১৪ ব্যাংক তারল্য সংকটে

আপডেট : ১৫ মে ২০১৯, ১১:১৯ পিএম

আর্থিক খাতে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরও সংকট কাটছে না। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটের মধ্যে রয়েছে। যদিও এক বছরের ব্যবধানে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ১৮টি তারল্য সংকটে ছিল। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

এদিকে ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে থাকলেও অধিকাংশ ব্যাংকের প্রান্তিক মুনাফা বাড়তে দেখা গেছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ২২টির মুনাফা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে ৮টি ব্যাংকের মুনাফা ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় কমেছে। ২০১৭ ও ১৮ সালে আমানতের তুলনায় আগ্রাসী ঋণ বিতরণ করায় চলতি প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি বছরে কয়েকটি ব্যাংক তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠলেও নতুন করে তিনটি ব্যাংক নগদ টাকার টানাটানিতে পড়েছে। আবার রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নগদ অর্থের সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো হচ্ছেÑ এবি, ন্যাশনাল, সোশ্যাল ইসলামী, ট্রাস্ট, সিটি, এক্সিম, আইএফআইসি, যমুনা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এনসিসি, রূপালী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, উত্তরা ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। এর মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, এনসিসি ও আইএফআইসি ব্যাংক এবার নতুন করে নগদ অর্থের সংকটে পড়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে এ ব্যাংকগুলোর তারল্য প্রবাহ ইতিবাচক ছিল। বিপরীতে ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা, আল-আরাফাহ, আইসিবি ইসলামিক, ইসলামী, পূবালী ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক নগদ অর্থের সংকট অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।

মূলত আমানতের বিপরীতে বেশি ঋণ দেওয়ায় ২০১৭ সালের শেষার্ধ থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। ২০১৮ সালে আমানত ও ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্তে তারল্য প্রবাহে আরও বড় সংকট তৈরি হয়। আমদানি-রপ্তানির  ব্যয় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার কারণেও নগদ অর্থের সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে। আমানতের সুদহার কম থাকায় ব্যাংকের পরিবর্তে সঞ্চয়পত্রে ঝোঁক বাড়তে থাকে। সরকার গড়ে ১১ শতাংশ সুদে চলতি অর্থবছরের আট মাসে (জুলাই- ফেব্রুয়ারি) ৩৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এমন পরিস্থিতিতে আমানত আনতে অধিকাংশ ব্যাংক নির্ধারিত সুদহারের বেশি দেওয়ার প্রস্তাব করে। ফলে আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের পরিবর্তে ১১ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের তারল্য সংকট কাটাতে গত এক বছর ধরেই ব্যাংক মালিকদের সংগঠন ও সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। তারল্য চাহিদা মেটাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের ৫০ শতাংশ বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত হিসেবে জমা রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ব্যাংকগুলোর ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) কমানো হয়। আর আমানতের বিপরীতে বেশি ঋণ বিতরণ করা ব্যাংকগুলোকে এডিআর সমন্বয়ের সময়সীমা একাধিকবার বাড়ানো হয়। তবে এত কিছুর পরও অনেক ব্যাংকই নগদ টাকার সংকটে রয়ে গেছে। অনেক ব্যাংকই চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতে পারছে না।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের তারল্য সংকট এক বছরের ব্যবধানে আরও বেড়েছে। ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে এ ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ ছিল ঋণাত্মক ৩২ টাকা ১১ পয়সা। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এ সংকট আরও তীব্র হয়ে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ৭৯ টাকা ৫১ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলতি প্রথম প্রান্তিকে উত্তরা ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ হচ্ছে ঋণাত্মক ১৮ টাকা ৯৬ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ঋণাত্মক ৩ টাকা ৭ পয়সা। এ ছাড়া ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ ১ টাকা ৮৮ পয়সা থাকলেও চলতি প্রথম প্রান্তিকে ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় তারল্য সংকট বেড়েছে যমুনা, সিটি, আইএফআইসি ও ট্রাস্ট ব্যাংকের।

এদিকে তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠেছে ইসলামী ব্যাংক। ২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক থাকলে চলতি প্রথম প্রান্তিকে তা ১৫ টাকা ৫২ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। তবে শেয়ারপ্রতি নিট নগদ প্রবাহে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক। এ ছাড়া ঢাকা ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের তারল্য প্রবাহে উন্নতি দেখা গেছে।

তবে তারল্য সংকটে থাকলেও তালিকাভুক্ত ৭৩ শতাংশ ব্যাংকের মুনাফা চলতি প্রথম প্রান্তিকে বেড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা বেড়েছে সিটি, ইস্টার্ন, উত্তরা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, যমুনা, শাহজালাল ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের। বিপরীতে এবি, মার্কেন্টাইল, ওয়ান ও সাউথইস্ট ব্যাংকের মুনাফা সবচেয়ে বেশি কমেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত