১.
পূর্ব পাকিস্তানে তখন চলছে আইয়ুব খানের তথাকথিত উন্নয়নের দশক। দেশভাগের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত চিলমারী নদীবন্দর। ব্যবসা নেই, জাহাজ চলাচল কমে এসেছে, এপারের দাপুটে মাড়োয়ারিরা ওপারে যাচ্ছে, আসাম থেকে আসছে ছিন্নমূল বাঙ্গালরা। প্রাচীন আমল থেকে মুঘল আমল পেরিয়েও যে অবস্থা বিরাজ করছিল, ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে যাওয়ার বেলায় দাগ কেটে দেশভাগ করে সেই প্রাকৃতিক ভূগোলের ওপর নতুন সীমানার ‘রাজনৈতিক ভূগোল’ বসিয়ে গেল। ফলে চিলমারী বন্দর হয়ে পড়ল পশ্চাৎভূমিহীন। এদিকে ব্রিটিশদের তত্ত্বাবধানে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ধারায় ইতিহাসবিচ্ছিন্ন যে ‘বাবু সমাজ’ গড়ে উঠেছিল, ১৯৩৫ সালের ‘ভারত শাসন আইন’-এর মধ্য দিয়ে কৃষক-প্রজা পার্টির ক্ষমতা দৃশ্যমান হওয়ার পর, তারা আর চাড়াল-চণ্ডাল-মুসলমানদের মধ্যে কর্র্তৃত্বহীন হয়ে বাস করতে চাইলেন না। তারা চলে যেতে লাগলেন। এই শূন্যতা যারা ভরাট করলেন তারা চাড়াল-চণ্ডাল ও মুসলমানদেরই সন্তান। তাদেরই সন্তান মিঞা মোহাম্মদ, জয়নাল আবেদীন লাল, সাদাকাত হোসেন ছক্কু মিয়া, শামসুল হক বিএসসি, শামসুল হক মণ্ডল, বারী মণ্ডল, যোগেন্দ্রনাথ বর্মণরা।
চিলমারী বহু প্রাচীন বন্দর হলেও ব্রিটিশরা, ব্যবসায়ী-জমিদাররা এখানে একটি হাই স্কুল নির্মাণেরও তাগিদ অনুভব করেননি স্বাভাবিকভাবেই। কোচবিহার করদ রাজ্য বা দেশীয় রাজের অধীনে থাকায় সামান্য যা শিক্ষাদীক্ষা হয়েছিল, এ অঞ্চলের মানুষদের তা-ই ছিল সম্বল। ১৯৩৫ সালের পর কৃষক-প্রজা পার্টি এবং ফজলুল হক, যোগেন মণ্ডল ও এই অঞ্চলের গিয়াস বক্তরা ক্ষমতায় আসার পর মুসলমান ও তফসিলি সম্প্রদায় শাসন ক্ষমতার যে কিঞ্চিৎ ভাগ পায়, তার বদৌলতে এখানে দুটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি চিলমারী হাই স্কুল অপরটি মুদাফৎ থানা শিডিউল্ড কাস্ট জুনিয়র হাই স্কুল (অদ্যাবধি শিডিউল্ড কাস্ট হাই স্কুলটি অবহেলার শিকার)। এই চিলমারী হাই স্কুলের ৪র্থ প্রধান শিক্ষক হিসেবে ১৯৬৩ সালে মানে আইয়ুবের শাসনের গোড়ার দিকে যোগদান করেন জয়নুল আবেদীন। তার সহকর্মী ছিলেন তৎকালীন চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শামসুল হক বিএসসি, ৭০ ও ৭৩ এর সাংসদ সাদাকাত হোসেন ছক্কু মিয়া, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জয়নাল আবেদীন লাল। তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের কোম্পানি কমাণ্ডার প্রকৌশলী আবুল কাশেম চাঁদ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ও দুর্ধর্ষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান সরকার, সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ্দৌলা তাজ, মেজর (অব.) আখতার, জনপ্রিয় ও অকাল প্রয়াত ভাওয়াইয়া শিল্পী সফিউল আলম রাজা প্রমুখ।
ফলে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ১১ মার্চ জয়নুল আবেদীন স্যারের নেতৃত্বে চিলমারীর ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে যে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবেন, এ আর আশ্চর্যের কী! তার স্কুলের বাইনোকুলার যে মুক্তিযোদ্ধা ছাত্ররা যুদ্ধে কাজে লাগাবেন, সেও স্বাভাবিক। তার ছাত্র নজরুল কমাণ্ডার, আলো, নুরুল আলম, আবিজার, নুরুজ্জামান, রহিমরা দলে দলে মুক্তিযুদ্ধে যাবেন, সেও স্বাভাবিক। তারাই কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে চিলমারী মুক্ত করবেন, এটাই যেন হওয়ার কথা ছিল, আর হয়েছিলও তাই। জয়নুল আবেদীন স্যার নিজে ন্যাপ নেতা ছিলেন। মওলানা ভাসানী ভারতে গিয়ে বন্দি হয়েছেন শুনে তিনি ও তার সঙ্গীরা আর ভারতে থাকা নিরাপদ মনে না করায় দেশে ফিরে আসেন। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানের কারণে চিলমারী বন্দর পাকিস্তান আর্মির দখলে চলে যায়। ফলে স্বাধীনভাবে বাহিনী বানিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ায় তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।
২.
ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ার পর পিতার মৃত্যু ও সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আজকের আমেরিকা প্রবাসী লেখক আবু রায়হানের। সে সময় এই খবর পৌঁছে গিয়েছিল হেড স্যার জয়নুল আবেদীনের কাছে। কোনো কথা নেই, সোজা বাড়িতে গিয়ে আবু রায়হানকে ধরে এনে নিজ বাড়িতে রেখে শিক্ষার যাবতীয় ব্যয়ভার বহনের ঘোষণা দিয়ে চিলমারী হাই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন তিনি। একই ঘটনা ঘটেছিল এখন গাজীপুরে কর্মরত বিজ্ঞানী জাহিদ হাসানের বেলায়ও। তার বাড়িতে এরকম ২/৩ জন গরিব-মেধাবী শিক্ষার্থী তার সন্তানদের সঙ্গে একই বিছানায় বড় হয়েছেন প্রতি বছর। আর স্যারের বাড়ির আম, লিচুর প্রতি ছিল আমাদের অবারিত অধিকার।
চিলমারী অঞ্চলে সকল সমাবেশে স্যারের বক্তৃতা ছিল অনিবার্য। জয়নুল আবেদীন স্যারের বক্তৃতা ছাড়া আলোচনাসভা মর্যাদাপূর্ণ হতো না। যারা ছাত্র ছিলাম তারা জানতাম স্যারের বক্তৃতা এখনো হয়নি, মানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরি আছে। অনেকেই স্যারের বক্তৃতা মুগ্ধ হয়ে চুপ করে বসে শুনত, বাকিরা যেন ভয়ে চুপ হয়ে থাকতেন। আজকের দিনে শিক্ষকরা যখন ক্লাসে পাঠদানের বদলে কোচিং ব্যবসাকে বড় করে তোলেন, স্কুলে পরিমল আর মাদ্রাসায় সিরাজুদ্দৌলাদের দেখি, শিক্ষকতা যখন ব্রত হওয়ার বদলে আট-দশটি পেশার মতোই, রাজনীতি যখন ডাকাত আর লম্পটদের দখলে; তখন হেড স্যার জয়নুল আবেদীন, বিএসসি স্যার, ছক্কু মিয়া স্যারদের মতো মানুষদের ‘বোকা’ ছাড়া আর কি-ই বা ভাববেন! এত দায়িত্ব পালন করে এত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা বাজার করার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতেন। অথচ সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই বিজ্ঞানাগার ও সমৃদ্ধ পাঠাগার গড়ে তুলেছিলেন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ সকল আন্দোলন-সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন চিলমারী হাই স্কুলকে।
১৯ এপ্রিল, ২০১৯ মৃত্যুকে বরণ করে নেন উত্তরবঙ্গের আদর্শবাদী-লড়াকু প্রজন্মের সেনানায়ক জয়নুল আবেদীন স্যার। তার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি যেন এই সত্যকেই তুলে ধরেছে যে তার এই মৃত্যু কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে ইতি ঘটল চিলমারীর একটা প্রজন্মের ইতিহাসেরও।
লেখক : কুড়িগ্রামের রেল-নৌ, যোগাযোগ ও
পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সভাপতি
