বিরোধী ঐক্যের ছবি এখনো অস্পষ্ট

ফল দেখে জোটে মন দেবেন মায়া-মমতা-অখিলেশরা

আপডেট : ১৫ মে ২০১৯, ০২:২৬ এএম

সপ্তমীতেই সাঙ্গ হচ্ছে মাসাধিককালব্যাপী ভোট পর্ব। ১৯ মে সপ্তম তথা শেষ দফা ভোটের পর মাঝে মাত্র চারটে দিন। ২৩ মে ভোট গণনা। ফল প্রকাশের পর দিল্লির মসনদের টানে ভারতের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন চেহারা নেয়, তা নিয়ে এখন থেকেই চর্চা শুরু হয়ে গেছে পর্যবেক্ষক মহলে। নির্বাচন ঘোষণা ইস্তক ব্যাটল লাইনটা ছিল মোটামুটি স্পষ্ট, যার একদিকে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি এবং অন্য পারে দেশের তামাম বিরোধী শক্তি। তবে পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সংসদীয় গণিতের চেহারাটা স্পষ্ট হলে এযাবৎ সুস্পষ্ট বিভাজনরেখাও এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। নিজের প্রকৃত শক্তি বুঝে নেবার পর পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে সে হবে রাজনৈতিক যুদ্ধের আরেক পর্ব।

মোদি জমানা যে দেশের ভবিষ্যতের জন্য হিতকর নয়, এ কথা একবাক্যে মেনে নিয়েও বিরোধী দলগুলো সেভাবে একজোট হতে পারেনি। দেশের হেভিওয়েট বিরোধী নেতৃবৃন্দ দফায় দফায় নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন, মোদি-বিরোধিতায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শামিল হয়েছেন এক মঞ্চে, তবু নির্বাচন পর্বের এই অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছেও বিরোধী ঐক্যের চেহারাটা এখনো অস্পষ্ট। সম্ভাব্য বিকল্প সরকারের ফর্মুলাটাও আখেরে কী দাঁড়াবে, তা ধোঁয়াশায় ঢাকা। এই অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে এখন থেকেই। ফল প্রকাশ পর্যন্ত স্কোরবোর্ডের দিয়ে তাকিয়ে নিশ্চেষ্ট বসে থাকার পক্ষপাতী নয় কংগ্রেসসহ বিরোধীদের একাংশ। মূলত অন্ধপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তথা টিডিপি নেতা চন্দ্রবাবু নাইডুর পরামর্শে ভোট পর্ব মিটে যাবার পর আগামী ২১ মে দেশের ২১টি বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বৈঠকের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস। উদ্দেশ্য, নিজেদের মধ্যে একপ্রস্থ আলোচনা সেরে নিয়ে একটা ন্যূনতম অভিন্ন কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করা এবং সবাই মিলে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের কাছে দরবার করা, যাতে একক গরিষ্ঠতার নিরিখে কোনো দলকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার গড়ার জন্য প্রথম আমন্ত্রণ জানানো না হয়। বলা বাহুল্য, উদ্দেশ্যটা হলো বিজেপে ঠেকানো। কেননা বিজেপি একা সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও একক বৃহত্তম দলের জায়গাটা ধরে রাখতে পারবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে যাতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি মান্যতা দেন, সেটাই আগাম সুনিশ্চিত করে রাখতে চান রাহুল গান্ধী-চন্দ্রবাবু নাইডুরা। কলকাতায় এসে প্রচার পর্বের ফাঁকে এ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথাও বলে গেছেন চন্দ্রবাবু।

কিন্তু বিশ^স্ত সূত্রের খবর, ২১শের বৈঠকে যাচ্ছেন না মমতা। শুধু তিনিই নন, কংগ্রেসের উদ্যোগে এহেন কুচকাওয়াজ থেকে আপাতত নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখাই শ্রেয় মনে করছেন উত্তরপ্রদেশের সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং বিএসপি নেত্রী মায়াবতী। সূত্রের খবর, ভোটের ফল না দেখে নিজেদের তাস এখনই টেবিলে ফেলতে নারাজ মায়া-মমতা-অখিলেশরা। বস্তুত, বিরোধী শিবিরের এই পরস্পরবিরোধিতাকে বিজেপি ভোটের প্রচারে বারবার তাদের অস্ত্র করে তুলেছে। কটাক্ষ করে বলা হয়েছে, ‘মহা মিলাবটি জোটের’ প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? রাহুল থেকে মমতা সকলেই কিন্তু এ প্রশ্নের জবাবে এত দিন বলে এসেছেন, তাদের প্রথম লক্ষ্য মোদিকে হটানো। প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রশ্ন পরে ভাবা যাবে। এবার সেই সম্ভাব্য মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত, প্রধানমন্ত্রী স্থির করার কঠিন রাজনৈতিক অঙ্কের একটা সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান বার করা।

তবে দিল্লির কুর্সির প্রত্যাশায় বুক বেঁধে মায়াবতী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল স্বাভাবিক কারণেই দেখে নিতে চাইছেন ভোট গণনার পর চূড়ান্ত অঙ্কের ভারসাম্যটা কী দাঁড়ায়। বাংলার ৪২টি আসনের মধ্যে ২০১৪-র নির্বাচনে দেশজুড়ে প্রবল মোদি-হাওয়া সত্ত্বেও মমতার তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৪ আসন। এবার নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। দেশে মোদি-হাওয়া তো নেই-ই ভোট টানতে মোদিকে রীতিমতো কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। তবু এই বাংলায় মমতাকে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মোদির দলই। মমতা ৪২-এ ৪২ চাই বলে আওয়াজ তুললেও গতবারের ৩৪-এর কতগুলো ধরে রাখা যাবে তা নিয়ে সন্দিহান তৃণমূলই। অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশে অখিলেশের দল গত নির্বাচনে সাকল্যে পেয়েছিল পাঁচটি আসন। রাজ্যের ৮০টি আসনের একটিতেও জিতে পারেনি মায়াবতীর বিএসপি। এবার অবশ্য এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল জোট বেঁধে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে বিজেপির দিকে।

এই কারণে ভোটের ফল দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চাইছেন তারা। গত নির্বাচনে মাত্র ৪৪ আসন পেয়ে কোণঠাসা কংগ্রেস শেষ পর্যন্ত কতটুকু ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সেদিকেও নজর রয়েছে বিরোধী শিবিরের অবশিষ্ট দলগুলোর। কংগ্রেস ভালো ফল করলেও রাহুল গান্ধী পরবর্তী সরকারের নেতৃত্বে কতটুকু সর্বজনগ্রাহ্য হবেন, সেই জল মাপার কাজও চলছে সমান্তরালভাবে। এক কথায়, ফল দেখেই দল পাকানোর কাজটা করতে চান মায়া-মমতা-অখিলেশ।

এদিনও মমতা জোর গলায় বলেছেন, বিজেপি গতবারের ২৮২ আসন তো দূর অস্ত, দেড়শোর বেশি উঠতে পারবে না এবার। একার পক্ষে বিজেপির সরকার গঠন যে সম্ভব হবে না, তা মুখ ফসকে  ইতিমধ্যে বলে ফেলেছেন দলের তাত্ত্বিক নেতা রাম মাধব। এনডিএর অন্যান্য শরিককে নিয়েও সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় গরিষ্ঠতা জোটাতে না পারলে বিজেপি যে বিরোধী জোটের ঘর ভাঙার জন্যও হাত বাড়াবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে মোদি-বিদায়ের মন্ত্রে যদি আন্তরিক হন বিরোধী নেতারা, তাহলে তাদের সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ থাকতেই হবে। পা ফেলতে হবে একসঙ্গে, গলা মেলাতে হবে একসঙ্গে। সেটা সম্ভব হবে কি না, তা বোঝা যাবে ২৩শের পর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত