৪৫ বছর বয়সী রবির বাড়ি যশোর সদর উপজেলার পুরাতন কসবা গ্রামে। স্থানীয়রা জানেন নিজের জমিতে নানা জাতের মৌসুমি সবজি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। তাই তাদের কাছে তিনি ‘সবজিচাষি রবি’ নামেই পরিচিত। তবে সবজি চাষের আড়ালে তিনি যে আন্ডারওয়ার্ল্ডে আগ্নেয়াস্ত্রের সরবরাহকারীÑ সেই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে সম্প্রতি।
কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের (এসএজি) আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের হাতে বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দুই সদস্য বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই রবির গোপন অস্ত্র কারবারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেনÑ মির্জা বাশার বেগ (৫৫) ও আবু জাফর মো. রেজাউল করিম ওরফে মুকুল (৫৩)। আর্মস এনফোর্সমেন্টের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, রবি নামে একজনের কাছে ওইসব অস্ত্র সরবরাহের কথা ছিল। এর আগেও বিদেশি অস্ত্রের অন্তত ২০টি চালান তারা ওই রবির মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, যশোর জেলা সদরের নোয়াপাড়া রোডের ২৭ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মির্জা বাশার বেগের মালিকানাধীন বেগ আর্মস অ্যান্ড কোম্পানি চুয়াডাঙ্গা জেলার একমাত্র বৈধ অস্ত্রের
দোকান। আর বগুড়া সদরের বাসিন্দা মুকুল হলেন বগুড়া জেলার ‘খাজা আর্মস’ নামে আরেক বৈধ অস্ত্রের দোকানের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার)।
গত শনিবার রাতে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় রবি ও ‘পাগলা ভাই’ নামে দুজনের কাছে অস্ত্র ও গুলি সরবরাহকালে সিটিটিসির আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের হাতে ধরা পড়েন বাশার ও মুকুল। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ৫৬ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আর্মস এনফোর্সমেন্ট দলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তার বাশার ও মুকুল দুজনেই দুই জেলার দুটি বৈধ অস্ত্রের দোকানের অস্ত্র কারবারি। তবে দীর্ঘদিন ধরেই তারা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিভিন্ন অপরাধীর কাছে বিদেশি নামিদামি অস্ত্র সরবরাহ করে আসছিল। এই সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে খাজা হাবিব হোসেন, রবি ও পাগলা ভাই নামে আরও তিনজনের তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের গ্রেপ্তারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একটি বৈধ অস্ত্র ও গুলি কেনাবেচার সময় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষকেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিতভাবে অবহিত করতে হয়। কিন্তু তারা সেই নিয়ম না মেনে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে অস্ত্র ও গুলির হাত বদল করছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে তারা দুজনেই এমন অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেছেন, যশোরের রবি নামে একজনের মাধ্যমে তারা এসব অস্ত্র দক্ষিণাঞ্চলসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছেন।
আর্মস এনফোর্সমেন্টের অপর এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বগুড়ার খাজা আর্মসের মালিক খাজা হাবিব হোসেন, তার দোকানের ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) মুকুল এবং চুয়াডাঙ্গার বেগ আর্মস অ্যান্ড কোংয়ের মালিক বাশার বৈধ অস্ত্রের ডিলারের লাইসেন্স ব্যবহার করে গোপনে অবৈধভাবে নামিদামি বিদেশি ব্র্যান্ডের অস্ত্র সংগ্রহ করে থাকেন। সেসব অস্ত্র ‘সবজি চাষি’ রবির মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত এই সিন্ডিকেট। ওই কর্মকর্তা বলেন, খাজা আর্মসের ২০টি ও বেগ আর্মসের ৩০টি অস্ত্র বেহাত হয়েছে। এছাড়া একাধিক বৈধ অস্ত্রের ডিলারদের মাধ্যমে আরও অন্তত ১৫০টি বিদেশি অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অস্ত্রের বেশিরভাগই ওই রবির মাধ্যমে অপরাধীদের হাতে গেছে। রবিকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই জানা যাবে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের হাতে কোন দোকানের কত অস্ত্র চলে গেছে।
আর্মস এনফোর্সমেন্টের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, রবিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে বগুড়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসকের কাছে ওই দুই দোকানের অস্ত্র কেনাবেচাসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ওইসব তথ্য পাওয়ার পর বোঝা যাবে এই দুই দোকান থেকে কী পরিমাণ অস্ত্র অবৈধভাবে বেহাত হয়েছে।
আর্মস এনফোর্সমেন্টের একাধিক কর্মকর্তা জানান, লাইসেন্সধারী অস্ত্রের ডিলারদের যোগসাজশে সবজি চাষের আড়ালে রবি বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবসার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। দক্ষিণাঞ্চলসহ রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি নামিদামি ব্র্যান্ডের বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রের সরবরাহ করে থাকেন। বিশেষ করে যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সুন্দরবনের সর্বহারা, চরমপন্থি, জলদস্যু, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতা, চাঁদাবাজ, স্থানীয় ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে গোপনে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকেন রবি। এসব অস্ত্রের সবই তিনি বৈধ অস্ত্র কারবারিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করেন। এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে আড়াই লাখ টাকায় অস্ত্র কিনে তিন থেকে চার লাখে বিক্রি করেন।
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, চুয়াডাঙ্গার বেগ আর্মসের লাইসেন্স নেওয়া হয় ২০১১ সালে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত জেলার একমাত্র ওই অস্ত্রের দোকানে এক রাউন্ড গুলি ও একটি অস্ত্রও নথিভুক্ত করার তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ প্রতি বছরই দোকান মালিক ২০ হাজার টাকা দিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করে যাচ্ছেন। এই দোকানের মালিক বাশার বেগের সঙ্গে বগুড়ার খাজা আর্মসের মালিক খাজা হাবিবের সম্পর্ক রয়েছে। এরা পরস্পর যোগসাজশে তাদের লাইসেন্স দেখিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করে তা দোকানের রেজিস্ট্রার খাতায় না তুলে সবজি চাষি রবির মাধ্যমে অস্ত্র বিক্রি করে আসছেন। এ তথ্য পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ওই দুই দোকানের তথ্য চেয়ে গত মঙ্গলবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আর্মস এনফোর্সমেন্টের এক পরিদর্শক বলেন, খাজা আর্মসের মালিক খাজা হাবিব হোসেন প্রায় চার বছর ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। চলাফেরা করতে পারেন না। দোকানও খোলেন না। কিন্তু বাসায় শুয়ে-বসেই তার দোকানের ম্যানেজার মুকুলের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্রের কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, নেত্রকোনা জেলার ফায়ার আর্মসের মালিক বাবুল ও খুলনার আরেক অস্ত্র ব্যবসায়ী সুবোধ দধির সঙ্গেও এই রবির সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। যাদের মাধ্যমে রবি খুলনার বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনসহ সুন্দরবনের জলদস্যুদের দোনলা বন্দুক সরবরাহ করেছেন। গোয়েন্দারা জানান, চুয়াডাঙ্গা ও বগুড়া জেলার অস্ত্রের দুই কারবারি সেইফ গার্ড হিসেবে তাদের দোকানের লাইসেন্স ব্যবহার করেছেন। প্রকাশ্যে বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেখিয়ে আড়ালে অবৈধ ব্যবসা করে গেছেন। যার কারণে কী পরিমাণ বৈধ অস্ত্র অবৈধভাবে অপরাধীদের হাতে গেছে সে বিষয়ে কোনো তথ্যই নেই সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে।
