ঘূর্ণিঝড় ফণি মোকাবিলায় উপকূলীয় এবং সম্ভাব্য আঘাতের ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠন গতকাল শুক্রবার দিনভর তৎপর ছিল। এসব সংগঠন এবং স্থানীয় তরুণেরা দুর্যোগপ্রবণ ও নদীতীরবর্তী এলাকায় ঝুঁকিতে থাকা নারী, পুরুষ ও শিশুদের নিকটবর্তী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসার কাজ করে সারা দিন। আশ্রয় নেওয়া লাখো মানুষের মাঝে শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়। রেড ক্রিসেন্ট-সিপিপি ও স্বেচ্ছাসেবকরা প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করে। ফিশিং ট্রলার ও জেলেদের উপকূলবর্তী নিরাপদ স্থানে থাকাসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ ছিল। ঢাকার বাইরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
খুলনা : সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনার উপকূলীয় এলাকার ৩ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়। তবে ঝড়ের তীব্রতা শুরু না হওয়ায় আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিল। খুলনার জেলা প্রশাসক হেলাল হোসেন বলেন, উপকূলীয় উপজেলা দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছায় সরকারি-বেসরকারি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্বেচ্ছাসেবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে
যাওয়ার জন্য সহযোগিতা করে। সিপিপির দাকোপ উপজেলা কমান্ডার দেবাশীষ ঢালী বলেন, অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে যাচ্ছে না বা এই ঝড় সম্পর্কে বুঝতে পারছে না। তাদের বাড়ি গিয়ে বুঝিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
বরিশাল : মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় কাজ করেন। মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে সহযোগিতা দিচ্ছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বৈঠক করা হচ্ছে। চলছে মাইকে প্রচার। বরিশালের জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান জানান, জনগণকে সতর্ক করতে অব্যাহতভাবে মাইকিং হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় জরুরি বৈঠক করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদিক আবদুল্লাহ নাগরিকদের সচেতন করতে নিজে নেমে পড়েন প্রচারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলার সকল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা সাধারণ মানুষ ও তাদের গবাাদিপশু নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য প্রচার চালাচ্ছেন। সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে বরিশাল নদীবন্দর থেকে সব ধরনের নৌযান চলাচলে দ্বিতীয় দিনেও নিষেধাজ্ঞা ছিল।
পটুয়াখালী : স্বাভাবিক জোয়ারের থেকে তিন-চার ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। জোয়ারের তোড়ে মির্জাগঞ্জ উপজেলার মেহেন্দিয়াবাদ গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে চারটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া রাঙ্গাবালী উপজেলা চালতাবুনিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ ভেঙেও তিন গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সাগর উত্তাল ছিল। কুয়াকাটা-সংলগ্ন খাজুরা পয়েন্টে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাবার আশঙ্কায় গতকাল বালুর বস্তা দিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী জানিয়েছেন, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৪০ হাজার মানুষকে তারা আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে পেরেছেন। সন্ধ্যার পর আরও লোক আশ্রয়কেন্দ্রে আসবে বলে জানান তিনি।
ভোলা : ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চল থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে প্রায় ৪২ হাজার মানুষ। ধুয়েমুছে পরিষ্কার করা হয়েছে জেলার ৬৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র। এ ছাড়া প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার গবাদিপশুকে নিরাপদে রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মীদের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের সহযোগিতার কারণে অল্প সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে আনা সম্ভব হয়েছে বলে জানান ভোলা জেলা প্রশাসক মাসুদ অলিম সিদ্দিকী।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ভোলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলো দুই থেকে তিন ফুট পানিতে প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চর নিজাম, ঢালচর, কুকরি-মুকরি ও কলাতলী চরসহ কয়েকটি চরের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার অধিকাংশ জমির ফসল বিনষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছে এলাকাবাসী।
বাগেরহাট : রেডক্রিসেন্ট ইউনিটের কর্মকর্তা আব্দুর রহিম বলেন, সোসাইটির তিন শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক অম্বরিশ রায় বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশে বাগেরহাটের প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে চারটি উপজেলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী বৃহস্পতিবার থেকে কাজ করছে। ঝড় শুরুর আগেই তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালিয়েছে। বয়স্ক ও শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছে।
পিরোজপুর : ৭ নম্বর বিপদ সংকেত পাওয়ার পর গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পিরোজপুরের নদ-নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের থেকে আড়াই ফুট ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও নি¤œাঞ্চলের মানুষদের সাইক্লোন শেল্টারগুলোতে আশ্রয় নিতে মাইকিং করা হয় এবং অনেক এলাকায় প্রশাসন, রেড ক্রিসেন্ট ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা তাদের নিয়ে আসে শেল্টারে। ঘূর্ণিঝড় ফণির খবর পাওয়ার পরই সাগর থেকে ফিরে আসে অধিকাংশ মাছ ধরার ট্রলার।
