মাল নিয়ে গেল পাকিস্তান মাশুল গুনছে বাংলাদেশ

আপডেট : ০৬ মে ২০১৯, ০২:১৫ এএম

১৯৭১ সালে যুদ্ধ শুরুর আগের কথা। তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের জন্য জাপান থেকে ২০০ ট্রাক আমদানি করতে ঋণপত্র খোলে পূর্ব পাকিস্তান সড়ক পরিবহন করপোরেশন (ইপিআরটিসি)। ট্রাকের দাম বাবদ সেই আমলে ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ করে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাংকগুলো। জাপান থেকে ট্রাকগুলো নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশে রওনাও হয় জাহাজ। এরই মধ্যে স্বাধীনতার ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তখন ট্রাকগুলো নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অভিমুখে আসতে থাকা জাহাজ ঘুরিয়ে করাচি বন্দরে পৌঁছানোর নির্দেশ দেয় পাকিস্তান সরকার। নির্দেশমতো সেই ট্রাকগুলো খালাস হয় করাচি বন্দরে, যা পরে আর বাংলাদেশে আসেনি।

এদিকে ৪৮ বছর আগের ওই ট্রাক আমদানির ঋণপত্র বা এলসি বাবদ পরিশোধ করা ৬০ লাখ টাকার হিসাব এখনো গুনছে বাংলাদেশের পাঁচ ব্যাংক। ট্রাক না পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর টাকা পরিশোধ করেনি স্বাধীনতার পর ইপিআরটিসির দায়-দেনা নিয়ে গঠিত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। টাকা চেয়ে বিআরটিসির বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংক ‘মানিস্যুট মামলা’ করেছে ৩৫ বছর আগে, যা এখনো চলছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ২০১০ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেও সুরাহা করা সম্ভব হয়নি। গত মাসে বাংলাদেশ

ব্যাংক সব পক্ষকে ডেকে বৈঠক করেও সমাধান বাতলাতে পারেনি। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে ২০০ ট্রাক আমদানির উদ্যোগ নেয় ইপিআরটিসি। সেজন্য কনসোর্টিয়াম ঋণের আওতায় ঋণপত্র খোলে তখনকার ইউনাইটেড ব্যাংক, যা স্বাধীনতার পর থেকে জনতা ব্যাংক নামে পরিচালিত হচ্ছে। ২০০ ট্রাকের দাম ৬০ লাখ টাকার জোগান দেয় সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও পূবালী ব্যাংক। ট্রাকগুলো জাপান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে ট্রাকগুলো করাচি বন্দরে নিয়ে খালাস করা হয়।

এ প্রসঙ্গে বিআরটিসির চেয়ারম্যান ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশ সৃষ্টিরও আগের। ট্রাক হাতে না পাওয়ায় বিআরটিসি পাওনা পরিশোধ করেনি। তবে ব্যাংকগুলো দাবি ছাড়েনি। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টিতে সম্পৃক্ত হওয়ায় নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সভা করেছে। আরও বৈঠক হবে, তখন নিশ্চয়ই নিষ্পত্তি হবে।

স্বাধীনতার পর ইপিআরটিসির সব দায়-দেনা বিআরটিসিতে হস্তান্তর করা হয়। তবে জাপান থেকে ২০০ ট্রাক বিআরটিসি না পাওয়ায় তার আমদানি দায় পরিশোধ করতে অনাগ্রহ দেখায় করপোরেশনটি। ৬০ লাখ টাকা পরিশোধকারী ব্যাংকগুলোও আগের ব্যাংকের দায়-দেনা নিয়ে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও পূবালী ব্যাংক নামে যাত্রা শুরু করে। তখন থেকেই ৬০ লাখ টাকার হিসাব বয়ে বেড়াচ্ছে বিআরটিসি ও ব্যাংকগুলো। স্বাধীনতার পর অন্য ব্যাংকগুলো বিআরটিসির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের দায়িত্ব দেয় সোনালী ব্যাংককে। তখন থেকে বিভিন্ন সময় সোনালী ব্যাংক অসংখ্যবার চিঠি দিয়ে তাগাদা দিলেও টাকা দেয়নি বিআরটিসি। এ অবস্থার মধ্যে ১৯৮৩ সালে বেসরকারিকরণের পর পাওনা টাকা চেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংককে চাপ দেয় পূবালী ব্যাংক। বিআরটিসির সঙ্গে আলোচনা করে কোনো সমাধান না পেয়ে ১৯৮৪ সালে বিআরটিসির বিরুদ্ধে মানিস্যুট মামলা (নং-২৩৩/৮৪) করে সোনালী ব্যাংক, যা এখনো চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে ২০১০ সালের অক্টোবরে সব পক্ষকে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখানে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে সুদসহ ঋণ অবলোপন করার পরামর্শ দেওয়ার পর পূবালী ব্যাংক ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বাকি চার ব্যাংক ঋণ অবলোপন করেছে। তবে বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়নি। কারণ অবলোপন করা হলেও পাওনা নিষ্পত্তি হয় না। ফলে ব্যাংকগুলো এখনো পাওনা আদায়ে বিআরটিসিকে তাগাদা দিচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক বিআরটিসি ও ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে নিয়ে বৈঠক করেছে। তাতেও নিষ্পত্তির বিষয়ে একমত হতে পারেনি দুই পক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, পরিস্থিতি অনেক জটিল। এক্ষেত্রে সরকার, ব্যাংক বা বিআরটিসিÑ কারও কিছু করার নেই। ঋণপত্র খোলা হয়েছে দেশ স্বাধীনের আগে। ট্রাকও দেশে আসেনি। পুরো বিষয়টি শুধুই কাগুজে, অনেকটা ‘কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নাই’-এর মতো। ট্রাক না আসায় বিআরটিসিকে টাকা দিতে বলা যৌক্তিক নয়। আবার ব্যাংকগুলোকেও মাফ করে দিতে বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো নিজ নিজ পর্ষদ সভায় বিষয়টি উত্থাপন করে অনুমোদনসাপেক্ষে নিষ্পত্তি করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত