‘কী খাই খবর রাখে না কেউ’

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ০২:৫১ এএম

রাজধানী ঢাকার থ্রি স্টার, ফাইভ স্টার হোটেলে চলছে বাহারি ইফতারির আয়োজন। অন্যদিকে কিছু না পেয়ে ভাত কিংবা চিড়া ভিজিয়ে ইফতার করছেন কেউ কেউ। এক কথায় আলোর নিচে অন্ধকার। আশপাশে বিশাল অট্টালিকায় যখন চলছে হরেক রকম ইফতারের আয়োজন, ঠিক তখন মগবাজারের রেললাইনের পাশে বস্তিবাসী ইফতার করছেন বাসি ভাত দিয়ে। কেউ আবার ইফতার করছেন চিড়া ভিজিয়ে তার সঙ্গে লবণ মিশিয়ে। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেটের বস্তিতে সরেজমিন ইফতার আয়োজনের খোঁজখবর নিতে গিয়ে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বস্তিবাসীদের একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় রাজনীতিবিদরা আমাদের কোনো খোঁজখবর রাখেন না। আশপাশের বিশাল অট্টালিকায় যারা থাকেন তারা কখনো খোঁজখবর রাখেন না। সরকারের পক্ষ থেকেও রোজা উপলক্ষে কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। অসহায় দরিদ্র মানুষের পাশে কেউ নেই। আমরা কী খাই তার কোনো খবর কেউ রাখে না। মানুষ কেমন যেন হয়ে গেছে। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। অন্যের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই তাদের। অসহায় দরিদ্র মানুষগুলোকে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য কেউ নেই।’

বস্তিতে ওয়াসার সাপ্লাইয়ের যে পানি আসে তা সব সময় খাওয়া যায় না। অন্য কোনো উপায় না থাকায় সেই পানিই তাদের খেতে হয়।  বস্তিবাসীর অধিকাংশেরই ছেলে-মেয়েদের নিজেদের      সঙ্গে রাখার সাধ্য নেই। তাদের সন্তানরা গ্রামের বাড়িতেই থাকেন তাদের বাবা-মায়েদের কাছে।’

বস্তির বাসিন্দা মো. বাবুল। পেশায় রিকশাচালক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার জন্ম হয়েছে এই বস্তিতে। তখন থেকে এই বস্তিতেই আছেন। তার স্ত্রী কুলসুম। আশপাশে বিভিন্ন বাসায় ঠিকায় কাজ করেন। দুই ছেলে এবং এক মেয়ে তাদের। তাদের দুজনের আয়ে সংসার কুলায় না। তাই ছেলে-মেয়েদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে রেখে এসেছেন।

রোজা আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, রিকশা চালিয়ে এই গরমে রোজা রাখা মুশকিল। তাই রোজা থাকেন না। শরীরে কুলায় না। সব সময় রিকশা চালাতে পারেন না। শরীরে যতটুকু কুলায় ততক্ষণ রিকশা চালান। দিনে ৫শ-৬শ টাকা কামান। তার স্ত্রী রোজা থাকেন। সাহরিতে কী খেয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশিরভাগ সময় ডাল, আলু ভর্তা দিয়ে সাহরি খান। ইফতারি করেন যখন যা পান তাই দিয়ে। কখনো কখনো বাসি ভাত দিয়ে ইফতার করেন।

স্থানীয় রাজনীতিবিদরা কোনো খোঁজখবর রাখেন কি না জানতে চাইলে বাবুল বলেন, আশপাশে বিশাল অট্টালিকা রয়েছে। তাদের কেউ খোঁজখবর রাখেন না। কোনো রাজনীতিবিদও কখনো জানতে চাননি তারা কীভাবে রোজা রাখছেন কিংবা সাহরি ও ইফতারিতে কী খাচ্ছেন।

বস্তিবাসী সখিনা খাতুন। তিনি বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। স্বামী ভ্যান চালান। একটা মাত্র মেয়ে লাকী (১১)। মেয়েটি স্কুলে পড়ে। রোজা রাখেন কি না জানতে চাইলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোজা রাখেন তিনি। গত রাতে সাহরিতে কী খেয়েছেন জানতে চাইলে বলেন, সাহরিতে তেলাপিয়া মাছ দিয়ে ভাত খেয়ে রোজা রেখেছেন। ইফতার কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘরে যা আছে তা দিয়ে ইফতার করবেন। বাসার ভেতরে তাকিয়ে কোনো আয়োজন দেখা যায়নি।

আরেক বস্তিবাসী রতন। ভ্যানগাড়ি চালান তিনি। ২০০৯ সাল থেকে মগবাজারের এই বস্তিতে থাকেন। তার তিন ছেলে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ছেলে-মেয়েরা কেউ লেখাপড়া করে না। করানোর মতো সামর্থ্য নেই। বস্তিতে যে ছোট্ট রুমটিতে থাকেন তার ভাড়া ১৫শ টাকা। এ ছাড়া পানি ও বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় এক হাজার টাকা। এগুলো দেওয়ার পর টাকা খুব একটা থাকে না।

রোজা থাকেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোজা রাখা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ভ্যানগাড়ি চালাতে অনেক পরিশ্রম।

এলাকার রাজনীতিবিদরা কোনো খোঁজখবর রাখেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ খোঁজ রাখে না। কেউ জানতে চায় না। কেউ কারও খবর রাখে না। আসলে গরিবের খোঁজ কেউ রাখে না।

বস্তিবাসী সফুরা। বয়স ৩৫। কী করেন জানতে চাইলে বলেন, বাসা-বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। স্বামী আছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আছে। তবে তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। কারণ তার পা ভাঙা।

রোজা রাখেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোজা রাখেন। সাহরিতে কী খেয়েছেন জানতে চাইলে বলেন, ডাল-ভাত-লাউশাক। ইফতারিতে কী খাবেন জানতে চাইলে সফুরা বলেন, দোকান থেকে কিছু কিনে এনে খাব। চাল, ডাল, শাক, সবজি ও ফলের যা দাম তা কেনাই মুশকিল। যেসব বাসাবাড়িতে কাজ করেন তারা অনেক সময় কিছু দেন তা দিয়ে ইফতার করেন। তাছাড়া ইফতারের পর আবার বাসাবাড়িতে কাজ করতে যান তখন তারা কিছু দিলে তাই দিয়ে খান।

আরেক বস্তিবাসী রাবিয়া। বয়স ৩৫ বছর। তার স্বামী মারা গেছেন। তিনি মাটির কাজ করতেন। এক ছেলে ও এক মেয়ে তার। মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেটা স্কুলে পড়ে। রাবিয়া জানান, সাহরিতে ভাত-শাক খেয়েছেন। ইফতারিতে বাসি ভাত খাবেন। ইফতারির পর কাজে যাবেন। তারা কিছু দিলে তা খাবেন।

আরেক বস্তিবাসী আল আমিন। গলায় ঝুলিয়ে পান-সিগারেট বিক্রি করেন। এতে যা আয় হয় তা সবই ব্যয় হয়ে যায়। তার স্ত্রী বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। দুই ছেলে তাদের। ইয়াসির (৯) ও তাসির (২)। বড় ছেলে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ থাকেন। রোজা রাখেন কি না জানতে চাইলে আল আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতে পান-সিগারেট বিক্রি করি হেঁটে হেঁটে। হোটেলে সাহরি খাইতে হয় মাঝে মধ্যে। তখন ৮০/১০০ টাকা লেগে যায়। ইফতারি সেই অর্থে কিছু খাওয়া হয় না। হাতের কাছে যা পাই তাই খাই। মাঝে মাঝে দোকান থেকে কিনে খাই। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত