৫০ হাজার কোটির বাহিনীর সামনেই অশান্তি সপ্তমে

আপডেট : ২০ মে ২০১৯, ০১:৪৬ এএম

ভোট-সপ্তমীতে রাজ্যের ৯ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৭০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। সঙ্গে অর্ধশতাধিক কুইক রেসপন্স টিম। ১০০ শতাংশ বুথেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাহারা। নির্বাচন কমিশনের সূত্র বলছে, এই আয়োজনের পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে খরচের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। জনগণের অর্থে জনগণের নিরাপত্তার আয়োজন, বলার কিছু নেই। তবু এত করেও বাংলার সন্ত্রাসের পরম্পরায় বাঁধ দেওয়া গেল না। রবিবার নির্বাচনের সপ্তম রাউন্ডেও নিরাপত্তার চক্রব্যূহকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে অশান্তির পারদ চড়ল সপ্তমে। কমিশন কথিত ‘শান্তির’ ভোটে ‘বিক্ষিপ্ত গ-গোলে’ সাঙ্গ হলো ভোট পর্ব।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের ভয় দেখানো, ছাপ্পা ভোট, বিক্ষোভ, প্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বোমাবাজি, মারধর, লাঠিচার্জÑ সবই হলো গোটা দিন ধরে। দমদম, বারাসত, বসিরহাট, জয়নগর,         

 

মথুরাপুর, ডায়মন্ড হারবার, যাদবপুর, কলকাতা দক্ষিণ, কলকাতা উত্তর সব কেন্দ্রেই কম-বেশি একই ছবি। সঙ্গে বিধানসভা উপনির্বাচন ঘিরে গত রাত থেকে উত্তপ্ত ছিল ভাটপাড়া। দুই গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ইটবৃষ্টি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর দৌড়াদৌড়ি। রাতের অশান্তির পর আতঙ্কের ছায়ায় সকালে শুরু হয়েছিল ভোটগ্রহণ। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তপ্ত দুপুরে কাঁকিনাড়া এলাকায় শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে। বোমা পড়তে থাকে মুড়ি-মুড়কির মতো। ছুটে আসে র‌্যাফ, আধা-সামারিক বাহিনী। শুরু হয় বেধড়ক লাঠিচার্জ। এখানে যুযুধান দুই পক্ষের দুই হেভিওয়েট সেনাপতি একদিকে ভাটপাড়ার প্রাক্তন বিধায়ক তথা এবারে ব্যারাকপুর সংসদীয় কেন্দ্রের সদ্য তৃণমূলত্যাগী বিজেপি প্রার্থী অর্জুন সিং এবং অন্যদিকে উপনির্বাচনের তৃণমূল প্রার্থী প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র। অর্জুন-পুত্র পবন ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে মদনের প্রতিদ্বন্দ্বী।

ভোটগ্রহণ চলাকালীন বোমা পড়েছে খোদ কালকাতাতেও। উত্তর কলকাতা কেন্দ্রের অন্তর্গত পোস্তা এলাকার বিধান সরণির ট্রাম লাইনের ওপর। এর ৫০ মিটার দূরেই চলছিল ভোটগ্রহণ। ওই এলাকারই বিদ্যাসাগর কলেজ সংলগ্ন একটি স্কুলের বুথে সপরিবারে ভোট দিয়ে বেরিয়ে আসার পর বিক্ষোভের মুখে পড়েন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়। যাদবপুরের বিজেপি প্রার্থী অনুপম হাজরা এক বুথে ঢুকতে গেলে তৃণমূল কংগ্রেসের মহিলা কর্মীদের বিক্ষোভের জেরে এলাকা চাড়তে বাধ্য হন। তবে এতেও রক্ষা পাননি তিনি। মুকুন্দপুরে তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। বজবজে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী নীলাঞ্জন রায়ের গাড়িও ভেঙে দেয় বাইক আরোহী একদল দুষ্কৃতী। নীলাঞ্জনের অভিযোগের তীর এই কেন্দ্রে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই। তার অভিযোগ, অভিষেক ঘনিষ্ঠ মাফিয়ারা তাকে খুনের চক্রান্ত করছে। ভাঙড়েও যাদবপুর কেন্দ্রের বাম প্রার্থী বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যকে তৃণমূলের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে এদিন।

