মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় দেশের সুপার রিফাইনারি লবণের বাজারের সেরা দুই ব্র্যান্ড এসিআই ও মোল্লা সল্ট বিপাকে পড়েছে। সম্প্রতি আরও ৫২টি পণ্যের সঙ্গে এসিআইর লবণ ও ধনিয়া গুঁড়া এবং মোল্লা সল্টের লবণ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে তাতে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি এসিআইর শেয়ার দরে তেমন প্রভাব পড়েনি। গতকাল সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এসিআই লিমিটেডের শেয়ার দর আগের দিনে চেয়ে ৪০ পয়সা কমে ২৫৬ টাকা ১০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। তবে সাবসিডিয়ারির কারণে কোম্পানিটি তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত লোকসানে থাকায় কিছুদিন ধরেই শেয়ার দর হারাচ্ছে।
সুপার রিফাইনারি লবণের বাজারে শীর্ষে রয়েছে এসিআই লিমিটেডের সাবসিডিয়ারি এসিআই সল্ট লিমিটেড। বেশকিছু সাবসিডিয়ারি কোম্পানির লোকসান নিয়ে এমনিতেই সংকটে রয়েছে এসিআই লিমিটেড। এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদিত পণ্য মানহীন প্রমাণিত হওয়ায় কিছুটা চাপে পড়বে তারা। সাবসিডিয়ারি ও যৌথ উদ্যোগ মিলিয়ে মোট ১৮টি কোম্পানি রয়েছে এসিআই লিমিটেডের। এর মধ্যে একটি হচ্ছে এসিআই সল্ট লিমিটেড। দেশের বাজারে সুপার রিফাইন লবণের মধ্যে এসিআই সল্ট সিংহভাগ মার্কেট শেয়ার দখল করে আছে। গত সাত বছর ধরে লবণ ক্যাটাগরিতে এসিআই পিউর সল্ট ‘বেস্ট ব্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার পেয়ে আসছে। আর ভ্যাকুয়াম সল্ট ক্যাটাগরিতে ‘বেস্ট আয়োডাইজড সল্ট মিলস অ্যাওয়ার্ড ২০১৭’ প্রথম স্থান অর্জন করেছে এসিআই সল্ট।
এসিআই লিমিটেড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। সাবসিডিয়ারিসহ কোম্পানিটির বাৎসরিক রাজস্ব প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ শতাংশ আসে লবণ থেকে। তবে এসিআই সল্টের বিক্রি গত দুই বছর ধরে কমতে দেখা গেছে। ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে এসিআই সল্টের বিক্রি ছিল ২৩৬ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে ২২৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। আর ২০১৮-১৯ হিসাব বছরের নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এসিআই সল্টের বিক্রি হয়েছে ১৫১ কোটি টাকা, যা বছর শেষে ২০০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে বিএসটিআইর মান উত্তীর্ণ হতে না পারায় আদালতের নির্দেশে এ পণ্যটি উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ থাকবে। ফলে পণ্যটি থেকে আয় কমে যাবে।
২০১৬-১৭ হিসাব বছরে এসিআই সল্টের নিট মুনাফা ছিল ১৭ কোটি টাকা, যা ২০১৭-১৮ হিসাব বছরে ১২ কোটি ৮০ লাখ টাকায় নেমে আসে। আর চলতি হিসাব বছরে বিক্রি কমে যাওয়ায় নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) এসিআই সল্টের কর-পূর্ববর্তী মুনাফা হয় ১৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা কর পরিশোধের পর আরও কমে আসবে।
লবণের পাশাপাশি অন্য এক সাবসিডিয়ারি এসিআই ফুডসের পণ্য ধনিয়া গুঁড়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আদালত। যদিও এ সাবসিডিয়ারির বেশকিছু পণ্য রয়েছে। তবে নিম্নমানের কারণে একটি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা হলেও অন্যান্য পণ্যের ওপর ভোক্তাদের আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে লবণের বাজারের আরেক শীর্ষ কোম্পানি মোল্লা সল্ট ২০০৭ সালে সুপার রিফাইনারি লবণের বাজার ধরতে তিন ধাপে পরিশোধিত প্রযুক্তি নিয়ে আসে। কোম্পানি সূত্র জানায়, ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধতার কারণে মোল্লা সুপার রিফাইনারি সল্ট বিএসটিআই, বিএসসিআইসি ও ইউনিসেফের অনুমোদনপ্রাপ্ত। স্কয়ার, বেক্সিমকো, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস ও প্রাণের মতো করপোরেট গ্রাহকও রয়েছে মোল্লা সল্টের। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের পণ্য স্বাস্থ্যসম্মত দাবি করলেও এক যুগ পর বিএসটিআই মোল্টা সল্টের লবণকে মানহীন বলছে।
১২ মে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ দেশের বাজার থেকে ৫২টি নিম্নমানের পণ্য সরিয়ে ফেলতে বলেছে। এসব পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে ধ্বংস করার পাশাপাশি সেগুলোর উৎপাদন বন্ধেরও আদেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানের মতো খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আদালত। প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথাও বলেছে। ওই ৫২টি পণ্যের তালিকায় আছে এসিআই লবণ ও ধনিয়া গুঁড়া এবং মোল্লা সল্টও।
এ বিষয়ে বিএসটিআইর পরিচালক (মান) ইসহাক আলী বলেন, স্বাস্থ্যসম্মত পণ্যে যেসব প্যারামিটার রয়েছে সেগুলোতে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে এসব কোম্পানি। এ কারণেই তাদের পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তবে পণ্য উৎপাদন ও মান নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানই বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
