গণিত-ইংরেজিতে দুর্বল মানবিকের শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৭ মে ২০১৯, ০২:৩৮ এএম

পাসের হার গতবারের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের ফল খারাপের প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলে। অন্য বিষয়ের ফল ধারাবাহিকভাবে যেমন ভালো হচ্ছে, ঠিক এর উল্টো ইংরেজি ও গণিত। অনেক চেষ্টা করেও ইংরেজি ও গণিতেই ফল কিছুতেই ভালো করা যাচ্ছে না এসএসসিতে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, মানবিকের শিক্ষার্থীরাই এই দুই বিষয়ে দুর্বল আর তারাই খারাপ করছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, গণিত ও ইংরেজির দিকে বিশেষ নজর না দিলে অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে।

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এবার পাসের হার ৮২ দশমিক ২০। গতবারের তুলনায় এ বছর পাসের হার বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। কিন্তু গত তিন বছরের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরে উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তনের কারণে ২০১৮ সালে সেই ফল কমে দাঁড়ায় ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশে। এবার পাসের হার বাড়লেও ২০১৭ সালের ফলের ধারেকাছেও নেই। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি গতকাল ফল প্রকাশের পর বলেন, ‘ইংরেজি ও গণিতে খারাপ করেছে মানবিকের শিক্ষার্থীরা। তারা ভালো করলে পাসের হার আরও বাড়ত।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থেকেও এক বাণীতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন ও অনুত্তীর্ণদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে বলেছেন।

মানবিকের পাসের হার প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলে ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক বিষয়ের পরীক্ষার্থীদের ফল সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে না। গতবারের তুলনায় সার্বিকভাবে পাসের হার কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও মানবিকের কারণে অনেকখানি পিছিয়ে গেছে পাসের হার। এ বছর মানবিকে পাসের হার মাত্র ৭৪ দশমিক ৩২ শতাংশ, যেখানে বিজ্ঞানের পাসের হার ৯৪ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং বাণিজ্যে পাসের হার ৮৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, সব বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও সমান্তরালভাবে ফল করতে পারছে না। বিশেষ করে, বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের তুলনায় মানবিকের ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে পিছিয়ে থাকছে।

একাধিক বোর্ডের সিনিয়র শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ইংরেজি বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। অভিজ্ঞ ইংরেজি শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া ইংরেজি বিষয়ে সৃজনশীল প্রশ্নে দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

শিক্ষাবিদ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জেলাপর্যায়ের গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভালো মানের শিক্ষার পরিবেশ নেই। বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞ শিক্ষকও নেই। এমনও রয়েছে যে, বাংলার শিক্ষক ক্লাস নেন ইংরেজি কিংবা ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার। অনেক স্কুলে নেই ইংরেজির শিক্ষক। ফলে ওই স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা ফলে পিছিয়ে থাকছে। মফস্বলের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা ততটা সচেতন নন।

শিক্ষামন্ত্রী গতকাল সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবার ভালো ছিল বলে পাসের হার বেড়েছে। কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। মানবিকের ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষার্থীরা খারাপ করেছে। এ দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হবে।’

স্বাধীনতার পর থেকে ইংরেজির প্রতি অনীহা প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ইংরেজির প্রতি আগ্রহী নই সেই স্বাধীনতার পর থেকেই। আর এ কারণেই ইংরেজি বিষয়ে ভালো শিক্ষক নেই। যদিও বা আছে তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয় না। বিশেষ করে, মফস্বলে ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকের খুবই অভাব। প্রশিক্ষণের ভালো ব্যবস্থা নেই। একই অবস্থা গণিতেই ক্ষেত্রেও। গণিতের ভালো শিক্ষক নেই, থাকলেও তাদের মূল্যায়ন করা হয় না, প্রশিক্ষণের তেমন ব্যবস্থাও নেই। এদিকে যদি সরকার বিশেষভাবে নজর না দেয়, তাহলে এই অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে।’

ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের দিক দিয়ে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। এ বছর ছেলেদের পাসের হার ৮১ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং মেয়েদের ৮৩ দশমিক ২৮ শতাংশ। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের পাসের হার ২ দশমিক ১৫ শতাংশ বেশি। গড় পাসের হার ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ। এর আগে ২০১৮ সালে ছাত্রদের পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর ছাত্রীদের পাসের হার ৭৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০১৭ সালে ছেলেদের পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং মেয়েদের ছিল ৮০ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে ছেলেদের পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ এবং মেয়েদের ছিল ৮৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে জিপিএ ৫-এর দিক দিয়েও মেয়েরা এগিয়ে। মেয়ে ৫৩ হাজার ৪৮৪ জন এবং ছেলে ৫২ হাজার ১১০ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে।

 ৭০-এর ঘরেই আটকে আছে সিলেট বোর্ড

এ বছরও সিলেট বোর্ডের ফল ভালো হয়নি। বোর্ডটির খারাপ ফলও পাসের হারে প্রভাব ফেলেছে। এ বছর সিলেট বোর্ডের পাসের হার ৭০ দশমিক ৮৩। গত বছর এই হার ছিল ৭০ দশমিক ৪২। ফলে ৭০ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে। অন্য বোর্ডের সঙ্গে সমান্তরালভাবে এগোতে পারছে না টেকনিক্যাল ও বরিশাল বোর্ডও। অন্য সব বোর্ডের চেয়ে বেশ খানিকটা পিছিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি বোর্ড। তবে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে রাজশাহী বোর্ড। এই বোর্ডের পাসের হার ৯১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। তবে এ বছর ঘুরে দাঁড়িয়েছে যশোর বোর্ড ও কুমিল্লা বোর্ড। গত বছর যশোর বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৬৪ কিন্তু এ বছর বোর্ডটিতে পাসের হার ৯০ দশমিক ৮৮। অন্যদিকে গত বছর কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৪০ শতাংশ, এ বছর ৮৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। তবে ফল নি¤œমুখী ঢাকা বোর্ডের। গত বছর ঢাকা বোর্ডের ফল ছিল ৮১ দশমিক ৪৮ শতাংশ কিন্তু এ বছর ৭৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।

শতভাগ শূন্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন মন্ত্রী

এ বছরে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৫৮৩টি। গতবারের চেয়ে এর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার বেশি। অন্যদিকে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০৭টি। গতবারের চেয়ে ২টি কমেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবেÑ উল্লেখ করে দীপু মনি বলেন, ‘এর আগেও যারা এমন শতভাগ শূন্য পাস ছিল তাদেরকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছিল। হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। আমরা খোঁজ নেব, যারা টানা গত কয়েক বছর ধরে একজন শিক্ষার্থীকেও পাস করাতে পারছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত