এই মাসে দান আল্লাহর প্রিয়

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ০১:১৪ এএম

দেখতে দেখতে রমজানুল মোবারকের রহমতের প্রথম দশক শেষ হয়ে এলো। আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে বরকতের দশক, রমজানের দ্বিতীয় দশক। এভাবেই আমাদের জীবন থেকে আরেকটি রমজান গত হয়ে যাবে। আমরা জানি না কে কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি এই দশক থেকে। তবে হাল ছাড়লে চলবে না। আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া বরকতময় দশকে আরও বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি করে পেছনের ঘাটতি পূরণের জন্য সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রোজা হলো ইবাদত-বন্দেগির শহরে

প্রবেশের দরজা। হজরত রাসূলুল্লাহর (সা.) ভাষায়, ‘সবকিছুর জন্য একটি দরজা রয়েছে, আর ইবাদতের দরজা হলো রোজা।’ তাই রোজার বাকি দিনগুলো আমরা যেন যথাসাধ্য ইবাদত-বন্দেগি, কোরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ এবং জিকির-আজকারে মশগুল থেকে ইবাদতের শহরে প্রবেশ করতে পারিÑ সেই দোয়া হোক পরস্পরের জন্য।

রহমত বরকত আর নাজাতের মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। শেষ হয়ে যাচ্ছে কোরআনের বসন্তকাল, গোনাহ থেকে মুক্তি লাভের সুবর্ণ সময়। শেষ হয়ে যাচ্ছে একসঙ্গে ইফতার করা, তারাবির নামাজ আদায় করা এবং ভোররাতে সাহরির ব্যতিক্রমী আনন্দের দিন। অবহেলিত আর বঞ্চিত দরিদ্র শ্রেণির মানুষ পুরো রমজান মাসজুড়ে ছিল বৈষম্যহীন এক সমাজের নাগরিক। যে সমাজের কথা ছিল ধনীরা থাকবে হাতখোলা দানবীর, পাড়া-প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনের ব্যাপারে থাকবে দায়িত্বশীল। তো এই দায়িত্বশীলতার পরিচয় আমরা কতটুকু দিতে পেরেছি সে হিসাব নিজে নিজেই কষে নেওয়া দরকার। এখনো কটা দিন সময় আছে, সুযোগ আছে দায়িত্ব পালন করার। দান-খয়রাত করার, গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়াবার, এতিম-মিসকিনদের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেওয়ার এবং তাদের পুনর্বাসিত করার।

বঞ্চিতদের দিকে হাত বাড়ালে আল্লাহতায়ালাও আপনার দিকে রহমতের হাত বাড়িয়ে দেবেন, এটা আল্লাহতায়ালার প্রতিশ্রুতি। গরিবদের দান-খয়রাত করা কোনো করুণার ব্যাপার নয়, বরং দান হলো নিজের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করার সর্বোত্তম উপায়। মনে রাখতে হবে, গরিবদের সম্পদহীন করে আল্লাহ যেমন তাদের পরীক্ষা করেন, তেমনি ধনীদেরও ধন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহ পরীক্ষা করেন। পূত-পবিত্র নিয়তে এবং দায়িত্ব মনে করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যদি দান করা হয়, তাহলে তার ব্যাপক ফজিলত রয়েছে। এসব ফজিলতের কিছুটা পার্থিব এই পৃথিবীতেও লক্ষ করা যায়। তবে বেশিরভাগ ফজিলতই পরবর্তী জীবনের পাথেয় হিসেবে জমা থাকে। এ ছাড়া এজন্য আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পাবেন দানকারীরা। এ কারণেই দয়াময় আল্লাহ কোরআনে কারিমে দান-খয়রাতের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে দানের ব্যাপারে নিয়তের স্বচ্ছতার কথা বলেছেন।

দান করার কিছু নীতিমালা আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে ঘোষণা করেছেন। যেমন, দান করতে হবে শুধু আল্লাহতায়ালার জন্য, কাউকে দেখানোর জন্য নয়। দান-খয়রাত করে ভবিষ্যতে কোনো স্বার্থ হাসিলের নিয়ত করা যাবে না। আত্মপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যকৃত দানকে নিকৃষ্টতম দান বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে ইসলামে। এ ছাড়া যাকে দান করা হলো তার কাছ থেকে এর বিনিময়ে কোনো সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করা যাবে না। আসলে দান হলো ব্যক্তিচরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। কার ভেতরটা কেমন, তা ফুটে ওঠে দানের মাধ্যমে। মুমিন ব্যক্তির গুণাবলির একটি হলো দান করা।

অনেকেই আছেন, সম্পদের বর্জনীয় কিছু অংশ দান করে বাহবা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধরা যাক, আপনার গাছ থেকে প্রচুর আম পেড়ে সেগুলোকে আপনি কোথাও রেখে দিলেন আস্তে আস্তে খাবেন বলে। কদিন পর দেখা গেল সেগুলো পচন ধরছে। আপনি সেখান থেকে ভালো আমগুলো বেছে নিজের কাছে রেখে দিয়ে খারাপ আমগুলো দান করে দিলেন। আপনার এই দান আল্লাহর কাছে কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা আল্লাহতায়ালা বলেছেনÑ ব্যয় করতে হবে প্রিয় বস্তু, অপ্রিয় বস্তু নয়। সূরা আল ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা যতক্ষণ না তোমাদের প্রিয়বস্তু দান করবে, ততক্ষণ তোমরা পূর্ণ সওয়াব পাবে না। তোমরা যা-কিছুই ব্যয় করবে, আল্লাহ সে সম্পর্কে ভালো করেই জানেন।’

আল্লাহতায়ালা বলেছেন, যারা আন্তরিকতার সঙ্গে একমাত্র তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দান-খয়রাত করে এবং দান করার পর খোঁটা দেয় না, তাদের পুরস্কার আল্লাহর কাছে সুরক্ষিত আছে। আর আল্লাহর কাছে বান্দার কোনো কিছু সুরক্ষিত থাকা মানে তার তো আর দুশ্চিন্তার কোনো কারণই থাকতে পারে না।

আল্লাহতায়ালা বলেছেন, দানকারীর পুরস্কার আল্লাহর কাছে সুরক্ষিত থাকবে। ফলে যারা সঠিকভাবে দান করে তারা যেন কোনো রকম দুশ্চিন্তা না করে। এর আরেকটি ব্যাখ্যা অনেকে করেছেন, তা হলো আল্লাহর রাস্তায় দান করলে তাদের ফকির হবার কোনো আশঙ্কা নেই। কোরআনে কারিমে বর্ণিত আয়াতে এই সত্যের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে। বরকতময় রমজানে আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি করে মানুষের সেবা করার নিমিত্তে দান-খয়রাত করার তাওফিক দান করুন।

 

লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত