দুনিয়া কাঁপানো জলবায়ুকন্যা গ্রেটা

আপডেট : ০৫ মে ২০১৯, ১০:১৫ পিএম

আমাদের দেশে ষোড়শী মেয়েদের এক-তৃতীয়াংশ যখন বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে সংসারের ঘানি টানতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যখন প্রায় ৯০ ভাগই যৌন লালসার শিকার হওয়ার ভয়ে কুণ্ঠিত হয়ে থাকেন, তখন সুইডেনের এক ষোড়শী বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছেন। এই মেয়েটির আলোচনায় উঠে আসার গল্পটি খুবই ব্যতিক্রমী। স্কুল পালানোর ঘটনার মধ্য দিয়ে। কেবল স্কুল পালিয়ে, থুড়ি, স্কুল স্ট্রাইক করে, মানে একেবারে বলে-কয়ে স্কুলে না গিয়ে, পনেরো-ষোলো বছরের মেয়েটি চলে এসেছে পৃথিবীর বড় বড় গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে। মেয়েটি হয়ে উঠেছে বিশ্ব-জনতার নয়নের মণি। এমনটাও হয় বুঝি! স্কুল পালানোর মানসিকতা বা প্রচেষ্টা তো নতুন কিছু নয়। তবু, পার্থক্য কিছু আছে বৈকি। মার্ক টোয়েন রচিত কিশোর উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র টম সয়্যার পেটে ব্যথা বলে স্কুল পালিয়ে বাড়িতে শুয়ে থাকত। আর এই মেয়েটি কিন্তু সটান গিয়ে হাজির সুইডেনের সংসদের সামনে।

 

একটু খোলাসা করে বলা যাক। গ্রেটা থানবার্গ সুইডেনের মেয়ে। বড় হয়েছে স্টকহোমে। সম্প্রতি পরিবেশের উষ্ণায়ন রুখতে তার কর্মকাণ্ডে কিন্তু নড়েচড়ে বসছেন অনেকেই। ২০১৮ সালের আগস্টে প্রথম নজরে আসে ক্লাস নাইনের ছাত্রীটি। সে বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপ জুড়েই চলেছে তাপপ্রবাহ আর এর ফলে নজিরবিহীন গরম, সুইডেন ও ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় বনে-জঙ্গলে লেগেছে দাবানল। ২০ আগস্ট, গ্রেটা স্কুল চলাকালেই গিয়ে বসে পড়ল ‘রিকস্ড্যাগ’ বা সুইডেনের সংসদের সামনে। হাতে একটা প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ‘জলবায়ুর জন্য স্কুল স্ট্রাইক’। উদ্দেশ্য, জলবায়ু রক্ষায় প্যারিস পরিবেশ চুক্তি অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এমনি করে চলল সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ, অর্থাৎ সুইডেনের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত। জলবায়ুর সমস্যাকে ‘সংকট’ হিসেবে দেখার দাবিতে গ্রেটার একক প্রতিবাদ কর্মসূচি, স্কুলে না গিয়ে। নির্বাচনের পরও গ্রেটা তার স্ট্রাইকটা চালিয়ে গেল, তবে সপ্তাহে এক দিন করে, শুক্রবার।

 

গ্রেটা খুব সম্ভবত তার স্ট্রাইকের অনুপ্রেরণাটা পেয়েছে আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন মুলুকের ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ড স্কুলের ছাত্রদের কাছ থেকে। বন্দুকবাজরা গণহত্যা চালায় ওই স্কুলে। স্কুলটির বেঁচে যাওয়া ছাত্ররা তাই ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে প্রতিবাদে, মার্কিন দেশের ঢিলেঢালা বন্দুক আইন পাল্টানোর দাবিতে।

গ্রেটার ভাবনার মতোই এ গ্রহের ক্ষেত্রে ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ হয় কি না, সেটা বলা এখনই সম্ভব নয়। তবে পৃথিবীজুড়েই যে একটা আলোড়ন উঠেছে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পরিবেশের জন্য স্কুল স্ট্রাইকের এই আন্দোলনের তরঙ্গটা ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীজুড়ে। বিশ্বের কয়েক শ শহরের হাজারে হাজারে স্কুল ছাত্রছাত্রী শামিল হলো এতে। শুধু বার্লিন শহরেই ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রী শামিল হয়েছে এই ‘স্কুল স্ট্রাইকে’। পুরো জার্মানিতে সংখ্যাটা ৪০ হাজারের বেশি। বিশ্বজোড়া স্কুল স্ট্রাইকের এই ধারা এখনো চলছে।

ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের বাইরে ‘রাইজ ফর ক্লাইমেট’ আন্দোলনে শরিক হয়েছে গ্রেটা। আর এরই মধ্যে বড় বড় মঞ্চে বেশ কিছু বক্তৃতা দিয়ে ফেলেছে ছোট্ট গ্রেটা। অক্টোবরে লন্ডনে, নভেম্বরে স্টকহোমে টেডএক্স কনফারেন্সে, ডিসেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈঠকে এবং প্লেনারি অ্যাসেম্বলিতে, জানুয়ারিতে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মিটিংয়ে, ফেব্রুয়ারিতে ইউরোপিয়ান ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিটির কনফারেন্সে।

তবে মেয়েটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বিশ্ববিখ্যাত সব ক্ষমতাবান নেতার মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার মতো এক বক্তৃতার মাধ্যমে। গ্রেটার খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছানোর বড় অবদান রাখা সেই বক্তৃতার ভিডিওটির আবির্ভাব ঘটে এ বছরের জানুয়ারিতে। বার্ষিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে উপস্থিত শীর্ষনেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলেছে, ‘কিছু মানুষ বলেন, আমরা সবাই মিলে নাকি জলবায়ু সংকট তৈরি করেছি। কিন্তু সেটি সত্যি নয়। যদি কোনো একজন অপরাধী হয়, তার জন্য সবাইকে দায়ী করা উচিত নয়। যারা অপরাধী, তাদেরই দায়ী করতে হবে। আর জলবায়ু সংকটের পেছনে দায়ী হলো কিছু মানুষ, কিছু প্রতিষ্ঠান এবং কিছু নীতিনির্ধারক, যারা খুব ভালো করেই জানেন অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে তারা পৃথিবীর কী ভীষণ ক্ষতি করে চলেছেন এবং আমার বিশ্বাস, সেই মানুষদের মধ্যে অনেকেই আজ এখানে উপস্থিত আছেন।’

সেদিন সবার সামনে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীন চিত্তে বলা কথাগুলোর কল্যাণে গ্রেটা আজ শুধু বিশ্বব্যাপী পরিচিত নামই নয়, পাশাপাশি সে পেয়ে গেছে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির মনোনয়নও। নরওয়ের তিনজন সংসদ সদস্য নোবেল কর্র্তৃপক্ষের কাছে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য গ্রেটার নাম প্রস্তাব করেছেন।

বিশ্বনেতাদের কাছে তার আবেদন ছিল, ‘আমাদের ঘরে আগুন লেগেছে। আপনারাও এটা নিয়ে ভাবুন, সাংঘাতিক ভয় পান, যে ভয়টা আমি পেয়ে চলেছি প্রতিনিয়ত।’ সুকান্তর নাট্যকাব্য ‘অভিযান’-এর নায়িকা সংকলিতার মতো গ্রেটাও বলছে, ‘আমরা যে বড়ই বিপন্ন।’

আসলে আট বছর বয়স থেকেই বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে মাথাব্যথা গ্রেটার। তার কাছে এটা একটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে চলার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ছোটবেলায় আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই শিক্ষামূলক ছবি দেখেছে গ্রেটা যেমন উত্তর সমুদ্রের বরফ গলছে, বিপন্ন মেরু ভাল্লুকের দল, কিংবা প্লাস্টিকের দূষণে সমুদ্রের স্তন্যপায়ীদের বিপন্নতা। কিন্তু গ্রেটার মাথায় তা যেন গেঁথে গেছে একেবারে, অন্য বাচ্চাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে। গ্রিক উপকথায় রয়েছে ক্যাসান্দ্রার গল্প। ট্রয়ের রাজা প্রিয়ামের মেয়ে। ভবিষ্যদ্বাণী করায় তুখোড় ছিল সে। ট্রয়ের ধ্বংসের পূর্বাভাষ করেছিল ক্যাসান্দ্রা। গ্রেটা থানবার্গ যেন আধুনিক যুগের জলবায়ুর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ক্যাসান্দ্রার ভূমিকা পালন করতে এসেছে। যে এই প্রলয়-সন্ধ্যায় দুনিয়ার রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্নদের মনে করিয়ে দিচ্ছে দিনের অন্তিমকালের কথা।

