চট্টগ্রাম নগরীতে ১৭ পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বাস করছে ৮৩৫টি পরিবার। ঘূর্ণিঝড় ফণির প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড় ধসের আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন এসব পাহাড় থেকে জরুরি ভিত্তিতে বসতি সরিয়ে নিতে বলা হলেও জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে।
গত ১৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা থেকে জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত ১৭ পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসতি সরাতে বলা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, চট্টগ্রাম ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানই উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
২০০৭ সালে ১১ জুন চট্টগ্রামে পাহাড় ও দেয়াল ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এখনো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি পুরোপুরি সরানো সম্ভব হয়নি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নগরের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের মধ্যে ৭টি সরকারি ও ১০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন। এর মধ্যে সরকারি ৩০৪ ও ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ে বাস করছে ৫৩১ পরিবার। সরকারি পাহাড়ের মালিকানায় রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে এসব পাহাড়ের পাদদেশে অন্যদের সঙ্গে খোদ সরকারি কর্মচারীরা বসবাস করছেন।
কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ পাহাড়ে অবৈধভাবে যারা বসবাস করছে, তাদের সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। সরকারি সংস্থার যেসব পাহাড়ে বসতি রয়েছে, তাদের নিজ উদ্যোগে সরিয়ে নিতে চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও ওয়াসার যেসব অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে এসব পাহাড়ে অবৈধ বসবাসরতদের সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম নগরীর রেলওয়ের মালিকানাধীন লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, পূর্ব ফিরোজশাহ ১নং ঝিল সংলগ্ন পাহাড়, মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল সংলগ্ন পাহাড়ে প্রায় ২০০ পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। এসব বসতি সরাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসনের তালিকানুযায়ী, নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ১৭টি পাহাড়ের মধ্যে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন কৈবল্যধামস্থ বিশ্ব কলোনি পাহাড়ে বাস করছে ২৮ পরিবার। এই পাহাড়ে খোদ মালিকানাধীন সংস্থার কর্মচারীরা বসবাস করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও কনকর্ডের মালিকানাধীন লেকসিটি আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ২২ পরিবার রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। পূর্ব ফিরোজ শাহ ১নং ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে রয়েছে ২৮ পরিবার, সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন সিটি করপোরেশন পাহাড়ে ১০ ও রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার মালিকানাধীন মতিঝর্ণা ও বাটালি হিল সংলগ্ন পাহাড়ে রয়েছে ১৬২ পরিবার।
ব্যক্তিমালিকানাধীন এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি পাহাড়ে ২৬ পরিবার, ডবলমুরিং থানার বায়তুল আমান সোসাইটি এলাকার হারুন খানের পাহাড়ে ৩৩ পরিবার, আকবরশাহ আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ২৮ পরিবার, খাস খতিয়ানভুক্ত পলিটেকনিক কলেজ সংলগ্ন পাহাড়ে ৪৩ পরিবার, মধুশাহ পাহাড়ে ৩৪ পরিবার, ফয়’স লেক আবাসিক এলাকা সংলগ্ন পাহাড়ে ৯ পরিবার, ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট সংলগ্ন পাহাড়ে ৩৩৪ পরিবার, ভিপি সম্পত্তি লালখান বাজার জামেয়াতুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন পাহাড়ে ১১ পরিবার, এম আর সিদ্দিকীর পাহাড়ে ৮ পরিবার, মিয়ার পাহাড়ে ৩২ পরিবার, ভেড়া ফকিরের পাহাড়ে ১১ পরিবার, আামিন কলোনি সংলগ্ন ট্যাংকির পাহাড়ে ১৬ পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পদ কর্মকর্তা (উপসচিব) ইশরাত রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব পাহাড় থেকে বসবাসরতদের উচ্ছেদ করতে মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এরপরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। ঘূর্ণিঝড় ফণিকে সামনে রেখে এসব পাহাড় থেকে সরে যেতে নির্দেশনামূলক মাইকিং করা হচ্ছে।’
এ বিষয়ে সংস্থাটির চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা এই পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাস করছে, প্রশাসনের নির্দেশনায় তাদের একটা তালিকা করেছি। তাদের সরে যেতে মাইকিং করা হয়েছে। ৭ মের মধ্যে সবাইকে উচ্ছেদ করা হবে।’
ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন বলেন, ‘সেখানে যেসব বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে, তা বৈধভাবে দেওয়া হয়েছে। আর যেসব অবৈধ সংযোগ রয়েছে সেগুলো বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। তবে বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে পিডিবির কর্মকর্তারা নানান চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন।
