও সাহসী উদ্যোগের নেপথ্যে তিনি ছিলেন। এই মামলার ফলে বাল্টিমোরে গর্ভকালীন নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে যেসব কর্মসূচি আছে সেই তহবিলগুলোতে পাঁচ মিলিয়ন ইউএস ডলার অনুদান প্রদান করতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দান করেন বিচার বিভাগ। ডা. লিয়েনা তার শহরের অধিবাসীদের ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিজে মামলা করে জয়ী হয়েছেন। তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বোস্টন ম্যারাথন বোমা হামলায় আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এখনো জরুরি বিভাগে চিকিৎসক সেবা দেন।
ডা. লিয়েনা ওয়েনকে ২০১৬ সালে স্থানীয় জনস্বাস্থ্যে অনন্য ভূমিকার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সেরা পুরস্কার প্রদান করে। ২০১৭ সালে তিনি বছরের সেরা সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচিত হয়েছেন।
