বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট কর্মসংস্থানের ১ দশমিক ৪১ শতাংশ বা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে পর্যটন খাতে। এই শিল্পের মাধ্যমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ বা মূল্য সংযোজন হচ্ছে ১৬ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা গেছে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত হোটেল ব্যবসা, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহনসহ বিনোদন খাত থেকে এ আয় হচ্ছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটন থেকে প্রতি বছর ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৫১টি দেশের পর্যটক বাংলাদেশে আসবে। এজন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ দরকার। দেশের ভেতরে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত অন্য অনেক শিল্প। পর্যটন একটি বহুমাত্রিক ও শ্রমঘন শিল্প। সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ও বৃহৎ বাণিজ্যিক কর্মকা- হিসেবে এ শিল্প বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি লাভ করেছে। প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয় পর্যটন খাত থেকে। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন খাত, যেমন পরিবহন, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট, এয়ারলাইন্স ও অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যম থেকে পৃথিবীর অনেক দেশ প্রতি বছর প্রচুর রাজস্ব আয় করে, যা অন্য যে কোনো বড় শিল্প থেকে পাওয়া আয়ের চেয়ে বেশি। বিদেশি পর্যটক যে দেশে যত বেশি, সে দেশের পর্যটন থেকে আয় ততই বেশি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স বা ইউরোপীয় দেশগুলোতে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা অনেক বেশি। তাই এসব দেশে পর্যটন থেকে আয়ের পরিমাণও বেশি। এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ডের পর্যটন খাত থেকে আয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণও বিদেশি পর্যটক। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও শ্রীলঙ্কায় পর্যটন খাত থেকে আয় বেশি। কারণ তাদের পরিকল্পিত চিন্তাভাবনা। ছোট রাষ্ট্রগুলো যেমনÑ হংকং, সিঙ্গাপুর, ম্যাকাও, মালদ্বীপ, ফিজি দ্বীপপুঞ্জও কিন্তু পর্যটন খাত থেকে প্রচুর আয় করে শুধু বিদেশিদের আনাগোনার জন্যই। পাশাপাশি চীন, জাপান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোও পর্যটন খাত থেকে প্রচুর আয় করে থাকে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত নানা স্থানের পাশপাশি আমাদের এখানে বেশকিছু ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানও রয়েছে বাংলাদেশে। আমাদের রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও চিত্রাহরিণ; রয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন, হিমছড়ির ঝর্ণা, ইনানী সমুদ্র সৈকত, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, হাকালুকি-টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকনাফ সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি অঞ্চল, সুজলা-সুফলা চিরসবুজ মাঠ-প্রান্তর তো আছেই। আমাদের দেশে অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রতœতাত্ত্বিক স্থানও রয়েছে। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, কান্তজীর মন্দির, রামুর বৌদ্ধ মন্দির, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, কুষ্টিয়ার লালন শাহের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ির মতো স্থানগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে সমাদৃত। তথাপি পর্যটন খাতে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।
পর্যটন শিল্প অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য ‘জীবনদায়িনী রক্তপ্রবাহ’ হিসেবে কাজ করে ওইসব দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থার চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। অধিকন্তু, পর্যটন কর্মকা- মানুষকে আনন্দের জোগান দেয়, এবং অবকাশ যাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে। পর্যটনের মাধ্যমে এক দেশের মানুষ যেমন অপর দেশের মানুষকে জানতে পারে, তেমনি সাংস্কৃতিক-সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিও সৃষ্টি করতে পারে। ফলে প্রতিটি পর্যটন-গন্তব্যেই সরকার এবং পর্যটন ব্যবসায়ীরা এ শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দান করে তার উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি, ধরা হচ্ছে ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দঁাঁড়াবে ১৬০ কোটি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী দিনগুলোতে এই বিপুল সংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোতে। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরতে পারে তাহলে পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
বিকাশের সম্ভাবনা থাকলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের পর্যটন শিল্প ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় আয়ের ৭৫ শতাংশ, তাইওয়ানের ৬৫ শতাংশ, হংকংয়ের ৫৫ শতাংশ, ফিলিপাইনের ৫০ শতাংশ,
থাইল্যান্ডের ৩০ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। মালদ্বীপের অর্থনীতির বেশির ভাগই আসে পর্যটন খাত থেকে। এছাড়া মালয়েশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৭ শতাংশই আসে পর্যটন খাত থেকে। বাংলাদেশ বর্তমানে এই খাত থেকে প্রায় ৭৬ দশমিক ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বার্ষিক আয় করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতে পর্যটন খাত থেকে আয়ের পরিমাণ ১০,৭২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, মালদ্বীপে ৬০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, শ্রীলঙ্কায় ৩৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাকিস্তানে ২৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, এবং নেপালে এর পরিমাণ ১৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আশার খবর হচ্ছে, দেশ ঘুরে দেখার আগ্রহ বাড়ছে আমাদের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে। পড়াশোনা ও কাজের ফাঁকে এখন ছোট ছোট দলবেঁধে তারা দেশের বিভিন্ন পর্যটন ¯পটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পর্যটনে বাড়ছে নারীদের আগ্রহ। বিগত এক দশকে ঈদ বা এমন বড় ছুটিগুলোকে কেন্দ্র করে নাগরিকদের মধ্যে ভ্রমণ প্রবণতা নতুন আশাবাদ জাগাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, প্রতি ঈদে প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করে কক্সবাজার, যেখানে সারা বছর কক্সবাজার ভ্রমণে যায় ১৫ থেকে ২০ লাখ পর্যটক। ঈদকে কেন্দ্র করে বিশেষ পর্যটন স্থানগুলো ছাড়াও জেলা পর্যায়ে ভ্রমণে বিশেষ প্যাকেজ থাকলে ঈদ পর্যটনের আয় ও জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে। মনে রাখা প্রয়োজন, অভ্যন্তরীণ পর্যটন বিকশিত হতে থাকলে তা বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে দেশি পর্যটকদের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোয় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
পত্রপত্রিকায় ভ্রমণ ও পর্যটন সংক্রান্ত ফিচার/প্রতিবেদন লেখার ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রদান করে এ বিষয়ে লেখালেখিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এসবসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রকাশনাগুলো বিদেশি দূতাবাসগুলোকে দিতে হবে। পর্যটন শিল্পের প্রসারে ভ্রমণকেন্দ্রিক মানসম্মত ওয়েবসাইট ও পোর্টাল তৈরিতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। দক্ষ গাইডের অভাব দূর করতে ইংরেজিসহ নানা বিদেশি ভাষায় দক্ষ গাইড তৈরির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করতে হবে। সর্বোপরি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যটন শিল্পকে আগ্রাধিকার প্রদান, বাজেটে পর্যটন উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা সহজ করা, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে।
লেখক : উপপরিচালক
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, লালমনিরহাট
