গণপরিবহনে নৈরাজ্য থামান

আপডেট : ১৯ মে ২০১৯, ১০:১৭ পিএম

নামে ‘সিটিং সার্ভিস’ হলেও, এ নামাঙ্কিত কয়টি বাসে যাত্রীরা বসে যেতে পারেন তা রীতিমতো গবেষণার বিষয়। বাহারি নাম দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ফন্দি আছে রাজধানীর গণপরিহন ব্যবস্থায় কিন্তু প্রতিশ্রুত সেবার দাবি তুললেই যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীদের বচসা লেগে যায়। গণপরিবহনে সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য চরমে পৌঁছেছে। বিভিন্ন রুটে সিটিং সার্ভিসের নামে রাস্তায় বাস নামানো হচ্ছে, আবার কোনো কোনো রুটে লোকাল বাসই চালানো হচ্ছে এ নাম দিয়ে। এর মাধ্যমে যাত্রী ঠকানো সহজ। সিটিং সার্ভিসে ভাড়া নেওয়া হয় অনেক বেশি; কিন্তু বাস চালানো হয় লোকাল সার্ভিসের মতোই, অর্থাৎ যত্রতত্র বাস থামিয়ে গাদাগাদি করে যাত্রী তোলা হয়। কোনো ক্ষেত্রেই নির্ধারিত ভাড়ার হার মানা হয় না। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর শতকরা ৯৮ ভাগ যাত্রী পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস রমজানে গণপরিবহনের ভাড়া আদায়ে নৈরাজ্যের শিকার হচ্ছেন। ৯৫ শতাংশ যাত্রী প্রতিদিন যাতায়াতে দুর্ভোগের শিকার হন। গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৯০ শতাংশ যাত্রী। এ অবস্থায় যাত্রীদের সঙ্গে বাস কর্মচারীদের বচসা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ নৈরাজ্য কি চলতেই থাকবে?

 

কেবল যে ইচ্ছামতো ভাড়া নিয়ে ক্ষান্ত থাকছে পরিবহন শ্রমিকরা, তা নয়। কেউ ন্যায্য ভাড়া দেওয়ার দাবি করলে তর্কাতর্কি থেকে গায়ে হাত তোলা, এমনকি গাড়ি থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার নজিরও রয়েছে।  নিজেদের অন্যায় ও অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ধর্মঘট ডাকতেও পিছপা হয় না পরিবহন শ্রমিকরা। সব মিলিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থা নগরবাসীর কাছে হয়ে পড়েছে দুঃস্বপ্নের মতো। বিভিন্ন সময়ে তেল বা গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি হয় যে হারে, বাসের ভাড়া বাড়ে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি।  তেল-গ্যাসের বর্ধিত মূল্য কার্যকর হওয়ার আগেই ভাড়া বেড়ে যাওয়াও প্রায় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।  এমনকি তেলের দাম বাড়লে গ্যাসচালিত বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়। গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়িয়ে দেওয়া হয় তেলচালিত গাড়ির ভাড়া।

 

রাজধানীতে আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে গণপরিবহনের শৃঙ্খলাই সবার আগে জরুরি।  নাগরিক সংগঠনসমূহের অভিযোগ, গণপরিবহন হিসাবে রাজধানীতে চলাচলরত ৯৫ শতাংশ বাস-মিনিবাসই মেয়াদোর্ত্তীর্ণ। এ বাসগুলো চলাচলের অনুপযুক্ত, নোংরা এবং বসার অনুপযুক্ত। আর এই অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, ভুক্তভোগী মাত্রই তা জানেন। বিভিন্ন সময়ে বিআরটিএ ও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রদত্ত তথ্য এবং বক্তব্যেও তার জোরালো সমর্থন রয়েছে। বেশিরভাগ বাস-মিনিবাস ফিটনেসবিহীন শুধু নয়, বহিরাঙ্গেও এতটাই জরাজীর্ণ যে সেগুলোর দিকে তাকানো যায় না। দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের লক্কড়-ঝক্কড় ও মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহনগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।  কিন্তু এই লক্ষ্যে যখনই অভিযান শুরু হয়, তখনই দেখা যায় হয় বাসগুলো আত্মগোপনে চলে যায়, ঘোষিত অথবা অঘোষিত ধর্মঘট ডেকে জনগণকে জিম্মি করে ফেলেন প্রভাবশালী মালিক-শ্রমিক নেতারা।  কিছুদিন পর গায়ে রংচং মেখে আবার নগর তোলপাড় করতে শুরু করে লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো। 

 

বিআরটিএ’র আইনে সিটিং সার্ভিস বলে কিছু নেই। মালিকরা অতি মুনাফার লোভে নিজেরাই এ সার্ভিস চালু করেছে। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এ ব্যবস্থা চলতে পারে না। রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস চালু করতে হলে নতুন আইন করেই তা করতে হবে। সেক্ষেত্রে লোকাল ও সিটিংয়ের পৃথক পৃথক ভাড়ার হার সরকারকে নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং তার কার্যকারিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

 

পাশাপাশি, ঈদের আগে গৃহমুখী যাত্রীরা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘ যানজটের শিকার হওয়ার পাশাপাশি টিকিট নিয়েও তাদের হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেকেই কাক্সিক্ষত টিকিট না পেয়ে কালোবাজারির দ্বারস্থ হন। এবারও ঈদের আগাম টিকিট বিক্রির প্রথম দিনেই কাক্সিক্ষত টিকিট ফুরিয়ে যাওয়া, বাড়তি ভাড়া আদায়, প্রভাব খাটিয়ে আগাম বুকিং ও সিট ব্যবস্থাপনায় ত্রুটিসহ অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রতিটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয়। এ বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 

রাজধানীর বাস সার্ভিসগুলোতে ভাড়াসহ অন্যান্য বিষয়ে নৈরাজ্য কাটিয়ে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় পরিবহন মালিক, যাত্রী, শ্রমিক ও সরকারের ঐকমত্য জরুরি। মনে রাখতে হবে, এই নৈরাজ্য বজায় রেখে একটি নিরাপদ ও সুষ্ঠু গণপরিবহন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। দেখা যাচ্ছে, বাস সার্ভিসে বিবিধ নৈরাজ্যের কারণেই যাত্রীরা বেশি অর্থ দিয়ে হলেও বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা বেছে নিচ্ছে। তাই এখনই গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত