খেলাপি ঋণ আদায়ে আন্তরিক হোন

আপডেট : ১৭ মে ২০১৯, ১০:৫৫ পিএম

ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যার মধ্যে উচ্চ খেলাপি ঋণকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বলা হচ্ছে, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির উল্লেখযোগ্য কারণ। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। এ অবস্থায় খেলাপি ঋণের লাগাম টানা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিগত সময়ে দেখা গেছে, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ঋণ পুনঃ তফসিল, ঋণ অবলোপন ইত্যাদি কৌশলে ঋণ খেলাপির দায় থেকে মুক্ত থেকেছেন। বোধগম্য কারণেই এতে খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান আসেনি, বরং তা ঋণ আদায় প্রক্রিয়াকে আরও প্রলম্বিত করেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ব্যাংকিং খাতে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত আদায়-অযোগ্য খেলাপি বা কুঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকায়। গত এক বছরে এ ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ১৬ হাজার ৭৮ কোটি টাকা। ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা।

নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়ে দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন নতুন পরিকল্পনার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন খেলাপি ঋণ যাতে না বাড়ে সে ব্যবস্থা নেবেন এবং যে পরিমাণ ঋণ খেলাপি হয়ে আছে তা আদায় করার উদ্যোগ নেবেন। তার প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি। বরং ঋণখেলাপিদের জন্য ছাড়ের যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল তা গত বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা ‘ঋণ পুনঃ তফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’র মাধ্যমে সত্যি হলো। এতে ভালো ঋণগ্রহীতারা আরও অনুৎসাহিত হয়ে পড়বেন।

ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম খালেদ বলছেন ‘এই নীতিমালার কারণে ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিমালায় ভালো ঋণগ্রহীতাদের ১০ শতাংশ রেয়াত দেওয়ার কথা বলা হলেও এর বিপরীতে ঋণখেলাপিদের যে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে তা এই উদ্যোগকে ম্লান করে দেবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ কারণে ঋণখেলাপিদের চেয়ে বেশি হারে সুদ পরিশোধ করতে হবে নিয়মিত গ্রাহকদের। এখন নিয়মিত গ্রাহকদের ঋণের বিপরীতে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হচ্ছে। কোনো ঋণ খেলাপি হলে তাতে পুনঃ তফসিল-সুবিধা পেতে ১০ শতাংশ অর্থ এককালীন পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে। এ কারণে বেশি পরিমাণে ঋণ খেলাপি করতে খেলাপিরা উৎসাহিত হবেনÑ এ আশঙ্কা থেকেই যায়। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন কতিপয় ব্যক্তির রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছে, যা কখনোই কাম্য নয়।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও বাংলাদেশ ব্যাংক অ্যাসোসিয়েশন বা বিএবির প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ব্যাংকের সুদের হার এক অঙ্কে নামানো সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশিত ছিল। ঋণপ্রবাহের গতি ও বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার এক অঙ্কে নামানোর ব্যাপারে নীতিনির্ধারকরা উৎসাহী ছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ দৃশ্যমান হচ্ছে না। উপরন্তু, নতুন নীতিমালায় ঋণখেলাপিদের জন্য সুদের হার এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার নির্দেশনা এসেছে। অতীতে দেখা গেছে বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধাসহ খেলাপিদের নানা সুবিধা দেওয়া হলেও ঋণ পরিশোধ না করে তারা আবারও খেলাপি হয়েছে। তাই নতুন করে দেওয়া এই সুবিধায় খেলাপি ঋণ কমবে না সে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ দেখছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়ে গেছে। নতুন নীতমালার কারণে আর্থিক খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না তাও ভেবে দেখা প্রয়োজন।

খেলাপি ঋণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। এজন্য সবার আগে দরকার ব্যাংকিং খাতকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করা। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে। এ অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি ও নজরদারি বৃদ্ধির বিকল্প নেই। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। খেলাপি ঋণের বিস্তার রোধে এবং অনাদায়ি ঋণ আদায়ে কার্যকর ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এটাই এখনকার প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত