বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ায় ধনীপ্রধান দেশগুলো আরও ধনী হচ্ছে, গরিব দেশগুলোর সঙ্গে ধনীদের বৈষম্য আরও বাড়ছে। গত ৫০ বছর ধরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি কতটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তার উল্লেখ না থাকলেও গবেষণা প্রতিবেদনে তারা বলছেন শুধু তাপমাত্রা বাড়ার কারণে ২০১০ সালেই ভারতের মাথাপিছু জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩১ শতাংশ। গরম বাড়ার কারণে বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ব্রাজিলের জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমেছে ২৫ শতাংশ।
১৯৬১ থেকে ২০১০ সময়কাল পর্যন্ত ১৬৫ দেশের তাপমাত্রা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এই গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব সব দেশের ওপর সমানভাবে পড়ছে না। গত ৫০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে, গরিব দেশগুলো হয়েছে গরিব। এই সময়ে ধনী-গরিব দেশের বৈষম্য ২৫ গুণ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক মার্শাল বার্ক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছেন, শীতপ্রধান দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে লাভবান হচ্ছে। গরমপ্রধান দেশগুলোর জন্য তাপমাত্রা বৃদ্ধি ‘জরিমানা’র মতো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উদাহরণ দিয়ে গবেষণা দলের প্রধান নোয়া ডিফেনবাঘ বলেছেন, শীতপ্রধান দেশগুলোতে তীব্র ঠা-ার কারণে চাষাবাদের সময় খুবই কম থাকে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে সে সময়ের ব্যাপ্তি বাড়ছে। অন্যদিকে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে গরমপ্রধান দেশগুলোর ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গরমপ্রধান দেশগুলোর শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। কিন্তু শীতপ্রধান দেশগুলোর শ্রমিকরা আরামে কাজ করার সুযোগ পায়। এ ছাড়া বাড়তি গরমে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষের মেজাজ গরম থাকে, আন্তঃব্যক্তি দ্বন্দ্ব বা সংঘাত বেশি হয়। শিল্পবিপ্লবের সূচনালগ্ন থেকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব আমলে নিলে আরও বড় ধরনের বৈষম্য সৃষ্টির তথ্য মিলবে বলে মনে করছেন গবেষকরা। গবেষণা প্রতিবেদনটির তথ্য অনুযায়ী, ক্রমাগত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশের গ্রীষ্মম-লীয় অক্ষাংশের দেশগুলো। মৌরিতানিয়া ও নাইজারে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শুরুর আগের সময়ের চেয়ে কমেছে ৪০ শতাংশের বেশি।
ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ধনী দেশের অনেকগুলোই শীর্ষ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণকারী। গবেষণা তথ্যমতে, ১৯৬১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১৮ দেশ মাথাপিছু ১০ টনেরও কম কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় এসব দেশের মাথাপিছু জিডিপি কমেছে ২৭ শতাংশ। আবার ১৯ দেশের মধ্যে ১৪টি দেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের পরিমাণ মাথাপিছু ৩০০ টন ছাড়ালেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে লাভবান হয়েছে। এ সময় এই ১৪ দেশে মাথাপিছু জিডিপি বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
গ্রিনপিস আফ্রিকার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা হ্যাপি খাম্বুলের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর জন্য নানামুখী হুমকি বয়ে আনছে। গত ২৫ এপ্রিলের ‘কেনেথ’ নামের সাইক্লোনে মোজাম্বিকে ৪০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। মার্চে সাইক্লোন ‘আইযাইয়ের’ আঘাতে মোজাম্বিক, মালাউই ও জিম্বাবুয়েতে মারা যান নয়শর বেশি মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও এ কারণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আফ্রিকার দেশগুলোয়, যোগ করেন তিনি।