রবিবার সকালে ভোট শুরুর আগেই রায়গঞ্জের গ্রাম ঘিরে বোমাবাজির অভিযোগ মেলে। গ্রামের ভোটাররা যাতে বুথে গিয়ে ভোট দিতে না পারেন তার জন্য সকাল থেকে এই ভীতি প্রদর্শন চলে বলে স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ। এখানেও অভিযুক্ত রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। কলকাতার নিউটাউনে ঝোপের মধ্যে উদ্ধার হয় দুই বালতি তাজা বোমা। এতে আতঙ্ক ছড়ায় ভোটারদের মধ্যে। বসিরহাটের শাসনে আক্রান্ত হয় খোদ কুইক রেসপন্স টিনের গাড়ি। অভিযোগ, এক প্রতিবন্ধী ভোটারকে কেন্দ্রীয় বাহিনীর লোকজনই বিজেপিকে ভোট দিতে বলায় শুরু হয় বিক্ষোভ। অশান্তি সামাল দিতে সেখানে কুইক রেসপন্স টিন পৌঁছলে তাদের গাড়ি লক্ষ করে ইটবৃষ্টি শুরু হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে অনেক জায়গাতেই।

অভিযোগ, বহু বুথে বিরোধী দলের এজেন্টদের বসতেই দেওয়া হয়নি। হয় ভয় দেখিয়ে বুথে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি, না হয় বুথ থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে ধাক্কা মেরে। যাদবপুর কেন্দ্রে বামপ্রার্থী বিকাশরঞ্জনের এক এজেন্টকে গড়িয়ার বটতলা এলপি স্কুলের ১৬৯নং বুথ থেকে ধাক্কাধাক্কি করে বের করে দেওয়ার পর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। দলীয় সূত্রের খবর, সেরিব্রাল স্ট্রোক হয়ে মৃদুলবাবু এখন হাসপাতালের আইসিইউতে।

গণতন্ত্রের উৎসবের শেষ পর্বে সংঘটিত এহেন সব ঘটনার দীর্ঘ ফিরিস্তি সামনে রেখে চলছে রাজনৈতিক তরজা। দোষারোপ পাল্টা-দোষারোপ। ছাপ্পা হোক বা আসল, ভোটের শতাংশে কিন্তু গত দফার নির্বাচনগুলোর মতোই অন্য রাজ্যগুলোকে সকাল থেকেই সমানে টেক্কা দিয়ে গেছে বাংলা। সূর্য মধ্যগগনে পৌঁছতে না পৌঁছতেই শতাংশের হারে ৫০ পার। এত সন্ত্রাস, এত ভীতি প্রদর্শন তবু ব্যস্ত ইভিএম।

যাদবপুর কেন্দ্রের এক বুথ থেকে এদিন সকালে বেরিয়ে এলেন এক মধ্যবয়স্কা মহিলা। চোখে-মুখে ক্ষোভ, হতাশা, বিরক্তি। যেন নিজের মনেই বলছেন, ‘ভোট দিতে পারলাম না, বলে কিনা আপনার ভোট হয়ে গেছে।’ কানে যেতেই দৌড়ে গেল সংবাদমাধ্যম, ‘কী হয়েছে দিদি!’ উত্তর দেওয়ার সময় পাননি ভদ্রমহিলা। তাকে প্রায় ছোঁ মেরে ঠেলতে ঠেলতে চোখের আড়ালে নিয়ে চলে গেলেন অন্য দুই মহিলা। বলাবাহুল্য, এরা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী। এদের একজন ঘাড় ঘুরিয়ে বলে গেলেন, ‘শুনলেন তো, উনি ভোট দিয়ে এসেছেন।’ এই উৎসব প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে কে বলবে, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ হচ্ছে! যদি হয়েও থাকে, ‘আপনি কিছু দেখেননি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত