চলতি বছর গরমের শুরুতে ঢাকা মহানগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে ভয়াবহ আগুন লেগে যায়। এর মধ্যে একুশে ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের আগুন এবং ২৮ মার্চ বনানীর আগুন সারা দেশের মানুষকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে। চকবাজারের আগুনের সঙ্গে ২০১০ সালের নিমতলীর আগুনের মিল আছে, যেখানে আগুন দাহ্য কেমিক্যাল মজুদের ওপর ছড়িয়ে গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং তাতে বহু লোকের প্রাণহানি হয়। নিমতলীর আগুনের পর সেই এলাকায় কেমিক্যাল মজুদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে, ফলে ঐ এলাকা এখন কেমিক্যাল মজুদ থেকে মোটামুটিভাবে মুক্ত। কিন্তু চকবাজারকে কেন্দ্র করে একাধিক এলাকায় কেমিক্যাল মজুদের গোডাউন রয়েছে এবং এলাকাগুলো ঘনবসতিপূর্ণও বটে। তাই বলা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীতীরবর্তী দক্ষিণের পুরান ঢাকার বাসিন্দারা প্রাণ হাতে করে বিস্ফোরকের ওপর শুয়ে আছে।
আগুনের ঘটনার পর নগরীর বহুতল ভবনগুলোতে আগুনজনিত নিরাপত্তার অভাবের বিষয়টি বড় করে উঠে আসছে। ঢাকা মহানগরীর ভবনগুলোতে আগুন লেগে গেলে মানুষ পালাবার পথ পায় না।
ঢাকা মহানগরীর প্রায় সব বহুতল ভবনেরই বাহিরে সুদৃশ্য, ভেতরেও সুদৃশ্য। কিন্তু আগুন লাগলে জীবনের নিরাপত্তা নেই। শুধুমাত্র অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ত্রুটিপূর্ণ তাই নয়, আগুন লেগে গেলে দ্রুত তা ছড়িয়ে যায় এবং মানুষদের পালাবারও সুযোগ থাকে না। ভবনগুলো গায়ে গায়ে লাগানো। এখন কিছু ভবন নির্মিত হচ্ছে কিছুটা ফাঁকায়, কিন্তু কাচে ঘেরা, যা কিনা এক একটা চিমনির মতো। অনেক সময় কেন্দ্রীয় শীতাতপ ব্যবস্থার প্রয়োজনে, অধিকাংশ সময় ভবনের স্থাপত্য নকশাতেই সুদৃশ্য কাচের দেয়ালের বহিরাবরণ থাকে। এসব ভবনের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য বৃদ্ধির নকশা ও নকশায় ব্যবহৃত দ্রব্যাদি উভয়ই আগুনবান্ধব। তাই এসব নকশার ভবনে যে তলায় আগুন লাগবে সেই তলা গনগনে তন্দুরের মতো হয়ে যাবে ও ঘেরাটোপের ভেতর আগুনের ফিনকি দ্রুত ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে যাবে। আগুনের ধর্ম নিম্নমুখ থেকে বাতাস নিয়ে জ্বলে উঠে ঊর্র্ধ্বমুখে শিখা ছড়ানো, তাই যে তলায় আগুন লাগবে তার নিচের তলা আগুনমুক্ত থাকবে। কাচের ঘেরাটোপ হলেও নিচতলা বা চারপাশের নানান ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাস ঢুকে আগুন ধরে ওপরে ছড়াবে।
রাজউক বলছে, ঢাকা নগরীর অধিকাংশ ভবনের নকশা ত্রুটিপূর্ণ এবং অবৈধ। ভবনের নকশা অনুমোদনকারী কর্মকর্তারা এবং বিশেষজ্ঞরা নগরীর আগুন লাগা ভবনগুলো পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন করছেন ও ভেঙে ফেলার পরামর্শ বা হুমকি দিচ্ছেন। অগ্নিনির্বাপণ দপ্তর মতিঝিল এলাকার ভবনগুলোর অধিকাংশই আগুন ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে। রাজউক বা পূর্ত মন্ত্রণালয় এসব ভবন ভেঙে ফেলার যতই হুমকি দিক, সে সব ভবন এখনই ভেঙে ফেলা বা ঠিক করা এখনই সম্ভব নয়। প্রথম আলোতে অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালীর সাক্ষাৎকার পড়ে জানা যায়, উনি জাতীয় অগ্নিসনদ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাদের প্রশ্ন তারা কি ভবনে আগুন প্রতিরোধ বিষয়ে ভবনের বহিরাবরণ ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যবৃদ্ধির স্থাপত্য নকশা ও নকশায় ব্যবহৃত দ্রব্যাদি আগুনবান্ধব বা প্রতিরোধী কি না সে বিষয়ে সতর্ক হওয়ার কথা বলেছেন?
কেবল ঢাকা মহানগরীই নয়, সারা দেশের উদীয়মান নগরীগুলোতে যেসব আধুনিক ভবন নির্মিত হচ্ছে তাদের ঝকমকে স্থাপত্য দেখে আমাদের চোখ জুড়িয়ে যায়! সে সব ভবনের ভেতরেও অসাধারণ ঝাড়বাতি ও কারুকার্যের চমৎকারিত্ব দেখা যায়। কিন্তু আমরা এখন প্রশ্ন তুলতে পারি, এসব কি জাতীয় অগ্নিসনদ সম্মত? আমরা তাই ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও মালিকদের ভবনে শুধুমাত্র আগুন প্রতিরোধ ব্যবস্থা নয়, ভবনের বহিরাবরণ ও অভ্যন্তরীণ নকশা আগুন নিরোধী করার পরামর্শ দিচ্ছি। সারা দেশেই ভবন মালিকরা তাদের জমির এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে রাজি থাকেন না, যে কারণে ভবনগুলোর অধিকাংশই গায়ে গায়ে লাগা। আমরা এ ধরনের ভবনগুলোতে প্রতিটি তলায় পাশাপাশি ভবনে যাওয়ার উন্মুক্ত পথ করে দিতে বলছি। আমাদের দেশের অনেক স্থানে মার্কেটগুলোতে এই ব্যবস্থা আছে। আমরা সামান্য দূরে অবস্থিত বহুতল ভবনগুলোর সঙ্গেও সেতুপথ নির্মাণ করে এই ধরনের আগুন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার কথা বলছি।
বহুতল বা একতল যাই হোক, কিংবা লাগোয়া বা বিচ্ছিন্ন যাই হোক, আগুন লেগে গেলে আগুন নেভানোর জন্য কেবলই ফায়ার ব্রিগেডের আসার জন্য অপেক্ষা করে থাকা অবশ্যই নির্বুদ্ধিতা। কারণ, ফায়ার ব্রিগেডকে খবর দিতে এবং তাদের এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে, আগুন ছড়িয়ে যেতে পারে ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই আগুন লেগে গেলে কেউ খবর দেবে ঠিকই, কিন্তু সেখানে অবস্থানকারী আগুন নেভানোর পূর্বপ্রস্তুতি থাকা কোনো দল কিংবা উপস্থিতরা লোকজনকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে এবং আগুন নেভাতে তৎক্ষণাৎ কাজে লেগে যাবে। একটি বহুতল ভবনে বসবাসরত বা কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেরই আগুন নির্বাপণ বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার কথা। এরা না পালিয়ে আগুনের ব্যাপ্তি সীমিতকরণ ও নেভানোর প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করবেন। এই সকল প্রশিক্ষিত ব্যক্তিদের সাহসী ভূমিকা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।
আমরা দেখতে পাই, যে সব ভবনে আগুন লাগে সেসব ভবনের ছাদে বিশাল পানির ট্যাঙ্ক থাকে। কিন্তু সেই ট্যাঙ্কের পানি আগুন নেভাতে ব্যবহার হয় না। কেবল আগুন লাগা ভবনগুলোই নয়, পাশের লাগোয়া ভবনগুলোর ছাদেও ট্যাঙ্কের পানি মজুদ থাকে। আমরা পরামর্শ দেব, ভবনগুলোর প্রতিটি তলায় ট্যাঙ্ক সংযুক্ত বিশেষ পানির লাইন থাকবে; যে লাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা অবহিত থাকবেন ও আগুন লেগে গেলে তা খুলে দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করবেন। বাস্তব অবস্থা এই যে, ঢাকা মহানগরীর ভবনগুলো যেহেতু আগুন থেকে কোনো ক্রমেই নিরাপদ নয়, সেহেতু ঢাকা নগরীর সকল বাসিন্দাকেই স্ববুদ্ধিতে আগুন থেকে বাঁচার কৌশলগুলো রপ্ত করতে হবে। আগুন থেকে বাঁচার প্রথম কৌশল হলো, সিঁড়ি খোঁজা এবং সেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যাওয়া। ভবনের তলাটি ধোঁয়াপূর্ণ হলে জানালাগুলো খুলে দিন ও নিচু হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে বেরিয়ে আসুন।
ঢাকা মহানগরীকে বর্তমান অবস্থাতেই আগুন থেকে নিরাপদ করতে হলে ভবন মালিক ও ভবন ব্যবহারকারীদের আগে বুঝতে হবে তাদের ভবনটি আগুন থেকে নিরাপদ কি না। প্রতিটি তলায় কয়েকটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকলেই হলো না। এর বাহিরের ও ভেতরের কাঠামো ও সৌন্দর্যবৃদ্ধির নকশা আগুননিরোধী করে পুনর্নির্মাণ করতে হবে। এর ব্যবহারকারীদের নির্গমনের জন্য পর্যাপ্ত সিঁড়ি থাকতে হবে। এর মালিক ও ব্যবহারকারীদের তরফ থেকে কিছু লোককে আগুন নেভানোর প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং নিয়মিত মহড়া করাতে হবে। ভবনের মালিক ও ভাড়াটিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে আগুন লাগা বিষয়ে পূর্ণ উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কেবল ব্যবহারকারীদের সক্রিয় উদ্যোগেই হতে পারে। আমরা তাই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ভবন ব্যবহারকারীদেরই সক্রিয় হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
