বিশ্ববিদ্যালয় কেন মতপ্রকাশকে ভয় পাবে

আপডেট : ২১ মে ২০১৯, ১০:০৪ পিএম

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য কেবল শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাঠ দেওয়া নয়; বরং জ্ঞানচর্চা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিবিড় আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সেই জ্ঞানের চর্চা হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার মধ্য দিয়ে নতুন জ্ঞান বিকাশের পথ তৈরি হবে। এ জন্য শ্রেণিকক্ষের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও মুক্ত পরিসর সমান জরুরি। এই মুক্ত পরিসর কেবল ভৌত অর্থে স্থান নয়; বরং সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক জ্ঞানতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিসর। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই মুক্ত পরিসর ক্রমাগতই সংকুচিত হচ্ছে। বলা ভালো সংকুচিত হতে হতে তা বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত মৌলিক ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আর সংকোচনের এই খড়গ যে কেবল শিক্ষার্থীদের ওপরই নেমে আসছে তা নয়, শিক্ষকরাও এর শিকার হচ্ছেন। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রশাসনের এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণে তার দৃষ্টান্ত দেখা গেছে।

 

প্রশ্ন আসতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কি তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চালাচ্ছেন না? উত্তরটা আমাদের জানা।  হ্যাঁ, শিক্ষকরাই চালাচ্ছেন। তবে এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক কাঠামোয় থাকা শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বনকারী বা অনুগত, অনেক ক্ষেত্রে তারা যথাযথভাবে নির্বাচিতও নন। অর্থাৎ, আইনগতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন থাকলেও কার্যত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে গণতন্ত্র চর্চার অভাব দেখা যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দশকের পর দশক ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা অনুপস্থিত

থাকায় এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে সন্দেহ নেই। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থাই চলছে। কিন্তু সর্বসাম্প্রতিক যে প্রবণতা বিদ্বৎসমাজ এবং নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, তা হলো- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব হারাতে বসা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া।

 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সমাজের আর সব প্রতিষ্ঠানের মতোই নানাভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।  এজন্য শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব যেমন দিনদিন বাড়ছে তেমনি নানা পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ও দখলদারিত্বের পর আজকাল সবচেয়ে বড় বাধাটি আসছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাধীন মতপ্রকাশের ওপর। যা খুবই উদ্বেগজনক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বকারী বিতর্কিত ‘৫৭ ধারার’ প্রয়োগ নিয়ে নাগরিক সমাজের লাগাতার প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখা গেছে। লেখক-শিল্পী, সংস্কৃতি-রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০১৮’-তে আগের বিতর্কিত ৫৭ ধারার স্থলে নতুন করে ৩২ ধারায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার মতো বিধিবিধান রয়ে গেছে।  এখন নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয়ও ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাধীন মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় গত ৫ এপ্রিল সিন্ডিকেটের বিশেষ সভায় ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলাবিধি হালনাগাদ করে এক অধ্যাদেশ জারি করেছে।  এতে বিধিমালার ৫-এর (ঞ) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনোও ছাত্র/ছাত্রী অসত্য এবং তথ্য বিকৃত করে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত কোনো সংবাদ বা প্রতিবেদন স্থানীয়/জাতীয়/আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক সংবাদমাধ্যম/সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ/প্রচার করা বা উক্ত কাজে সহযোগিতা করতে পারবে না।’ পাশাপাশি ৫-এর (থ) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ছাত্র/ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ছাত্র/ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর উদ্দেশে টেলিফোন, মোবাইল ফোন, ই-মেইল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো অশ্লীল বার্তা বা অসৌজন্যমূলক বার্তা প্রেরণ অথবা উত্ত্যক্ত করবে না।’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ ওই অধ্যাদেশে বলেছে, ধারা দুটির ব্যত্যয় ঘটলে তা ‘অসদাচরণ’ বলে গণ্য হবে। এজন্য লঘু শাস্তি হিসেবে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও সতর্কীকরণ এবং গুরু শাস্তি হিসেবে আজীবন বহিষ্কার, বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সাময়িক বহিষ্কার এবং পাঁচ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে যেকোনো পরিমাণ জরিমানা করা হবে।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ক্রিয়াশীল বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন ও সাংবাদিক সংগঠন এরই মধ্যে কর্র্তৃপক্ষের এই অধ্যাদেশের প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছেন, ছাত্রছাত্রী শৃঙ্খলা বিধিমালার নামে এই আইন দিয়ে প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে কর্র্তৃত্ববাদী শাসন জারি রাখতে এবং যে কোনো ধরনের ভিন্নমতাবলম্বীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। কেননা, কোনো তথ্য ‘অসত্য’ কিনা বা ‘তথ্য বিকৃত’ করা হয়েছে কি না, কিংবা কোনো বার্তা ‘অশ্লীল ও অসৌজন্যমূলক’ কি না সে বিষয়গুলো নির্ধারণ কার্যত প্রশাসনের এখতিয়ারে থাকায় এর মারাত্মক অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। যা ইতিপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও দেখা গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উদ্দেশ্য যেখানে ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করা এবং স্বাধীন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, সেখানে ছাত্রছাত্রীদের স্বাধীন মতপ্রকাশকে বিশ্ববিদ্যালয় কেন ভয় পাবে। ভুলে গেলে চলবে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক এবং তাদের অপরাধ বা অসদাচরণের বিচার রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনেই করা সম্ভব।  তাহলে বিশ্ববিদ্যলয়ে আলাদাভাবে এমন বিধান চালু করা হচ্ছে কেন?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত