অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন

আপডেট : ১৬ মে ২০১৯, ১১:০১ পিএম

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মূল্যবোধ ও নৈতিকতার কারণে মানুষ অন্য প্রাণী থেকে আলাদা। রীতিনীতি, মনোভাব এবং সমাজ অনুমোদিত আচার-আচরণের সমন্বয়ে মূল্যবোধ সৃষ্টি হয়। যেসব ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, সংকল্প মানুষের আচার-আচরণ এবং কর্মকা-কে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলোর সমষ্টিই হলো মূল্যবোধ। মূল্যবোধের অবনতি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, যা সামাজিক অসংগতির মূল কারণ। সুতরাং মূল্যবোধকে মানুষ থেকে পৃথক করলে তার মধ্যে জীবের বৈশিষ্ট্য থাকবে বটে কিন্তু মনুষ্য কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে না। মূল্যবোধ এবং মনুষ্যত্ব একটি অপরটির পরিপূরক। যার মূল্যবোধ নেই তার মনুষ্যত্বও নেই।

মানুষের কৌতূহলী মন ‘না’ শুনতে অভ্যস্ত নয়। যে কারণে মানুষ কৌতূহলবশত কিংবা প্রয়োজনে নতুবা অসচেতনতাবশত আইন অমান্য করতে শুরু করে। সে থেকেই অপরাধের জন্ম। যার চলন আজও বহমান এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মানবসমাজ সৃষ্টির পর থেকে, এমন কোনো সমাজ ছিল না কিংবা বর্তমানেও নেই যেখানে অপরাধ নেই। সমাজ, সংস্কৃতি, জাতি, ভূখন্ড ইত্যাদির আলোকে অপরাধের ভিন্নতা ছিল। অপরাধমুক্ত সমাজ কোনো কালে ছিল না। প্রত্যেকটি সমাজ অপরাধকে তাদের নিজের মতো করে চিহ্নিত করে। দেখা যায় একটি কাজ কোনো সমাজে অপরাধ নয় কিন্তু সে কাজটিই অন্য আরেকটি সমাজে অপরাধ।

তবে সাধারণত অপরাধ বলতে বোঝায়, ধর্মীয় বিধান অবমাননা ও রাষ্ট্রীয় আইন অমান্য করাকে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো কাজ করে যার ফলে ধর্মের বিধান কিংবা রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন হয় এবং ওই কাজের জন্য ধর্ম কিংবা রাষ্ট্র ওই ব্যক্তির শাস্তির বিধান রাখে, তখন কাজটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। সমাজকে সুন্দরভাবে গড়তে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন, সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখা। অপরাধীরা তো এই সমাজেরই বাসিন্দা। সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে একজন মানুষ সহজেই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে আবার সমাজের কারণেই একজন অপরাধী অপরাধ থেকে নিজকে মুক্ত করে বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। অর্থাৎ ব্যক্তি অথবা সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখার জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতাই সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এ দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ যাদের বয়স ১৫-৩৫ বছরের মধ্যে। অপরাধের সঙ্গে এ অংশেরই সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। ইভটিজিং, নারী নির্যাতন, ছিনতাই, খুন, মাদক পাচার-সেবন ইত্যাদি অপরাধগুলোতে এ বয়সী মানুষেরাই যুক্ত হয়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এসব অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সমাজ ও পরিবেশ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। কোনো সমাজে যদি অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায় সে সমাজের নতুন প্রজন্মেরও অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। কারণ তারা তাদের চারপাশের অনৈতিক কর্মকা-গুলোকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখে। ফলে তারা নিজেদের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। তবে এটা সত্য, সমাজের সব মানুষ অপরাধী নয়। ন্যূনতম সংখ্যায় হলেও কিছু সুস্থবোধসম্পন্ন মানুষ থাকে, যারা সমাজের কল্যাণকামী। এ কল্যাণকামী মানুষদের প্রচেষ্টার ফলে সমাজ থেকে অপরাধের হার অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সামাজিক প্রেক্ষাপট যেমন অপরাধ নির্মূল এবং অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করে, তেমনিভাবে অপরাধ সংঘটনে বা নির্মূলে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সমাজে মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। কারণ, পরিবার হলো পৃথিবীর আদি শিক্ষালয়। ইসলামি সমাজে পরিবার প্রথাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবার থেকেই একজন মানুষের মূল্যবোধের ধারণা লাভ হয়; তার ব্যক্তিত্বের গঠন হয়। পরিবারের শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। কারণ ধর্মচর্চা মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চেতনা সৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ধর্ম শিক্ষার প্রকৃত রূপ আমাদের সমাজে অনুপস্থিত। বরং খ-িত এবং অনেকক্ষেত্রে বিকৃত রূপে ধর্মকে আমরা দেখতে পাই। ফলে পরস্পরবিরোধী চেতনাধারী হয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। তারা বড় হয়ে দেখতে পায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনকারী একটি সমাজ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে; তখন ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পর্কে তারা বিরূপ ধারণা নিয়ে বিকশিত হবে এটিই স্বাভাবিক।

ধর্মকে এখন আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব একটি বিষয়ে পরিণত করা হচ্ছে অনেকাংশে। অথচ ধর্ম বিশেষ করে ইসলাম শুধু এমন আনুষ্ঠানিকতার নাম নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক এবং অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে একমাত্র ধর্ম। কিন্তু আমাদের সমাজ ধর্মের এই সহজাত রূপকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে আমরা দেখতে পাই সাধারণ মানুষের কথা দূরে থাকুক শিক্ষিত সমাজের একটি বিরাট অংশের চরম অনৈতিক কর্মকান্ড। মূল্যবোধহীনতার অবাধচর্চা তাদের নির্লজ্জ-বেহায়া বানিয়েছে। যার কারণে প্রকাশ্যে দায়িত্বে অবহেলা, ঘুষ-চাঁদাবাজি, একে অপরের অধিকার হরণকে এখন আর অপরাধ মনে হয় না তাদের কাছে। শিক্ষিতদের একটি অংশের কর্মকা- যেন সে কথারই প্রমাণ বহন করে। অথচ এটা কাম্য নয়।

লেখক : মুফতি, শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত