দেশে আবারও গণপরিবহনে এক তরুণী দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলো। এবার কিশোরগঞ্জে এই নৃশংসতার শিকার হলেন শাহিনুর আক্তার তানিয়া (২৩) নামে রাজধানীর একটি হাসপাতালের সেবিকা। বাসের চালক ও সহকারীসহ পাঁচজনকে আটক করে ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। একের পর এক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে নারীর নিরাপত্তাহীনতার ভয়ংকর চিত্র ফুটে উঠছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, নিজের ঘর থেকে শুরু করে জনপরিসর, হাসপাতাল থেকে শুরু করে গণপরিবহন কোথাও যেন আর নিরাপদ নন নারীরা। নিজের পিতা থেকে শুরু করে শিক্ষক, সহপাঠী, সহকর্মী, প্রতিবেশী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সব শ্রেণির পুরুষের কাছ থেকেই ধর্ষিত ও নিগৃহীত হচ্ছেন নারীরা। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনায় অনেকের হয়তো ‘নির্ভয়া’র কথা মনে পড়তে পারে। ভারতের মেডিকেল কলেজ ছাত্রী জ্যোতি সিংহ পাণ্ডে ২০১২ সালে নয়াদিল্লিতে চলন্ত বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সাহসী ভূমিকা রাখায় ভারতের গণমাধ্যম তাকে ওই নাম দিয়েছিল। যেমন এবার নোয়াখালীর নুসরাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার যৌন নিপীড়নের কথা প্রকাশ করে সাহসিকতার সঙ্গে তার বিরুদ্ধে মামলা লড়েছে। এমনকি আগুনে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার পর মৃত্যুশয্যায় থেকেও নুসরাত প্রাণপণ শক্তিতে জ্বলে উঠে বলেছিল, ‘আমি সারা বাংলাদেশের কাছে বলব, সারা পৃথিবীর কাছে বলব এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য।’ নুসরাতের এই সাহসী উচ্চারণে মানুষ তাকে ‘কন্যা সাহসিকা’ নামে অভিহিত করে। কিন্তু এই ‘নির্ভয়া’ আর ‘কন্যা সাহসিকা’দের কথার মর্ম আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করছে কি?
নয়াদিল্লির ওই ঘটনার পর বাংলাদেশের গণপরিবহনেও একের পর এক দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটতে শুরু করে। ২০১৩ সালে মানিকগঞ্জে বাসে ধর্ষিত হন এক তরুণী পোশাককর্মী। ২০১৬ সালে বরিশালে চলন্ত বাসে ধর্ষিত হন দুই নারী। ২০১৭ সালে বহুজাতিক কোম্পানির কর্মী রূপা খাতুনকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর মধুপুরের বনে লাশ ফেলে যায় পরিবহন কর্মীরা। ২০১৮ সালে ধামরাইয়ে পোশাককর্মী আরেক তরুণী বাসের মধ্যে ধর্ষিত হন। একই বছরের আগস্টে টাঙ্গাইলে বাসের মধ্যে এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ করে চালক ও সহকারীরা। এর বাইরেও দেশে পাবলিক বাসে আরো ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া গণপরিবহনে নারীদের ওপর নানা মাত্রার যৌন নিপীড়ন ও সহিংসতার ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চললেও সেসব ক্ষেত্রে যেমন কোনো অভিযোগ দাখিল করার সুযোগ থাকে না তেমনি অনেক খবর প্রকাশিতও হয় না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গণপরিবহনে বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন ৯৪ শতাংশ নারী। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারীই চলন্ত বাসে ওঠা-নামার সময় হয়রানির শিকার হন। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির ২০১৭ ও ১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন গণপরিবহনে ৫৩টি বড় ধরনের নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গণপরিবহনে যৌন হয়রানির পেছনে পরিবহনকর্মীদের অপরাধপ্রবণ মনস্তত্ত্ব কাজ করে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চের গবেষণামতে, প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবহন-চালক যৌনকর্মীর কাছে গমন করে এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির তথ্যমতে, ৩০-৩৫ শতাংশ পরিবহনকর্মীই নানা ধরনের মাদক গ্রহণ করে।
গণপরিবহনে যৌন নিপীড়নের ঘটনা সমাজে ধর্ষণের মহামারী থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা অধিকার ও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে গত ১০ বছরে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি নারী। মানবাধিকার কর্মী ও গবেষকরা বলছেন, দেশে ধর্ষণের ঘটনার মাত্র ৩ শতাংশের বিচার হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলা নিষ্পত্তি হয় না এবং অপরাধীরা নানাভাবে পার পেয়ে যায়। অন্যদিকে, দুর্বল অভিযোগপত্রের কারণে অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না, এমন অভিযোগও প্রবল।
এ অবস্থায় দেশে কেবল ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠনে নারী আন্দোলন ও মানবাধিকার কর্মীদের দাবি বিবেচনা করা সমীচীন বলে মনে হচ্ছে। যাতে দ্রুততম সময়ে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি গণপরিবহনে ধর্ষণ ও হত্যার নৃশংসতা বন্ধে এ খাতের সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাসগুলোতে নারী যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সর্বোপরি বলা যায়, সামাজিক শক্তি সক্রিয় থাকলে ধর্ষণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু দেশের মানুষকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলার কাজটি করবে কে?
