প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর নেতৃত্বাধীন সরকারকে হটাতে ভেনেজুয়েলায় কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ চলছে। দেশটির পার্লামেন্টের বিরোধী দলের নেতা হুয়ান গুইদোর নেতৃত্বে চলা এ বিক্ষোভের মধ্যে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কিছু কর্মকর্তা পক্ষত্যাগ করলেও বাকিদের সমর্থনে মসনদ ধরে রেখেছেন মাদুরো। গুইদোর প্রতি পশ্চিমা প্রভাবশালী কিছু দেশের সমর্থন ও মাদুরোকে দেওয়া রুশ সমর্থনে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। এমন বাস্তবতায় ভেনেজুয়েলায় কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। সংবাদ মাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়,
রবার্ট মুগাবের অধীনে জিম্বাবুয়ের পতন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ১৯৯০-এর দশকে কিউবার সর্বনাশা পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির ভেঙে পড়া। অর্থনীতিবিদদের মতে, অন্তত ৪৫ বছরের মধ্যে যুদ্ধ ছাড়া সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধসে আছে ভেনেজুয়েলা। এ বিষয়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মুখ্য অর্থনীতিবিদ কেনেথ রগফ বলেন, ‘গৃহযুদ্ধের বাইরে এই মাপের মানবিক বিপর্যয়ের কথা ভাবাও যায় না।’
একই পর্যায়ের অর্থনৈতিক বিপর্যয় খুঁজতে আইএমএফের অর্থনীতিবিদরা কিছু দেশকে বেছে নেন, যেগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত। এর মধ্যে আগের দশকে বিধ্বস্ত লিবিয়া কিংবা ১৯৭০-এর দশকের লেবানন রয়েছে। কিন্তু ওই দেশগুলোর মতো একসময়ের লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশ ভেনেজুয়েলা সশস্ত্র সংঘাতে বিধ্বস্ত হয়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার পূর্বসূরি হুগো শাভেজের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও ভ্রান্তনীতি দেশটিকে মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যবসা সংকোচনের মতো সমস্যায় জর্জরিত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের আরোপ করা কঠোর নিষেধাজ্ঞা এ সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করেছে।
অর্থনৈতিক পতনের সঙ্গে সঙ্গে ভেনেজুয়েলার কিছু শহরের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। দেশটিতে সরকারি সেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বেশির ভাগ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে, তারা মাসে মাত্র কয়েক কেজি ময়দা কিনতে পারছেন। বিভিন্ন বাজারে কসাইরা নিয়মিত লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছে। সূর্যাস্তের মধ্যে পচা মাংস বিক্রি করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। একসময়কার শ্রমিকরা আবর্জনার স্তূপে গিয়ে খাবার ও পুনঃব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক খুঁজছেন। বিমর্ষ খুচরা বিক্রেতারা কিছু পাউন্ড আমানত রাখতে ব্যাংকগুলোর কাছে বারবার ধরনা দিচ্ছে।
বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে অঞ্চলটির একটি ম্যারাকাইবো। কলম্বিয়া সীমান্তবর্তী ২০ লাখ বাসিন্দার এ শহরের প্রায় সব কসাই মাংসের টুকরা বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন। এর পরিবর্তে তারা চর্বি, গরুর পায়া বিক্রি করা শুরু করেছেন। শহরটির বাসিন্দারা এখন এগুলোই কিনতে পারছে। চলমান এ সংকট জটিল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায়, যার উদ্দেশ্য মাদুরোর ক্ষমতা গুইদোর কাছে হস্তান্তর। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞায় সরকারের পক্ষে তেল বিক্রি কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভেনেজুয়েলার বন্ডের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন লাতিন আমেরিকার দেশটিতে খাদ্য ও ওষুধের মতো পণ্য আমদানি কঠিন করে ফেলেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো সর্বগ্রাসী ক্ষুধা ও চিকিৎসা সামগ্রীর অপ্রতুলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের দায়ী করেন। তবে স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, মন্দা শুরু হয়েছে নিষেধাজ্ঞার কয়েক বছর আগে।
সমর্থকদের উদ্দেশে সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে মাদুরো বলেন, তারা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলা করছেন, যাতে ২০১৮ সালে ভেনেজুয়েলা কমপক্ষে দুই হাজার কোটি ডলার হারিয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিদেশ থেকে আমাদের পণ্য কেনার পেছনে লেগেছে। এটি নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি কিছু, এটি নির্যাতন।’ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের স্বল্পতা দেশটির বেশিরভাগ লোককে গভীর মানবিক সংকটে ফেলেছে। যদিও এখনো সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের একদল কর্মকর্তা ও শীর্ষ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা মাদুরোর অনুগত।
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেলের মজুদ আছে। কিন্তু দেশটির তেল থেকে আসা আয় গত বছর ব্যাপক কমে যায়। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর দেশটি তেল থেকে যা আয় করেছিল, গত বছর তার চেয়েও কম আয় হয় ভেনেজুয়েলার। গত দুই বছরে দেশটি থেকে এক-দশমাংশ মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে চলে গেছে। এর ফলে লাতিন আমেরিকার এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট দেখা দিয়েছে।
