একটি অক্ষরের ছোট্ট শব্দ ‘মা’। কিন্তু এই শব্দটিই প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে কাছের। মা না থাকলে আমরা কেউই পৃথিবীর এই আলো-বাতাস দেখতে পেতাম না। তাই তো মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে লেখা হয়েছে অজস্র কবিতা, গল্প ও উপন্যাস। নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। ঢালিউডে মা নিয়ে নির্মিত অধিকাংশ সিনেমাই সুপারহিট। কারণ মা শব্দের সঙ্গে বাঙালির রয়েছে গভীর আবেগ। সেই আবেগের প্রতিচ্ছবি দেখতেই হয়তো দর্শক ভিড় করেছে সিনেমা হলে। আজ সেই মাকে বিশেষভাবে মনে করার দিন, বিশ্ব ‘মা’ দিবস। বিশেষ এই দিনে মা নিয়ে নির্মিত সাড়াজাগানো কিছু চলচ্চিত্র নিয়ে এই আয়োজন সাজিয়েছেন মাসিদ রণ
ঢালিউডে মাকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতে মায়ের অসীম মমতাবোধ ও ত্যাগের চিত্রটিই জোরালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি চিত্রিত হয়েছে বাঙালি মায়ের দুঃখ-কষ্ট, বঞ্চনা আর সন্তানের জীবনে মায়ের গুরুত্বের গল্পও। ‘মা’ নিয়ে নির্মিত সাড়াজাগানো চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমা হলো কাজী হায়াত পরিচালিত ‘আম্মাজান’। কিংবদন্তি অভিনেত্রী শবনম দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে এই সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। তার সন্তানের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম সফল নায়ক মান্না। আরও অভিনয় করেছেন মৌসুমী ও ডিপজল। এই সিনেমায় সদ্য প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ‘আম্মাজান আম্মাজান, চোখের মণি আম্মাজান’Ñ গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‘আম্মাজান’ ১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশি অপরাধধর্মী সিনেমা। মা নিয়ে ব্যতিক্রমী একটি সিনেমা হওয়ায় এখনো এই সিনেমাটি দেশের কোনো কোনো প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। শুধু তাই নয়, এই সিনেমার রিমেক করারও কথা ভাবছে একটি প্রযোজনা সংস্থা।
মায়ের অধিকারের জন্য অনেক সিনেমাতেই প্রতিবাদী হয়েছেন অমর নায়ক সালমান শাহ। কিন্তু ‘বুকের ভেতর আগুন’ সিনেমার মতো মায়ের জন্য এত উৎসর্গী মনোভাব তার অভিনীত আর কোনো চরিত্রেই ছিল না। ফালগুনী হামিদ কালেভদ্রে সিনেমায় অভিনয় করেন। ছটকু আহমেদের পরিচালনায় তিনি পেয়েছিলেন মনের মতো একটি চরিত্র। মায়ের অধিকার ফিরিয়ে দিতে সালমান শাহ গল্পের প্রথমাংশে এবং শেষাংশে ফেরদৌস যুদ্ধ করেন। মা-ছেলের গল্পের পাশাপাশি ছিল একটি মিষ্টি প্রেমের গল্পও।
শিবলী সাদিক পরিচালিত ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘মায়ের অধিকার’-এ অভিনয় করেছেন অকালপ্রয়াত চিত্রনায়ক সালমান শাহ ও কিংবদন্তি অভিনেত্রী ববিতা। আরও রয়েছেন আলমগীর ও শাবনাজ। বড়লোক পরিবারের বউ হওয়া সত্ত্বেও ববিতাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। কিন্তু তার সন্তান সালমান শাহ মায়ের সেই হারিয়ে ফেলা অধিকার ফিরিয়ে আনেন।
মা নিয়ে একাধিক সফল সিনেমার নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবর। তার পরিচালিত ‘আমার মা’ ও ‘মায়ের চোখ’ সিনেমা দুটি আজও সিনেমাপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে। ‘আমার মা’ সিনেমার গল্প গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বামী-সন্তানকে হারিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করে তোলা এক মায়ের গল্প নিয়ে। স্বামীর চোখে ‘অসতী’ হওয়া এক মায়ের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে আওকাত হোসেনের ‘মায়ের দাবি’।
গুণী নির্মাতা জাকির হোসেন রাজুর ‘মা আমার স্বর্গ’ সিনেমায় দ্বৈত চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন ববিতা। শাকিব খানের মা মারা গেলে সে বিপথে চলে যায়। সুপথে ফিরে আসে ‘হারানো মা’ ফিরে এলে। ববিতার সঙ্গে শাকিবের রসায়ন দর্শকদের মনে ধরে। গতানুগতিক সিনেমা থেকে কিছুটা হলেও আলাদা ‘মা আমার স্বর্গ’। মায়ের জন্য মারামারি-হাতাহাতি কিছুই করে না ছেলে। এ সিনেমার গল্প, এক মা-হারা ছেলের বুকের বেদনা থেকে উৎসারিত। নির্মাতা জাকির হোসেন রাজু বলেন, ‘আমরা তো বেশির ভাগ সময় প্রেম-ভালোবাসার সিনেমাই করি। কিন্তু নির্মাতা হিসেবে ভিন্ন গল্পের সিনেমাও করতে মন চায়। বিশেষ করে মায়ের মতো আবেগপ্রবণ বিষয়ে সিনেমা করাটা তো ভাগ্যের ব্যাপার। এই সিনেমার গল্পটি শুনেছিলাম আমার সহকারী পরিচালক দোলোয়ার হোসেন দিলুর কাছে।’
মা নিয়ে বেশির ভাগ সিনেমাই সুপারহিট। এ জন্যই এ গল্পটি নিয়ে কাজ করেছেন কি না জানতে চাইলে রাজু বলেন, ‘প্রথমে একটি ভালো গল্প বলেই নির্মাণ করেছিলাম, পরে এসেছে ব্যবসার বিষয়টি। এটি একেবারেই মৌলিক একটি গল্প। এতে ববিতা ম্যাডাম দ্বৈত চরিত্র করেছেন। বিশেষত্ব হলোÑ বেশির ভাগ দ্বৈত চরিত্রে দেখানো হয় যমজ। কিন্তু এ সিনেমায় ববিতা ম্যাডামের চরিত্র দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এলাকার দুটো মানুষ। সিনেমাটিতে অভিনয়ের অনেক সুযোগ ছিল বলে ববিতা ম্যাডাম খুবই খুশি ছিলেন। শাকিবও মন দিয়ে কাজ করেছেন।’
অনেকগুলো ছবিতে ডলি জহুরের ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন কাজী মারুফ। এই ছবিগুলোর প্রতিটিতেই মারুফ মায়ের চোখের জল মুছে দিতে উদ্যত হয়েছেন। অস্ত্র হাতে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন শত্রুদের ওপর। আহমেদ নাসির পরিচালিত ‘মা আমার জান’ সিনেমাতেও মারুফ মায়ের জন্য চিৎকার করেছেন। হাতিয়ার হাতে লড়াই করেছেন।
এফ আই মানিক পরিচালিত ‘মায়ের হাতে বেহেশতের চাবি’তে শাকিব-অপু জুটি থাকলেও আনোয়ারা ও ডিপজলের অভিনয়ের জন্যই এটি আলাদা। মা আনোয়ারার জন্য ডিপজল সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার। বিপদে আশ্রয়দাত্রীর পাশে দাঁড়ান, যখন মায়ের পেটের সন্তানরা তার পাশ থেকে সরে যান।
এ ছাড়া মাকে উপজীব্য করে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দেলোয়ার হোসেন লালের ‘বড় মা’, আওকাত হোসেনের ‘মায়ের দাবি’, দীলিপ বিশ্বাসের ‘মায়ের মর্যাদা’, মোস্তাফিজুর রহমান মানিকের ‘মা আমার চোখের মণি’, শেখ নজরুল ইসলামের ‘মা বড় না বউ বড়’ ও চাষী নজরুল ইসলামের মাস্টারপিচ ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’।