অ্যাসপারজার সিন্ড্রোম, অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার, সিলেক্টিভ মিউটিজমের মতো অসুখে আক্রান্ত ষোলো বছর বয়সী একটি মেয়ের এই বিশ্বজয়ের রহস্য কিন্তু সহজ নয়।

গ্রেটার প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, উগান্ডা, থাইল্যান্ড, কলম্বিয়া ও পোল্যান্ড। দাবিটা সহজ। এ বিশ্বকে নবজাতকের বাসযোগ্য করতেই হবে। দরকার হলে আইন বদলে। নিশ্চিন্ত থাকলে চলবে না। ‘ভয়’ পেতেই হবে। মর্ত্যলোকে মহাকালের নতুন খাতার পাতাজুড়ে একটা শূন্য নামার ‘ভয়’। সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করাটাই উদ্দেশ্য। প্রয়োজনে পরিবেশ এবং জলবায়ুর জন্য করতে হবে আরও কঠিন আইন। মার্চের ১৫ তারিখ ১১২টি দেশের হাজার হাজার স্কুলছাত্র একসঙ্গে স্ট্রাইক করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে পরিবেশের জন্য বৃহত্তম প্রতিবাদ। আর এসবের পেছনে ১৬ বছরের এক সুইডিশ মেয়ে, গ্রেটা।

গ্রেটার আন্দোলনের কিছু ফল দেখা যাচ্ছে এখনই। ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জাঁ-ক্লদে জানকার এরই মধ্যে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এক লাখ কোটি ইউরো খরচের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ২০২১-২৭ সময়সীমার মধ্যে। সুইডিশ সংসদের বাইরে গ্রেটার ফি শুক্রবারের স্ট্রাইক কিন্তু চলছেই। দেশে দেশে এই স্ট্রাইকে অবশ্যই খানিকটা ভিন্ন ভিন্ন দাবি-দাওয়া যোগ হয়েছে। কিছু প্রতিবাদী যেমন এরই মধ্যে দাবি তুলেছে ভোট দেওয়ার বয়সসীমা কমানোর, যাতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি করে সক্রিয় হতে পারে ছাত্ররা, খানিক কম বয়স থেকেই।

অ্যাসপারজার-আক্রান্ত, অর্থাৎ সামাজিক সংযোগ স্থাপনেই যার সমস্যাÑ তেমন একটা লাজুক, অবসাদে ভোগা মেয়ে পুরো পৃথিবীর সঙ্গেই সংযোগ স্থাপন করে ফেলেছে কোনো এক জাদুমন্ত্রে! অরাজনৈতিক স্ট্রাইক করাটা খুব সহজ নিশ্চয়ই নয়। আর একা একা স্ট্রাইক শুরু করাটা তো ভয়ানক কঠিন আর অবাস্তব বলেই মনে হয়। তবু, একটা ষোলো বছরের অবসাদে ভোগা মেয়েও তেমনটা করে দেখাতে পারে বৈকি! আর ক্রমে তার সঙ্গী হয় হাজার হাজার ছাত্র। পৃথিবীজুড়ে।

নোবেলটা পেয়ে গেলে গ্রেটাই হবে বিশ্বের সবচেয়ে কমবয়সী শান্তির নোবেল বিজেতা। মালালার রেকর্ড ভেঙে। সেটা হোক আর নাই হোক, গ্রেটার স্কুল স্ট্রাইক কিন্তু লজ্জায় ফেলে দিয়েছে পৃথিবীকে। নির্লিপ্ত জনতাকে, রাজনীতিকদের। আমাদেরও। দেশে দেশে। আমরা যারা জড়তার শীতঘুমে থেকে সৌরমণ্ডলের তৃতীয় গ্রহটার পরিবেশ, আবহাওয়া আর জলবায়ুকে এক আসন্ন সর্বনাশের সামনে এনে ফেলেছি। আর তাই আশ্চর্য এই ষোড়শীই আজ দিশারি হয়েছে উদ্ভ্রান্ত বিশ্বাসীকে জাগাতে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, ভেজাল খাবার, যানজট, যৌন হয়রানি, সড়ক দুর্ঘটনায় জেরবার আমরাও চাই বিশ্ব জলবায়ু ও প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনের পাশাপাশি এসব সমস্যা সমাধানের আন্দোলন। বাংলাদেশের জনতা আর নীতিনির্ধারকরা কি গ্রেটা থানবার্গের কথা শুনতে পাচ্ছি?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত