ভারতের লোকসভা নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক ঝোঁক

আপডেট : ১৩ মে ২০১৯, ০৯:৪০ পিএম

ভারতের চলমান লোকসভা নির্বাচন পরিসমাপ্তির পথে। এই সাড়া জাগানো নির্বাচনের সপ্তম ধাপের ভোটগ্রহণ শেষে আগামী ২৩ মে ঘোষিত হবে ফলাফল, যা নিয়ে রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। তবে এবারের নির্বাচন অন্য যেকোনো বারের নির্বাচনের চেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ, অপ্রীতিকর এবং দুঃখজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। প্রথমবারের মতো বেশ জোরেশোরে ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব এবং অনৈপুণ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপমহাদেশে শুধু বাংলাদেশ ও ভারতেই ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব দেয়। এত দিন পর্যন্ত ভারতের আইসিএসের দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্বে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন অতীত কৃতিত্বের ওপর কালিমা লেপন করেছে। ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে নির্বাচন কমিশনের এই ভূমিকা ফলাফলকে খুব বেশি প্রভাবিত করতে না পারলেও এর মধ্য দিয়ে এক ধরনের অধোগতির সূচনা করল। এ ক্ষেত্রে ভারতের এখন কর্তব্য একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা।

 

এবারের নির্বাচনে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিজেপির কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার চেষ্টা। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এ বিষয়ে উদাহরণ দেখিয়ে সরব হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে যেসব অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল তাকে আড়াল করার জন্য বিজেপি ও তার মিত্ররা উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়কে প্রধান করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালিয়েছেন এবং নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়কে ইস্যু করেছে। কিছু বাস্তব, কিছু কাল্পনিক বিষয়কে তারা সামনে এনেছে। মনে হয়েছে যেন উগ্র পাকিস্তানবিরোধিতা এবারের নির্বাচনে প্রধান নিয়ামক বিষয়।

 

এই নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতার জোয়ার তৈরি করা হয়েছে। মুসলিমদেরকে তাদের ন্যায্য নির্বাচনী আসন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তাদেরকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে, বাঙালি মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও বিষোদ্গার করা হয়েছে। তারা সব সময়ে ভারতের নাগরিক ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে তাদের ভারতে অবস্থানের অধিকার রয়েছে।

 

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছেন। এমনিতেই আমরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে সমস্যায় রয়েছি, তার ওপর যদি ভারত অন্যায়ভাবে আমাদের ওপর এই সব মুসলিমদের অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে বিতাড়নের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয় তা অবশ্যই আমরা বরদাশত করব না। এর মধ্যে আসামের অবস্থা ভয়াবহ। গতকাল দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ভারতের তথ্যচিত্রনির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার ‘আসামের অঘোষিত জরুরি অবস্থা’য় যে বর্ণনা দিয়েছেন তা যথার্থ। বস্তুতপক্ষে তার এই লেখা আমাদের জন্য একধরনের বিপদ সংকেত। প্রকৃত অর্থে, ভারতের নির্বাচনে যে ধরনের উগ্র সাম্প্রদায়িক প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং ভারত যদি সত্যিই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলে তা সমগ্র উপমহাদেশের জন্য অমঙ্গলজনক হবে। এই অঞ্চল হয়তো বা সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘরে পরিণত হবে। তাই সর্বতোভাবে এই সাম্প্রদায়িকতাকে পরিহার করা দরকার।

 

এই নির্বাচনে দলগুলোর মধ্যে যে কাঁদা-ছোড়াছুড়ি হয়েছে তা খুবই নি¤œমানের এবং অগ্রহণযোগ্য। ব্যক্তিগত আক্রমণের ব্যবহার হয়েছে দেদার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকেও কটূক্তি করতে ছাড়েননি। এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার পারদ সীমান্তে পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বিএসএফের হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডে তা দেখা গেছে।

নরেন্দ্র মোদি এবং তার দল যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেছিল তার অধিকাংশই পূরণ করতে পারেনি। সমীক্ষায় প্রকাশিত হয়েছে যে, ভারতের শিল্প উৎপাদন গত ২১ মাসের মধ্যে সর্বনি¤েœ পৌঁছেছে। বিনিয়োগেও শ্লথ গতিতে পরিণত হয়েছে। মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। কালো টাকা সাদা করে, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে প্রতি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যে ১৫ লক্ষ টাকা জমা করার কথা বলা হয়েছিল এবং কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছিল তার কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। গত সাড়ে চার বছরে মাত্র ২৭.৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়েছে। বেকারত্বের হার গত ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৭.২ শতাংশ, যা গত ২৭ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো দূরের কথা, বরং অনেক কর্মচ্যুতি ঘটেছে। গত বছর ১১ মিলিয়ন কর্মচ্যুতি ঘটেছে। মোদি এ বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা অগ্রহণযোগ্য। ভারতের ভোটাররা এই বিষয়গুলোকে বিবেচনা করবেন বলে আশা করা যায়। এই ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য বিজেপি উগ্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার বাতাবরণ তৈরি করতে চাইছে। তারা মৌলবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করতে চাইছে।

 

বিজেপি উগ্র জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি করে একটি যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি করছে। পারস্পরিক নিন্দাবাদের কোনো সীমা-পরিসীমা থাকছে না। প্রকৃত অর্থে বিজেপির এই নীতি এবং নরেন্দ্র মোদির আচরণ ভারতের সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। ভারতের স্রষ্টারা যে আদর্শ নিয়ে রাষ্ট্রটিকে গঠন করেছিলেন তা থেকে নরেন্দ্র মোদি শুধু দূরে নন, তাকে ধ্বংস করার চেষ্টায় তিনি লিপ্ত। বিখ্যাত আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ‘টাইম’ নরেন্দ্র মোদিকে যে ‘বিভাজনের সারথি’ আখ্যা দিয়েছেন, তা যথার্থ। তাদের প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রবন্ধে তারা দেখিয়েছে যে, মোদি ও তার দল ভারতকে যেভাবে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা দেশটিকে দ্বিখণ্ডিত করে তুলবে। এখানে দেশটির সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলিমদেরকে প্রান্তিক অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং পারস্পরিক ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। এই যে বিষোদ্গারের পরিবেশ ভারতে তৈরি হয়েছে তা শুধু দেশটির জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই অশনিসংকেত।

 

ভারতের স্বার্থেই প্রয়োজন ছিল সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সব দলেরই ঐক্যবদ্ধ হওয়া। এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারত কংগ্রেস। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটা হয়ে ওঠেনি। যদি দিল্লিতে আসন বণ্টনের সময় আম আদমি পার্টির সঙ্গে সমঝোতা হতো, তাহলে সেখানে বিজেপি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ত। একইভাবে যদি উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে সমঝোতা হতো এবং কেরালায় বামপন্থিদের সঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিশালী দলগুলোর সঙ্গে কংগ্রেসের কর্মসূচিভিত্তিক সমঝোতা হতো, তাহলে দৃশ্যপট অনেক বদলে যেত। যদি একটি গণতন্ত্রবান্ধব, জনকল্যাণকামী ও অসাম্প্রদায়িক জোট গঠন করা হতো, তাহলে বিজেপির প্রত্যাবর্তন অসম্ভব হয়ে পড়ত। কিন্তু তা না হওয়ায় নির্বাচনের ফলাফলে একটা অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে।

 

বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক দর্শন-সংবলিত বাংলাদেশের প্রত্যাশা থাকবে, ভারতে একটি অসাম্প্রদায়িক ও প্রতিবেশীবান্ধব সরকার গঠিত হোক। তা শুধু বাংলাদেশের প্রত্যাশার জন্য দরকার নয়, ভারতের নিজস্ব স্বার্থেই দরকার। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তুঙ্গে, তখন আমরা চাইব নতুন সরকারের সময়ে দেশটির সঙ্গে আমাদের যেসব দ্বিপক্ষীয় গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা রয়েছে সেগুলোর সুরাহা হবে। বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে। ভারতে যদি একটি সাম্প্রদায়িক, জঙ্গি মনোভাবাপন্ন সরকার গঠিত হয়, তাহলে তা সন্ত্রাসের বিস্তৃতি ঘটাবে। তাই এই নির্বাচনের ফলাফল বাংলাদেশ এবং বিশ্বশান্তির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে ভারতের অসাম্প্রদায়িক এবং গণতন্ত্রপ্রেমী জনগণ একটি যোগ্য সিদ্ধান্ত দেবে। তা শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা উপমহাদেশের জন্য একটি মঙ্গলজনক বার্তা বয়ে নিয়ে আসবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত